September 24, 2018

ছোট হয়ে আসছে গণজাগরণ মঞ্চ

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবিতে ঢাকার শাহবাগে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে সম্পৃক্ত অধিকাংশ কর্মী ও বস্নগার এখন আর মাঠে নেই। তিনভাগে বিভক্ত মঞ্চের দুই ভাগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা কোনো কর্মসূচি পালন করেন না গত দুই বছর ধরে। মঞ্চের উত্তাল আন্দোলন কর্মসূচিতে প্রায় নিয়মিত যে ২২০টি প্রগতিশীল সংগঠন সংহতি জানাত, সেসব সংগঠনও এখন আর কোনো কর্মসূচিকে সমর্থন করে বিবৃতি পাঠায় না। সেসব সংগঠনের অধিকাংশ নেতা মঞ্চের একাংশের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগও রাখেন না বলে জানা যায়।

আমন্ত্রণ জানানো হলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের ও সরকার সমর্থক বুদ্ধিজীবী, লেখকদের মধ্যে অনেকে এখন আর গণজাগরণ মঞ্চের আলোচনায় অংশ নিতে আগ্রহী নন! ছাত্রলীগ, যুবলীগ, ছাত্রমৈত্রী, জাসদ ছাত্রলীগ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ও যুবমৈত্রীসহ প্রগতিশীল বাম রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদেরও আর মঞ্চের কোনো কর্মসূচিতে দেখা যায় না। সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে যারা ডা. ইমরান এইচ সরকারকে ‘অব্যাহতি’ দিয়ে আন্দোলনকে ‘আরো চাঙ্গা’ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাদেরও মাঠে দেখা যায় না।

শাহবাগ আন্দোলনের আলোচিত সেই আট ‘সস্নোগান কন্যার’ সাতজন ও বস্নগাররাও মাঠে নেই। সাত সস্নোগান কন্যা কোথায়?

আছেন, এ তথ্য মঞ্চের মুখপাত্র এবং এখনো কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া ডা. ইমরান সরকারের সমর্থকরাও জানেন না। সাধারণ মানুষও আগের মতো মঞ্চের কর্মসূচিতে অংশ নেন না। ডা. ইমরানের সমর্থক দুই কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘তালিকা অনুযায়ী মৌলবাদী গোষ্ঠীর একের পর এক বস্নগার হত্যাকান্ড চালানো এবং কারো হত্যাকারী এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিরাপদ না করায় তারা মঞ্চের কর্মসূচিতেও অংশ নিতে পারছেন না। এটা আসলে সরকারের ব্যর্থতা।’

গণজাগরণ মঞ্চের তিন অংশের মধ্যে শুধু ডা. ইমরানের নেতৃত্বের অংশটিই এখনো বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। সিপিবির ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সভানেত্রী লাকি আক্তার, বস্নগার মারুফ রসূল, বস্নগার মাহমুদুল হক মুন্সী বাঁধনসহ কয়েকজন তাদের সঙ্গে আছেন। এ অংশের সমর্থক বাঁধনসহ প্রায় ৪০ বস্নগার প্রাণনাশের হুমকি থাকায় ইতোমধ্যে বিদেশে চলে গেছেন। এ অংশের সমর্থক বস্নগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় জঙ্গিগোষ্ঠীর হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। এরপর হত্যার হুমকি ও উগ্রগোষ্ঠীর খতম তালিকায় থাকা অনেক বস্নগার আছেন আত্মগোপনে। তারা আর আগের মতো কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারছেন না। ফলে গণজাগরণ মঞ্চের বছর দেড়েকের কর্মসূচিতে ডা. ইমরান, লাকি, মারুফ রসূল ছাড়া উল্লেখযোগ্য আর কাউকে দেখা যায়নি। তবে ইমরান অংশের কর্মসূচিতে আলোচক হিসেবে ভাস্কর রাশা, সাংস্কৃতিকব্যক্তিত্ব হাসান ইমামের মেয়ে সঙ্গীতা ইমামসহ চার-পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা এবং উদীচীর কয়েকজন কর্মী প্রায় নিয়মিত উপস্থিত থাকেন।

আন্দোলনের কর্মসূচি গণমাধ্যমকে জানাতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের ‘মিডিয়া সেল’ নামে অস্থায়ী যে ঘরটি ছিল, তা দখলে নিয়েছেন তিন অংশের মধ্যে একাংশ ‘গৌরব ৭১’ নামে সরকার সমর্থক একটি সংগঠন। এখন ওই সংগঠনের কার্যক্রম না থাকলেও ‘মিডিয়া সেল’ ডা. ইমরানের সমর্থকদের দখলে নেই। মঞ্চের কোনো কর্মসূচি থাকলেও ওই সেল থেকে পাঠানোর বদলে ডা. ইমরান নিজের মুঠোফোন থেকে খুদেবার্তা পাঠিয়ে এখন গণমাধ্যম কর্মীদের তা জানান। চেষ্টা করেও ঘরটি দখলে নিতে পারছেন না ডা. ইমরানের সমর্থকরা।

তথ্যমতে, ‘লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা’ বা জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার অনুষ্ঠানে ইসলামী ব্যাংক থেকে আওয়ামী লীগের অনুদান নেয়াকে কেন্দ্র করে (যদিও টাকা পরে ফেরত দেয়া হয়) ডা. ইমরানের সঙ্গে দলটির ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের বিরোধিতা প্রথম প্রকাশ্য রূপ নেয়। তখন ছাত্রলীগকে সমর্থন করে জাসদ ছাত্রলীগ ও ছাত্রমৈত্রীসহ মহাজোটে থাকা অন্যান্য বাম রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন। ফলে ডা. ইমরানের সঙ্গে ছাত্রলীগসহ সেসব সংগঠনের নেতাকর্মীর দূরত্ব তৈরি হয়।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর সামপ্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে গণজাগরণ মঞ্চের রোডমার্চ, ‘একতরফা’ নির্বাচন নিয়ে ডা. ইমরানের বক্তব্য, ঘরোয়া আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা এসব বিষয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ আমলে নেয়। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতাও তখন প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘গণজাগরণ মঞ্চের আর প্রয়োজন নেই!’ ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননও ২০১৪ সালের মাঝামাঝি বিবিসির সংলাপে দাবি করেন ‘গণজাগরণ মঞ্চ এখন তিন ভাগে বিভক্ত। মানুষের মধ্যে গণজাগরণ মঞ্চের সেই আবেদন আর নেই।’ এসব বক্তব্যের জবাবে ডা. ইমরানও গণমাধ্যমের কাছে অভিযোগ করেন, ‘সরকার কৌশলগত কারণে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছিল।’

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ও জামায়াতের নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরু হয়। বস্নগার ও অনলাইন লেখকদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এ আন্দোলন শুরু থেকে নিয়ন্ত্রণে নেয় আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও মহাজোটের বাম রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতারা। মহাজোটের বাইরে থাকা কয়েকটি বাম রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদেরও এ আন্দোলনে শুরু থেকে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। তবে শুরু থেকেই এ আন্দোলনের মুখপাত্র ছিলেন ডা. ইমরান সরকার। দেশ-বিদেশে আলোচিত এ আন্দোলন গড়ে ওঠার এক বছর পরই তিন ভাগে ভাগ হয়ে যায় সংগঠনটি।

২০১৪ সালের এপ্রিলে মঞ্চকে তিনটি অংশে বিভক্ত হয়ে আলাদা কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়। ডা. ইমরানের নেতৃত্বে একাংশ এবং ছাত্রমৈত্রীর সাবেক সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসু ও জাসদ ছাত্রলীগ সভাপতি শামছুল ইসলামের নেতৃত্বে একাংশ আর আওয়ামী লীগ নেতা কামাল পাশা চৌধুরী একাংশের নেতৃত্ব দেন। তখন অভিযোগ ওঠে, ২০১৪ সালের ২৬ মার্চ থেকে গণজাগরণ মঞ্চের সব কর্মসূচি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে ছাত্রলীগ। এরপর ছাত্রলীগ দুটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটায়। এগুলো হলো ‘গৌরব ৭১’ ও ‘মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড’। এসব সংগঠনের কর্মীই ‘গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠকবৃন্দ’ নাম দিয়ে মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরানের নেতৃত্বের বিরোধিতা করেন।

২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডা. ইমরানকে মুখপাত্র’র পদ থেকে ‘অব্যাহতি’ দেয়ার কথা জানান মঞ্চের ‘সংগঠক’ পরিচয়দানকারী কয়েকজন। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘এখন থেকে ৫ সদস্যের একটি প্যানেল মঞ্চের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করবে, যাদের নাম অচিরেই জানানো হবে।’ ‘গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও সংগঠক’ ব্যানারে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান কামাল পাশা চৌধুরী তবে আজ পর্যন্ত ওই পাঁচ সদস্যের নাম ঘোষণা করেননি তারা।

এ বিষয়ে নানাভাবে চেষ্টা করেও কামাল পাশা চৌধুরীর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র কমান্ডের সাবেক আহ্বায়ক ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রচার সেলের কর্মী।

তথ্যমতে, ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে টানা ১৬ দিন আন্দোলন চালিয়ে যান গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠকরা। পুলিশ তখন সিসি ক্যামেরা দিয়ে সমাবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ঢাকা সিটি করপোরেশন সেখানে অস্থায়ী টয়লেটও বানিয়ে দেয়। তবে ২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল সেই পুলিশই শাহবাগে সমাবেশ করতে গেলে ডা. ইমরানসহ তার সমর্থকদের বাধা দেয়। পুলিশের তখন যুক্তি ছিল ‘গণজাগরণ মঞ্চ সমাবেশের অনুমতি নেয়নি।’ সেদিন পুলিশের বেধড়ক পিটুনিতে ডা. ইমরান, লাকি ও মঞ্চের কর্মী মাহমুদুল হক মুন্সী বাঁধনসহ ছয়জন আহত হন। এর আগে ঢাকাস্থ পাকিস্তান দূতাবাস ঘেরাওকালেও ইমরানসহ অনেককেই লাঠিপেটা করে পুলিশ।

উৎসঃ যাযাদি
দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts