November 21, 2018

ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে ছাত্রীরা!

ডেস্ক রিপোর্টঃ বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের পালে হাওয়া দিচ্ছেন ছাত্র রাজনীতিতে আসা নারীকর্মীরা। মূলধারাসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল বাম রাজনৈতিক দলের সহযোগী ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে ইতোমধ্যে স্থান করে নিয়েছেন তারা। অন্যসব ছাত্রীর মতো নিয়মিত চাকরি বা অন্য কোনও পেশার চেয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়াই তাদের লক্ষ্য। রাজনীতিতে যুক্ত না হয়ে নারীর প্রকৃত স্বাধীনতা, জনসেবাসহ মানবমুক্তির পথ অনেকটাই অসম্ভব বলে মনে করেন তারা। রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে নারীশিক্ষার্থীদের উঠে আসায় দিনে দিনে নারীর ক্ষমতায়ন বাড়ছে বলে মনে করছেন দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, রাজনীতি বিশ্লেষক ও সমাজ চিন্তকরা।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র ফ্রন্টসহ বিভিন্ন সংগঠনের শীর্ষপদগুলোয় স্থান করে নিয়েছেন নারীশিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলোয়ও কয়েকজন নারী-রাজনৈতিকর্মী সক্রিয়ভাবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি লাকি আক্তার। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী। গত মাসে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। ফেনী জেলার এই নারী-রাজনীতিক এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকসহ জবির বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সময় স্লোগান দিয়ে তিনি স্লোগানকন্যা হিসেবে খ্যাতি পান।

বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির। পরিসংখ্যানে মাস্টার্সের এই শিক্ষার্থী ২০১১ সালে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। বর্তমানে ঢাবি কমিটির পাশাপাশি ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যও নির্বাচিত হয়েছেন বেনজির। লক্ষ্মীপুর জেলার সন্তান বেনজির গণজাগরণ মঞ্চ আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন।

সংগঠনে যুক্ত হওয়ার পেছনে উম্মে হাবিব বেনজিরের মন্তব্য, রাজনীতিতে শিক্ষিত, জনগণের হয়ে কথা বলার মানুষ দিনেদিনে অনেকটাই কমে গেছে। রাজনীতি সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে দেখছি, প্রতিষ্ঠানের এত সমস্যা, হলে ছাত্রীরা ভালো থাকতে পারছেন না, তাদের থেকে বেশি ফি গ্রহণ করা হচ্ছে—এ সব কিছু দেখে বুঝলাম, রাজনীতি ছাড়া এই বিষয়গুলোর সমাধান সম্ভব নয়। তাই, নিজেকে রাজনীতিতে যুক্ত করলাম।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম-আহ্বায়ক খন্দকার ডালিয়া রহমান। আইনে স্নাতক। বর্তমানে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে তিনি উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করছেন। বিগত কয়েক বছরে ডালিয়াকে ছাত্রদলসহ বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেখা গেছে। পাশাপাশি সাইক্লিং, খেলাধুলাসহ নানা কাজেও যুক্ত আছেন। কুমিল্লা শহরের মেয়ে ডালিয়া বলেন, বুঝ-জ্ঞান হওয়া পর থেকেই ভাবছি রাজনীতি করব। স্কুল জীবন শেষ করে কলেজ জীবনের শুরুতেই ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়ি।

রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কারণ জানতে চাইলে খন্দকার ডালিয়া বলেন, আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। বাবার মুখে ৯০-এর গণআন্দোলনে ছাত্রদলের ভূমিকা সম্পর্কে শুনেছি। শুনে শুনে রাজনীতির প্রতি আগ্রহ জন্মে। এই কারণেই সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হই। আর রাজনীতি ছাড়া নারীমুক্তিও অসম্ভব বলে মনে করেন ডালিয়া।

নারীর যে মর্যাদাবোধ, সেটি কেবল রাজনীতির মধ্য দিয়ে আসতে পারে বলে মনে করেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ইভা মজুমদার। কথায়-কথায় জানান, বাংলাদেশে নারীর বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের জন্য নারীকেই রুখে দাঁড়াতে হবে। নারীকেই দায়িত্ব নিতে হবে। ফরিদপুর জেলার এই সন্তানব কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মাস্টার্স রছেন ঢাবিতে। তিনি ২০০৭ সালে ছাত্রফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত হন। ইভা মজুমদার জানান, সমাজ পরিবর্তনের লড়াইয়ে অংশ নিতেই তিনি ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। রাজনীতি করতে গিয়ে পারিবারিক শিক্ষাও অনেকটা তাকে সহযোগিতা করেছে বলে জানান ইভা মজুমদার।

ইচ্ছাশক্তি থাকলেই নারীরা রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারেন—এমন মন্তব্য ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার রোকেয়া হলে সাধারণ সম্পাদক ইশাত কাশফিয়া ইরা। তার মতে, নারীর ক্ষমতায়নে হয় অর্থ নয় ক্ষমতা প্রয়োজন হয়। এই দুটির একটি ছাড়া পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যেকোনও নারীর প্রতিষ্ঠা, তার স্বাধীনতা, বা মুক্তি—সব কিছুই কঠিন হয়ে যায়। রাজনীতির মধ্য দিয়ে সমাজের নানা স্তরে যোগাযোগ বাড়ে, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে যুক্ততা বাড়ে, এতে কোনও না কোনও উপায়ে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়, সে কারণেই রাজনীতিতে আসা। মার্কেটিং চতুর্থবর্ষের এই শিক্ষার্থীর ভাষ্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার রাজনৈতিক আদর্শ হলেও সেই স্কুলবয়সেই তিনি রাজনীতির প্রতি ঝুঁকেছেন। ছাত্রলীগে যোগ দেওয়ার পেছনে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেত্রী লিলির অনেক সহযোগিতা ছিল বলেও তিনি জানান।

পরিবারকে বোঝাতে পারলে সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব

রাজনীতিতে আসার কারণে পরিবারের ভূমিকা অনেকখানি গুরুত্বপূর্ণ। সমাজব্যবস্থার অঘোষিত যে নিষেধাজ্ঞাগুলো রয়েছে, এই বিষয়গুলো পরিবার ছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে টপকানো সম্ভব নয়। এ কারণে পরিবারকে নিয়েই এগুতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন পরিবারকে বোঝানো। সঠিক চিন্তা দিয়ে পরিবারের উৎকণ্ঠা, আশঙ্কা উজিয়ে গেলে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়বে, এমনটাই মনে করে এই ছাত্রনেতারা।

ইশাত কাশফিয়া ইরা মনে করেন, পরিবারের মনে যে শঙ্কাগুলো কাজ করে, সেগুলো অমূলক নয়। নারী তো ঘরের বাইরে নিরাপদ নন। এটি সর্বজনীন। কিন্তু পরিবারকে বোঝাতে হবে, যে রাজনীতি ছাড়া প্রকৃথ অর্থে নারীর অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন হবে না। পরিবারকে বোঝাতে হবে, যে পরিবেশের মধ্য দিয়ে রাজনীতি করতে হয়, এই রাজনীতির পরিবেশ পরিবর্তন করতে পারেন শুধু নারীরাই। আর পরিবারকে বোঝাতে সক্ষম হলে কোনও বাধাই বাধা নয়। এখন তো আমার মা টিভিতে দেখার জন্য বসে থাকেন। অপেক্ষা করেন, তার মেয়েকে রাজনৈতিক সমাবেশে দেখা যাবে।

এদিকে, ইভা মুজমদার বলেন, পরিবার থেকেই প্রাথমিক শিক্ষাটা পেয়েছি। আর বাধা যে একেবারেই নেই, তা নয়। কিন্তু তাদের বোঝাতে পারলে, নিজের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেষ্ট থাকার বিষয়ে আন্তরিকতা দেখালে, পরিবার সহযোগিতা করে। এছাড়া, বামসংগঠনের নারীর অধিকার, তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়গুলো চর্চিত হয়। পরিবেশও চমৎকার।

খন্দকার ডালিয়া বলেন, আমার পরিবার রাজনীতিতে আগ্রহী। দেশের জন্য কিছু করার জন্য রাজনীতির বিকল্প আমার কাছে খুব কম। সরাসরি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে দেশের জন্য কাজ করার মাহাত্ম্য উপলব্ধি না করলে সম্ভব নয়। তবে এটি ঠিক, সময় ও পরিবেশ বিবেচনায় পরিবার নিরাপত্তা নিয়ে কখনও কখনও উৎকণ্ঠিত হয়। তবে বিচলিত হয় না। কারণ, নিজের নিরাপত্তার বিষয়ে সবসময় আমি সচেতন। আমার সংগঠনও বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়। কারণ, সংগঠনের ছাত্র কর্মীদের সহযোগিতা ছাড়াও সংগঠন করতে পারব না।

নারীরা রাজনীতিতে এলে শিক্ষিত রাজনৈতিক-প্রজন্ম তৈরি হবে

নারীরা রাজনীতিতে এলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আগ্রহী হবে, শিক্ষিত রাজনৈতিক-প্রজন্ম তৈরি হবে—এমনটাই মনে করেন দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজচিন্তকরা। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক যতীন সরকার বলেন, নারীরা ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্ব আসছেন। ভবিষ্যতে আরও আসবেন। এটি অবশ্যই সমাজের জন্য, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো পরিবেশে সত্যিই সুখবর। তবে, মাথায় রাখতে হবে, নারীরা যেন আবার পুরুষতান্ত্রিকতার প্রতিনিধিত্ব না করেন। আমাদের দেশে দুজন নারী ধারাবাহিকভাবে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। বর্তমানে আছেন, অতীতেও ছিলেন। এছাড়া, বিরোধী দলীয় নেতাও নারী। এরপরও নারীর অগ্রগতি কিন্তু উল্লেখযোগ্য নয়।

বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন প্রবীণ রাজনীতিক ড. কামাল হোসেন। তার মতে, গণতন্ত্রের সর্বজনীনতা রক্ষা করতে হলে রাজনীতিতে নারীর বিকল্প নেই। ছাত্রসংগঠনে নারীর পদায়ন অবশ্যই নান্দনিক বার্তা।

তবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদের নির্বাচন না হওয়ার কারণে খুব একটা অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করেন না বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। তার মতে, নারী ছাত্রসংগঠনে যুক্ত হচ্ছে ভালো খবর। কিন্তু গণতন্ত্রের বিকাশের ক্ষেত্রে ছাত্র সংসদ নির্বাচন একটি প্রয়োজনীয় বিষয়। এটিকে দুর্বল রেখে নারীনেতৃত্ব বা গণতন্ত্রের শক্তিশালীকরণ সম্ভব নয়। পাশাপাশি শামসুজ্জামান খান এও বলেন, নারী তো এখনও মূল নেতৃত্বে আসতে পারছেন না।বাংলা ট্রিবিউন

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts