September 22, 2018

চীন-মার্কিন সংঘাত কি আসন্ন?

যুক্তরাষ্ট্র ও উদীয়মান চীন

স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী চীন-মার্কিন ধারাবাহিক উত্তেজনা চূড়ান্ত পরিণতির দিকে অগ্রসরমান। ’৯০-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় এগিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও উদীয়মান চীনের মধ্যে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই ক্রমবর্ধমান হারে বিক্ষিপ্ত উত্তেজনার সৃষ্টি করে। সর্বশেষ দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে দুই দেশ কার্যত যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। পাল্টাপাল্টি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশটন কার্টারের দক্ষিণ চীন সাগর সফর পরিস্থিতিকে শোচনীয় করে।

এর আগে দক্ষিণ চীন সাগরের কৌশলগত এলাকায় পরমাণু অস্ত্রবাহী মার্কিন রণতরী লসেন অনুপ্রবেশ করে। ঘটনায় ক্ষিপ্ত বেইজিং ‘সংযত না হলে যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধ’ এই বলে পেন্টাগনকে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দেয়। এতেও মার্কিন উপস্থিতি অটল থাকায় পিপলস লিবারেশন আর্মিও সেখানে পরমাণু অস্ত্র সজ্জিত সাবমেরিন প্রেরণ করে। এর মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপান ও অস্ট্রেলিয়ায় অতিরিক্ত শক্তি মোতায়েনের পাশাপাশি লসেনকে সাহায্য করার উদ্দেশে বেশ কয়েকটি সাপ্লিমেন্টারি ডেস্ট্রয়ার ওই অঞ্চলের দিকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিক্রিয়ায় চীন ভিয়েতনাম জলসীমা বরাবর ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত যুদ্ধবিমানের নিয়মিত মহড়া অব্যাহত রাখায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে।

ব্রুনাই থেকে পূর্ব চীন সাগর হয়ে তাইওয়ান উপসাগর অতিক্রম করে ভারত মহাসাগরের প্রান্তিক সীমার দেশ অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিশাল জলভাগে চীনের একক আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত। দক্ষিণ চীন সাগর হচ্ছে ওই জলভাগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ যার প্রায় ৯৫ ভাগ এলাকার সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ চীনের। যদিও আঞ্চলিক দেশ ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ব্রুনাইর সঙ্গে ওই জলভাগের শরিকানা নিয়ে চীনের বিস্তর মতপার্থক্য আছে। এ রকমই একটি বিরোধপূর্ণ শৈবাল দ্বীপ স্প্রান্টলি। মূলত ফিলিপাইন ভিয়েতনামের মৃদু আপত্তি উপেক্ষা করে সম্প্রতি চীন সেখানে ব্যাপক ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে একটি কৃত্রিম শহর নির্মাণ করে। ফলে আঞ্চলিক দেশগুলোর সীমিত দাবি ভূলুন্ঠিত হয়ে ওই জলভাগে চীনের সার্বভৌমত্ব স্পষ্টভাবে সুদৃঢ় হয়। আবার ওই কৃত্রিম শহরে পিপলস লিবারেশন আর্মির কর্মতৎপরতা আঞ্চলিক দেশগুলোর বর্ধনশীল উৎকণ্ঠা দ্রুত জমাট বাঁধতে থাকে।

সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের সিদ্ধান্তে গণমুক্তি ফৌজের গুয়াংজু কমান্ডের একটি চৌকস সেনাদল ওই শহরে মোতায়েন করাই আঞ্চলিক উৎকণ্ঠার প্রধানতম কারণ। যে কারণে দক্ষিন চীন সাগর সংক্রান্ত আঞ্চলিক বিরোধ উর্বর করতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক জোরদার করে। চীনের ওপর চাপ প্রয়োগ করতেই মার্কিনীরা সুকৌশলে ওই অঞ্চলে অতিরিক্ত শক্তি সমাবেশ ঘটায়। বিপরীতে চীনও সামরিক শক্তির উৎকর্ষ আনয়ন করে আক্রমণাত্মক রণকৌশল এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় ধারাবাহিক উত্তেজনা সামরিক সংকটের সূচনা করে।

মতাদর্শগত, সামাজিক ব্যবস্থাপনা ও পররাষ্ট্র নীতিতে ব্যাপক পার্থক্যের কারণে চীন-মার্কিন সম্পর্কে মৌলিক উন্নয়ন প্রায় অসম্ভব। তবে বিশ্বরাজনীতিতে ব্যাপক অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের কারণে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্থিতিশীলতা বহুল প্রত্যাশিত। চীন-মার্কিন সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বৈশ্বিক সামরিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা অনেকটা স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম। বিপ্লব উত্তর তাইওয়ানের জাতীয়তাবাদী সরকারকে সমর্থন দিলে চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে কোরিয়া ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় চীন-মার্কিন অবনতিশীল সম্পর্ক সত্তরের দশকের শুরুতেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের বেইজিং সফরের মধ্যদিয়ে মৃদু স্বাভাবিকতায় ফিরে।

বিশ্ব প্রেক্ষাপটের ভিন্নতা, চীন সোভিয়েত বিরোধকে কেন্দ্র করে চীন-মার্কিন সম্পর্কের এই উষ্ণতা ’৮৯ সালে তিয়েনআনমেনের রক্তপাতের আগে ভারসাম্যপূর্ণই ছিল। ওই সময়গুলোতে মার্কিন সমর্থনে চীন জাতিসংঘে তাইওয়ানের পরিবর্তে নিজের প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। কিন্তু ’৯০ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিলুপ্তির কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একক বিশ্ব নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিপরীতে চীনের বিশ্ব নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন অবারিত হয়। চীনের ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে দ্বিপক্ষীয় লড়াইকে বেগবান করে। বস্তুত কোরীয় উপদ্বীপ, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি, চীনের মানবাধিকার, আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ায় প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তার এবং সব ছাপিয়ে দক্ষিণ চীন সাগরের সার্বভৌমত্ব নিয়ে দেশ দুটির উত্তেজনা ক্রমবর্ধনশীল।

মার্কিনীদের মোকাবেলায় অনুসৃত রক্ষণাত্মক কৌশলের পরিবর্তে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ক্রমেই আক্রমণাত্মক রূপ ধারণ করে। তাইওয়ান, তিব্বত তথা দালাইলামাকে কেন্দ্র করে মার্কিন বিতর্কিত কর্মকান্ডর শিথিলতা চীনকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়। আবার অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন উৎকণ্ঠা আমলে না নিয়ে মার্কিন জনগণের আকাক্সক্ষার সত্যিকার প্রতিফলন আমরা যুক্তরাষ্ট্রীয় সমাজে দেখতে চাই বলে পাল্টা উপদেশ দেয় চীন।

ক্রমঅগ্রসরমান শক্তি হিসেবে চীন ইতিমধ্যে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরে ব্যাপক সামরিক আধিপত্য বিস্তার করে। যা দক্ষিন চীন সাগর বিরোধকে কেন্দ্র করে চীন-মার্কিন সম্পর্কে নতুন মাত্রা দেয়। আগেই ব্যক্ত করা হয়েছে যে, ওই অঞ্চলে ব্যাপক সামরিক অবকাঠামো নির্মাণ করে চীন নিজের অবস্থান সুসংহত করে। পক্ষান্তরে চীনের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত আঞ্চলিক দেশগুলোকে যুদ্ধ জাহাজ, সামরিক প্রশিক্ষণ ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রও শক্তির ভারসাম্য ফেরায়। চীনকে অনুমিত লক্ষ বানিয়ে এক ধরনের সামরিক বেষ্টনী তৈরি করে। সর্বশেষ মার্কিনের বিপরীতে চীনের শক্তি প্রদর্শনী দক্ষিন চীন সাগর ইস্যুতে দেশটির পূর্বতন অনমনীয়তার স্পষ্ট প্রতিফলন। সংগত কারণেই জানা দরকার ওই অঞ্চলের সামরিক উত্তাপ যুদ্ধের সূচনা করলে ফলাফল কি হতে পারে?

চীনের ক্রমবর্ধনশীল সামরিক বাজেট মার্কিন দুশ্চিন্তার গুরুতর কারণ। পৃথিবীর বৃহত্তম সেনা এবং নৌবাহিনীর দেশ চীনের সামরিক গবেষণা সাফল্য, বিকশিত শিল্পায়ন, অস্ত্র প্রায়োগিক সামর্থ্য যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইতিমধ্যে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অজ্ঞাত সংখ্যক আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের অধিকারী চীন সমুদ্রভিত্তিক পরমাণু অস্ত্র মোতায়েনে সবাইকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। বিশ্বে চীনই একমাত্র দেশ যারা রণতরী বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হস্তগত করে আধুনিক সমুদ্র যুদ্ধ সমীকরণের চেহারা পাল্টে ফেলে। একই সঙ্গে আগামী বছর দেশটির সামরিক বহরে যুক্ত হচ্ছে একটি নতুন বিমানবাহী রণতরী। ৬০ হাজার টন ইস্পাতের সমীহ জাগানো কাঠামোতে তৈরি এই এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের নামকরণ করার কথা সতেরশ শতকে তাইওয়ান বিজয়ী নৌ প্রধান শিং লাংয়ের নামে। এই সাফল্য ভারত এবং প্রশান্ত মহাসাগরের সব অংশের নৌপথ সুরক্ষায় চীনের শক্তি এবং সুরক্ষা বৃদ্ধি করবে।

চীনের আঞ্চলিক মিত্র উত্তর কোরিয়ার শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মার্কিন তৎপরতা ওই অঞ্চলকে বরাবরই অস্থিতিশীল করে তোলে।

মার্কিনীদের ষড়যন্ত্র, চাপ অগ্রাহ্য করে পিয়ং ইয়ং বেইজিং সম্পর্ক বন্ধুত্বের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। সম্প্রতি কোরিয়ান ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর জনসভায় উপস্থিত ছিলেন সিপিসির এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তার উপস্থিতিতে উত্তর কোরীয় নেতা মার্কিনীদের বিরুদ্ধে কড়া সামরিক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। বিশেষত উত্তর কোরিয়ার পরমাণু সক্ষমতা এবং সেটি প্রয়োগ করতে প্রয়োজনীয় আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে। যদিও কোরীয় উপদ্বীপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক মিত্ররা ক্রমাগত সামরিক মহড়া অব্যাহত রেখেছে। লিবিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক যুদ্ধে চীন ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সুদান বিভক্তি, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, ইউক্রেন সংকট এবং আফ্রিকা ও ইউরোপের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় চীন মার্কিন অবস্থান প্রায় মুখোমুখি। ক্ষয়িষ্ণু শক্তির যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বহির্বিশ্বে তথাকথিত গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার রপ্তানির প্রচেষ্টার ঘোর বিরোধী চীন। ব্রিকস, এসসিও শক্তিশালী করার মধ্যদিয়ে চীন বিদ্যমান মার্কিন অনুকূল বিশ্ব কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছে। বিশেষত বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দৌরাত্ম্য প্রতিহত করতে রাশিয়া, ইরান ভারতকে সঙ্গে নিয়ে সৃষ্টি করে এশিয়া উন্নয়ন বিনিয়োগ ব্যাংক। রাশিয়ার এবং ইরানের সঙ্গে ব্যাপকভিত্তিক জ্বালানি সহযোগিতা সচল রেখে বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা কার্যকর করতে আগ্রহী। সামগ্রিকভাবে এ ধরনের তৎপরতা মার্কিন শক্তিকে দুর্বল করতে মার্কিন আক্রোশের শিকার রাষ্ট্রগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে চীন বিচক্ষণতা প্রদর্শন করে।

তথাপি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মার্কিন সামরিক শক্তির কার্যকারিতা এখনও ফুরিয়ে যায়নি। যদিও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা চরমভাবে আক্রান্ত। সিরিয়ায় রুশ সেনা অভিযান ওই অঞ্চলে যুগান্তকারী পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত হয়। ইউক্রেন সংকটের ভেতর দিয়ে ইউরেশিয়া অঞ্চলে মার্কিন অর্থনৈতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা বিঘ্নিত হয়েছে। ন্যাট সম্প্রসারণের পূর্বাপর আকাক্সক্ষা শূন্যে উপনীত। এর মধ্যে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের শক্ত চ্যালেঞ্জ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চরম বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। যদিও একটি পূর্ণ যুদ্ধের আগে প্রতিপক্ষের মনোভাব এবং সক্ষমতা যাচাই করতেই দক্ষিণ চীন সাগরে সর্বশেষ তৎপরতায় অংশ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এটি চীনের কাছে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। কেননা ওই অঞ্চলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী না রাখলে চীনের সার্বভৌমত্বই হুমকির মুখেই পড়তে পারে।

ইউরোপ-আমেরিকা যখন অর্থনৈতিক মন্দায় আক্রান্ত চীন তখন শক্ত পুঁজির ওপর বসে আছে। বাণিজ্য আর পুঁজির এই চীনা শক্ত অবস্থানকে সম্মান করছে ইউরোপ এমনকি খোদ আমেরিকাও। কিন্তু সামরিক শক্তির জোরে পরোক্ষ সংঘাত চীন-মার্কিন প্রতিঘাত এখন প্রকাশ্য। উত্তেজনার পথ ধরে যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধ অমূলক নয়। বিশেষত দক্ষিণ চীন সাগরে যুদ্ধ প্রায় আসন্ন। সমঝোতার পথে উভয়পক্ষের আন্তরিকতার অভাব যুদ্ধের আশঙ্কাকে প্রতিনিয়ত বাড়িয়েই তুলছে।

লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক




Related posts