September 21, 2018

চীনা কোম্পানিকে কাজ দিতে প্রতিমন্ত্রী তারানার স্বাক্ষর জাল

ঢাকাঃ  ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের স্বাক্ষর জাল করে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে একটি চিনা কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তারই ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) জিএম আসিফ আল মামুন অভি। বিটিসিএলের একটি প্রকল্পের জন্য নির্বাচিত জেডটিইকে কোম্পানিকে কাজ না দিতে অর্থ বিভাগকে চিঠিও দেন অভি, যেন অন্য একটি চিনা কোম্পানি এ কাজ পায়।

এ ঘটনায় অভিকে সাময়িক বরখাস্ত এবং একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম তার স্বাক্ষর জাল করা প্রসঙ্গে বলেন, আমার নাম ভাঙিয়ে কেউ কোনো দিন অন্যায়-অবৈধ কাজ করতে পারবে না। কেউ যদি করেন, আমি যে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে এক মুহূর্তও কুণ্ঠাবোধ করব না। কারণ আমি আশপাশে কোনো কালো বিড়াল পুষব না।

সূত্রমতে, জিটুজি ঋণচুক্তি অনুযায়ী বিটিসিএলের ‘টেলিকমিউনিকেশন মডার্নাইজেশন’ প্রকল্পের কাজ পাবে চিনা কোম্পানি জেডটিই। এ কোম্পানি কাজ না পেলে ওই ঋণচুক্তিই বাতিল হয়ে যাবে। তাই জেডটিইকে কাজ দিতে মন্ত্রণালয়ের সব আয়োজন যখন প্রায় ঠিকঠাক, তখনই ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর স্বাক্ষর জাল করে তার পিও অভি ওই কোম্পানিকে কাজ না দিতে অর্থ বিভাগকে চিঠি দেন। ওই সময় তারানা হালিম দেশে ছিলেন না। দেশে ফিরে প্রতিমন্ত্রী যখন বুঝলেন তার স্বাক্ষর জাল করে ‘প্রতারণা’ করা হচ্ছে, তখনই তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এদিকে পিও অভি কী কারণে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন তা সুনির্দিষ্টভাবে কেউ বলতে পারেননি। তবে মন্ত্রণালয়ে কানাঘুষা আছে, চিনা আরেকটি কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দিতেই তিনি এ অনৈতিক কাজে জড়ান। তার বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনেরও অভিযোগ উঠেছে।

জালিয়াতি করে অর্থ বিভাগকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, ‘এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি না করে সীমিত আকারে দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করুন।’ এ চিঠি পাওয়ার পর বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। চিঠি পেয়ে অর্থ বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও বিস্মিত হন। যেখানে ঋণচুক্তির শর্ত হচ্ছে, ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে হবে; সেখানে এ ধরনের চিঠির অর্থ কী? বিষয়টি নিয়ে অর্থ বিভাগে বিস্তর আলোচনার পর তারানা হালিমের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা। তখনই জালিয়াতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

এরপর বিষয়টি নিয়ে প্রতিমন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। জানতে চান কীভাবে তার স্বাক্ষর জাল করা হলো এবং কে এই কাজ করল। শুরু হয় অনুসন্ধান। মন্ত্রণালয় খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, জাল স্বাক্ষরের চিঠি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠান প্রতিমন্ত্রীর পিও অভি। এ সংক্রান্ত অন্যান্য কাগজও তার কাছে ছিল।

এ ফাইল বিভিন্ন দপ্তরে নিয়ে আসার কাজও তিনি করেছিলেন। তখনই সবাই বুঝতে পারেন জালিয়াতির মূল ব্যক্তিটি পিও অভি। পরবর্তীকালে এ নিয়ে তারানা হালিমের জেরার মুখে অভি জালিয়াতির কথা স্বীকার করেন এবং আগামীতে এ ধরনের কাজ করবেন না বলে ক্ষমাও চান। কিন্তু তারানা হালিম তাকে কোনো রকম ছাড় দেননি। উল্লেখ্য, অভিকে প্রতিমন্ত্রী তার প্রিভিলেজ থেকে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ সূত্র জানায়, জালিয়াতির বিষয়ে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার পর ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম তাৎক্ষণিক তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পরই অভিযুক্ত অভির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম আমাদের সময়কে জানান, বিষয়টি অবহিত হওয়ার পর তিনি নিজেই খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন, তার স্বাক্ষর জাল করে অর্থ বিভাগে ওই চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগত কর্মকর্তার পদ থেকে অভিকে অব্যাহতি দেন। একই সঙ্গে কেন অভি এ ধরনের জালিয়াতি করেছেন এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা জানতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি অর্থ বিভাগকে তার স্বাক্ষর জাল করে চিঠি পাঠানোর বিষয়টি জানিয়ে ওই চিঠি অগ্রাহ্য করতেও মৌখিকভাবে জানান। তারানা হালিম বলেন, এই তদন্ত রিপোর্টে যদি প্রমাণ পাওয়া যায় সে দোষী তাহলে সেক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নিতে আমি কোনও ধরনের দ্বিধাবোধ করব না।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি টেলিকমিউনিকেশন মডার্নাইজেশন প্রকল্প নামে বিটিসিএলের অধীনে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পে বিনিয়োগের শর্তসহ বেশ কিছু কারণ দেখিয়ে বিনা দরপত্রে এ প্রকল্পের জন্য চীনা কোম্পানি জেডটিইর সঙ্গে এককভাবে চুক্তির জন্য বিটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব ফয়জুর রহমান চৌধুরী একটি প্রস্তাব তৈরি করেন। এ প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াধীন থাকা অবস্থাতেই প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের স্বাক্ষর জাল করে অর্থ বিভাগে চিঠি পাঠান তার পিও আসিফ আল মামুন অভি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অভিযুক্ত আসিফ আল মামুন অভি আমাদের সময়কে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তাই এ মুহূর্তে কিছু বলতে চাই না।

দৈনিক আমাদের সময় থেকে নেয়া।

Related posts