November 15, 2018

‘চায়ের অফারে দুর্নীতি ঢাকার চেষ্টা রেলে’

ঢাকাঃ বাংলাদেশ রেলওয়ের সহকারী স্টেশন মাস্টার (এএসএম) নিয়োগ বাণিজ্যে কর্মকর্তা এবং চাকরি প্রার্থীদের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছিল ওয়েলফেয়ার অফিসের প্রধান সহকারী মামুন। এতে মামুন অন্তত ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

কেবল নিয়োগ বাণিজ্যের টাকা নিয়ে ক্ষান্ত হয়নি মামুন। নিয়োগপত্র সরবরাহের সময় প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা করে নিয়েছেন বলে একাধিক প্রার্থী অভিযোগ করেছেন। এ টাকা চিফ পারসোনাল অফিসার অজয় পোদ্দার ও সিনিয়র পারসোনাল অফিসার শেখ আবুল কালামের নামে নিয়েছেন মামুন।

মোটা অংকের টাকা নিয়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে অজয় কুমার পোদ্দার বলেন, এ ধরনের কাজের সঙ্গে আমি জড়িত ছিলাম না।

এএসএম নিয়োগ নিয়ে কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি বলে তিনি দাবি করেন।

এদিকে প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা সংগ্রহের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন ওয়েলফেয়ার অফিসের প্রধান সহকারী মামুন।

তিনি বলেন, এসব আপনাকে কে বলেছে, তাকে আমার সামনে নিয়ে আসেন। অবশ্য পরে ফোন করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদর দফতর সিআরবিতে চায়ের দাওয়াত দিয়ে এই প্রতিবেদককে অনুরোধের সুরে বলেন, ‘আপনি দয়া করে এখনি সিআরবি আসেন। আপনার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে চাই।’

সহকারী স্টেশন মাস্টার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া একজন প্রার্থীর বাবা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমার মেয়ের নিয়োগপত্র দেওয়ার সময় এক হাজার টাকা দাবি করেছিল। এই টাকা নাকি চিফ পারসোনাল অফিসার ও সিনিয়র পারসোনাল অফিসারকে দিতে হবে।’

এ বিষয়ে চিফ পারসোনাল অফিসার অজয় কুমার পোদ্দার স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি। সরাসরি কথা বলার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘আপনি অফিসে আসুন। সামনাসামনি কথা বলবো।’

নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক ও পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের অতিরিক্ত সিওপিএস মো. রোকনুজ্জামান গত ১৮ জুলাই চীন সফরে গেছেন। চীন যাওয়ার আগে তিনি নিয়ম মেনেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন। বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নিয়োগ নিয়ে নিউজ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘নিউজ হলে আমি বিপদে পড়ে যাবো।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রেলওয়েতে ৩০০টি তৃতীয় শ্রেণির সহকারী স্টেশন মাস্টার পদের ১০ শতাংশ পদ সংরক্ষিত রেখে বাকি ২৭০টি শূন্য পদ পূরণের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। সে হিসেবে চট্টগ্রাম বিভাগের ফেনী জেলায় ১২ লাখ ৫ হাজার ৯৮০ জন জনসংখ্যার অনুপাতে প্রাপ্য পদ ছিল ২ দশমিক ৯২।

ফলাফলে দেখা গেছে, ওই জেলায় নিয়োগ পেয়েছেন মোহাম্মদ তৌফিক আজিজ, মো. মাঈনউদ্দিন, মীর মো. ইমাম উদ্দিন, মো. আব্দুল আজিজ, এনায়েত হোসেন ও মোহাম্মদ গোলাম রাসেল। জনসংখ্যার ভিত্তিতে তিনজনেরও কম নিয়োগ পাওয়ার কথা থাকলেও সেখানে ফেনী জেলায় নিয়োগ পেয়েছেন ৬ জন। রাজশাহী বিভাগে কোটাসহ সব মিলিয়ে নিয়োগ পাওয়ার কথা ছিল ৩৫ জনের, কিন্তু পেয়েছেন ৪০ জন। খুলনা বিভাগে ৩২ জনের স্থলে পেয়েছেন ৩৩ জন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রার্থী অভিযোগ করে বলেন, পরীক্ষা অনেক ভাল হয়েছে। কিন্তু টাকা দিতে না পারার কারণে আমাদের চাকরি হয়নি।

পূর্ব রেলের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, নিয়োগ কমিটি বিভিন্ন কাগজপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। নিয়োগে অনিয়মের সাথে রেলের ঊর্ধতন কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত থাকায় তারা পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে রেলের উচ্চ পর্যায়ে এবং দূদক তদন্ত করলে অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র উঠে আসবে।

জানা গেছে, গত বছরের ২৯ অক্টোবর পূর্বাঞ্চল রেলের চিফ পারসোনেল অফিসার অজয় কুমার পোদ্দার স্বাক্ষরিত ২৭০টি সহকারী স্টেশন মাস্টার পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। তৃতীয় শ্রেণির এই পদে নিয়োগ পেতে আবেদন জমা পড়ে প্রায় ৭০ হাজার।

এর মধ্যে যাচাই বাছাই করে ৬৮ হাজার জনকে লিখিত পরীক্ষার জন্য মনোনীত করা হয়। এর মধ্যে গত ৪ মার্চ লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেয় ৩৬ হাজার ৪১৩ জন। এতে উত্তীর্ণ হয় ৩ হাজার ৪২ জন। ওই পদের মধ্যে ঢাকা ও সিলেটের ১৩টি (কোটা) শূন্য রয়েছে।

৬০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর গত ২৫ এপ্রিল থেকে ৮ মে ৫০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পর ২৫৭ জনের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে রেলওয়ে। সূত্রঃ বা.নি.

Related posts