September 24, 2018

চাপাতির ব্যবহার হলেও সঙ্গে থাকছে অত্যাধুনিক অস্ত্র


ঢাকাঃ  অধ্যাপক,নির্মমভাবে হত্ ব্লগার বা মুক্তমনা লেখকদের কুপিয়ে যা করা হচ্ছে। হত্যা-কাণ্ডগুলোতে চাপাতির ব্যবহার হলেও উগ্রপন্থিদের সঙ্গে কিন্তু থাকছে অত্যাধুনিক সব অস্ত্র। নিজেদের স্টাইল বা বীভত্সভাবে খুন করতে তারা চাপাতির ব্যবহার করে, প্রয়োজন হলে তারা গুলি ছোঁড়ে। এসব অপারেশনে যেসব অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে সেগুলো অত্যাধুনিক।

রাজধানীতে কলাবাগান এলাকায় জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয়কে হত্যার পর খুনিরা চলে যাওয়ার সময় পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। সেখানে একজন পুলিশ সদস্য খুনিদের একটি ব্যাগ রেখে দিতে সমর্থ হয়। তার মধ্যে পাওয়া গেছে বিশেষ ধরনের একটি পিস্তল। এই পিস্তলের ব্যারেলের গুলি বেরুনোর দু’টি মুখ। সেখানে যে গুলি পাওয়া গেছে সেটি জার্মানির তৈরি। পিস্তলটির নাম এখনো বের করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

এদিকে বগুড়ায় আবারও নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) এক সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। তার কাছ থেকে অত্যাধুনিক একে-২২ বোর রাইফেল উদ্ধার করা হয়েছে। এটা একে-৪৭-এর মতই কার্যকর। তবে একে-২২ রাইফেল আকারে একটু ছোট। এর আগেও বগুড়াতে এই অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। শেরপুরে শিয়া মসজিদে যে হামলা হয়েছে সেখানে এই অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছে সেখানকার পুলিশ।

অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকার পরও উগ্রবাদীরা কেন চাপাতি ব্যবহার করে। এমন প্রশ্নের জবাবে একজন বিশ্লেষক বলেন, বীভত্সতা ও নিজস্ব স্টাইলের কারণে ওরা চাপাতির ব্যবহার করে। কাউকে গুলি করে মারলে তারাই যে মেরেছে সেটা প্রমাণ করা কঠিন। এই উগ্রবাদীরা মনে করে, যাকে তারা হত্যা করছে- তার অপরাধের মাত্রা এতই বেশি যে, তার মৃত্যু কঠিনভাবে হওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে চাপাতি দিয়ে ঘাড়ে কুপিয়ে হত্যাকেই তারা সঠিক মনে করে।

কলাবাগানের ঘটনায় পাওয়া অস্ত্রের বর্ণনা পুলিশ এজাহারে দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ব্যাগের ভেতর থেকে একটি লোহার তৈরি পিস্তল, যার ফায়ারিং পিন হতে ব্যারেলের মাথা পর্যন্ত লম্বা আনুমানিক সাত ইঞ্চি। একটি লোহার তৈরি ম্যাগাজিন, যার গায়ে ইংরেজিতে অস্পষ্ট লেখা রয়েছে। ম্যাগাজিনের ভেতরে তিন রাউন্ড গুলি। এই আগ্নেয়াস্ত্রটি দুটি অংশে বিভক্ত। সম্মুখ অংশে ব্যারেলের মত দুটি ছিদ্র এবং পেছনে হাতলের অংশে দু’টি পিনের সঙ্গে চাবির রিংয়ের মতো, চাবির রিং স্প্রিংয়ের মতো ওঠানামা করে। ব্যারেলের ছিদ্র দুটি দুই রাউন্ড গুলিভর্তি, আগ্নেয়াস্ত্রটি লম্বা আনুমানিক সোয়া ছয় ইঞ্চি, দুই রাউন্ড গুলির প্রতিটির পেছনে কে.এফ ৭ পয়েন্ট ৬৫ ইংরেজিতে লেখা রয়েছে। তবে এই অস্ত্রের নাম জানাতে পারেনি পুলিশ।

সার্চ ইঞ্জিন গুগলের সহায়তা নিয়ে এই গুলির ব্যাপারে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে দেখা গেছে, এটি একটি প্যারাবিলাম পিস্তল। এটি জার্মানিতে ১৮৯৮ সালে প্রথম তৈরি হয়। ১৯০০ সালে এই পিস্তল তৈরির ফর্মুলা সুইজারল্যান্ড, ব্রাজিল, পর্তুগাল, ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র আয়ত্ব করে। সুইজারল্যান্ড সেনাবাহিনীতে প্যারাবিলাম পিস্তল ব্যবহার হয়ে থাকে। এটিকে নাইন এমএম প্যারাবিলাম পিস্তল বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে এর ব্যবহার দেখা যায় না।

বগুড়ায় একে-২২ রাইফেলসহ একজন গ্রেফতারঃ বগুড়ায় স্বয়ংক্রিয় একে-২২ বোরের রাইফেলসহ জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের ইসাবা গ্রুপের সদস্য আবদুল মোমিনকে (২৫) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল বুধবার ভোররাতে জেলার শাজাহানপুর উপজেলার কামারপাড়া গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে তাকে আটক করা হয়। এসময় তার কাছ থেকে আরো একটি বিদেশি পিস্তল, গুলি ও ম্যাগজিন উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ তাকে ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। পুলিশের দাবি, শিবগঞ্জে বহুল আলোচিত শিয়া মসজিদে গুলি করে মুয়াজ্জিনকে হত্যার কাজে উদ্ধারকৃত রাইফেলটি ব্যবহার করা হয়েছিল। গ্রেফতারকৃত আব্দুল মোমিন বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার কামারপাড়া গ্রামের মৃত মোজাহার আলীর ছেলে এবং বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান জানান, মোমিনের বাড়িতে জেএমবি সদস্যদের মিলিত হওয়ার গোপন সংবাদ পেয়ে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল সেখানে অভিযান চালায়। এসময় অন্যরা পালিয়ে গেলেও মোমিনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে বাড়ি তল্লাশি করে আমেরিকায় তৈরি একটি একে-২২ বোর রাইফেল, রাইফেলের ৩টি ম্যাগজিন, একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়।

বগুড়া সিআইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অত্যাধুনিক একে-২২ রাইফেল অত্যন্ত কার্যকরী একটি অস্ত্র। এটির ডিজাইনার রুমানিয়ার নাগরিক মিখাইল কালাশনিখভ। একে-২২ রাইফেল মূলত একটি সেমি অটোমেটিক রাইফেল। এটি একে-৪৭ এর আধুনিক সংস্করণ। দুটো রাইফেল দেখতে অনেকটা একই রকম হলেও পার্থক্য হল একে-২২ আকারে ছোট। আর ছোট হওয়ায় এই অস্ত্রের কদর জঙ্গিদের কাছে বেশি। ছোট হওয়ায় এটি বহন করা সহজ, ব্যবহারও সুবিধাজনক। বগুড়া ডিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, একে-২২ অস্ত্রটি সিঙ্গেল গুলি, পরপর গুলি ও লাগাতার গুলি করতে পারে। একসাথে এর ম্যাগজিনে ২২টি গুলি থাকে। প্রয়োজনে যা বাড়ানো সম্ভব।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, অভিযানকালে পুলিশকে লক্ষ্য করে মোমিন একে-২২ রাইফেল ব্যবহার করে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। পুলিশ দাবি করেছে, শিয়া মসজিদে গুলি করে মুয়াজ্জিনকে হত্যার কাজে উদ্ধারকৃত রাইফেলটি ব্যবহার করা হয়েছিল। মোমিন গরিব পরিবারের সন্তান। বাসায় টিউশনি করে সংসার চালান। মোমিনের সাথে ২ বছর আগে শাজাহানপুর বি-ব্লকে মসজিদে নামাজ শেষে ২ জন লোকের সাক্ষাত্ হয়। তারা আগে থেকেই মোমিনুলকে ফলো করতো। সেখানেই তাকে জিহাদের পথে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয়। এরপর টানা দুই বছর জেএমবির তত্ত্ববধানে অস্ত্র চালনা, বোমা হামলার উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। তিনি এখন জেএমবির ইসাবা গ্রুপের সক্রিয় সদস্য।

বগুড়া গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, ২০১৩ সালে পুলিশ প্রথম একে-২২ রাইফেল উদ্ধার করে। ওইদিন কর্ণফুলী সেতুর মইজ্জারটেক এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি একে-২২ রাইফেল পাওয়া যায়। এরপর চট্টগ্রামে আরও কয়েকটি জায়গা থেকে এ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ আস্তানা থেকে সন্ত্রাসীদের আস্তানা থেকে বেশ কয়েকটি একে-২২ উদ্ধার করা হয়। তবে উত্তরাঞ্চলে এ ধরনের অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা এটিই প্রথম।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন ডেরি/২৭ এপ্রিল ২০১৬

Related posts