September 25, 2018

চাঞ্চল্যকর মামলাও ফাইলচাপা পড়ছে

এ বছরের ১৩ আগস্ট। রাজধানীর বাড্ডার আদর্শনগরে জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির সভার পর সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান সোহেল ওরফে গামা, ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শামসুদ্দিন মোল্লা, স্থানীয় আল-সামি হাসপাতালের ব্যবস্থাপক ফিরোজ আহমেদ মানিক ও গ্যারেজ মালিক আবদুস সালাম। সন্ধ্যার সময় তাদের প্রকাশ্যে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ জানায়, স্থানীয় দুই পক্ষের অধিপত্যের বিরোধে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ১৬ আগস্ট ফারুক মিলন ও নূর মোহাম্মদ নামে দুজন গ্রেপ্তারও করে পুলিশ। তবে এরপর তদন্তে আর দৃশ্যই অগ্রগতি নেই। প্রধান আসামি বা হত্যাকারী, কেউই গ্রেপ্তার হয়নি।

এভাবেই সময়ের সঙ্গে আড়ালে চলে যাচ্ছে অনেক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। একটা বড় ধরনের অঘটন ঘটার পর পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে তদন্তে। সময়ের পালাবদলে এক সময় তা গতি হারায়। এরইমধ্যে ঘটে যায় আরেক ঘটনা। সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমের মত তখন তদন্তকারীরাও ছুটতে থাকে নতুনটার পেছনে। রহস্য আর উন্মোচিত হয় না। গত তিন বছরে ঘটে যাওয়া অর্ধশতাধিক ঘটনার তদন্তের গতি-প্রকৃতির ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে মিলেছে এমনই তথ্য। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হৈচৈ বা আলোচনা চলার সময় কিছুদিন ঘটনাগুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করেন সংশ্লিষ্টরা। এক পর্যায়ে দেখা দেয় সেই চিরাচরিত ঢিলেমি। আর বেশিরভাগ ঘটনার কূল-কিনারা করতে না পারায় তদন্ত সংশ্লিষ্টদের অদক্ষতাও প্রকট হয়ে ওঠে।

তবে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দাবি, পুরনো ঘটনাকেও সমান গুরুত্ব দেন তারা। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘নতুন কোনো ঘটনা ঘটলে পুরনোটার তদন্ত থেমে যায়- এ বক্তব্য ঠিক নয়। সব মামলাই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হয়। দুই বিদেশি হত্যাসহ যে ক’টি আলোচিত ঘটনা ঘটেছে, তার বেশিরভাগেরই রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে।’ তিনি আরো জানান, চাঞ্চল্যকর সব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে, আর কিছু মামলা মনিটরিং সেলে আছে।

প্রকাশকের ওপর হামলা : গত ৩১ অক্টোবর রাজধানীর লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল, লেখক রনদীপম বসু ও কবি তারেক রহিমকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। প্রায় একই সময় শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে এর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। আজিজ সুপার মার্কেটের সিসিটিভি ক্যামেরায় সন্দেহভাজনক কয়েক যুবকের চেহারা ধরা পড়ে। তবে ওই পর্যন্তই। আজও খুনি ও হামলাকারী শনাক্ত হয়নি। ডিবির উপকমিশনার (ডিসি-দক্ষিণ) মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, ‘আনসারুল্লাহ বাংলাটিম এসব ঘটনায় জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছবি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
বিদেশি হত্যা-গুলি: প্রকাশনায় হামলার আগে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল বিদেশি হত্যা। গত ২৮ সেপ্টেম্বর গুলশানে খুন হন ইতালির নাগরিক সিজারে তাভেল্লা। এ ঘটনায় গত ২৫ অক্টোবর চার বিএনপি কর্মীকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। ২৬ অক্টোবর থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত চারজন আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়। আসামি কালা রাসেল ও চাকতি রাসেল জবানবন্দিতে নির্দেশদাতা হিসেবে ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার এম এ কাইয়ুমের ছোট ভাই এম এ মতিনের নাম জানায়। গত ৪ নভেম্বর বেনাপোল থেকে মতিনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তিনি এখনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। উদ্ধার হয়নি হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রটিও।

এদিকে তাভেল্লা খুনের ঘটনায় যখন দেশে-বিদেশে তোলপাড় চলছিল, তখন ৩ অক্টোবর জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে রংপুরের কাউনিয়ায় তিন দুর্বৃত্ত গুলি করে হত্যা করে। পরে পাঁচ সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হোশির ব্যবসায়ীক অংশিদার হুমায়ুন কবির হীরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, হত্যার ছক তৈরি করেছিলেন রংপুর জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি কামাল হায়দার। রাজনৈতিক গুরু বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাবিব উন নবী খান সোহেলের নির্দেশনা অনুযায়ী কামাল এই পরিকল্পনা কষেন। তবে হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র বা মোটরসাইকেল উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। তদন্ত থমকে আছে সন্দেহেই। রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মামলাটির তদন্ত চলছে। মিডিয়ায় বলার মত এখনো কিছু পাওয়া যায়নি।’
সময়ের সঙ্গে যখন গুরুত্ব হারাচ্ছে দুই বিদেশী হত্যার মামলা, ঠিক তখন ঘটে আরেক ঘটনা। গত ১৮ নভেম্বর দিনাজপুর শহরের মির্জাপুর বিআরটিসি বাস ডিপো এলাকায় ইতালির আরেক নাগরিক ও রোমান ক্যাথলিক যাজক ডা. পিয়েরো ক্যারো লারিকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। তবে প্রাণে বেঁচে গেছেন তিনি। ঘটনার পর জামায়াতের জেলা কমিটির সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ভুট্টুসহ ১০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে হামলাকারীরা শনাক্ত হয়নি। তদন্তের এই ধোয়াশার মধ্যেই গত সপ্তাহে আহত পিয়েরো ক্যারো লারি নিজ দেশে ফিরে গেছেন। ইতালির মিলানে ফেরার সময় তিনি বলে গেছেন, তার বাবা মারা গেছে। বাবার শেষকৃত্ব করতেই যেতে হচ্ছে।

শিয়া জমায়েতে হামলা: ২৩ অক্টোবর রাতে রাজধানীর লালবাগে হোসনি দালানে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিকালে বোমা হামলা চালিয়ে দুজনকে হত্যা ও শতাধিক ব্যক্তিকে আহত করে দুর্বৃত্তরা। দেশের ইতিহাসে এমন হামলা নজীরবিহীন। ২৫ নভেম্বর পাঁচ জেএমবি সদস্যকে গ্রেপ্তার করে ডিবি এবং দারুসসালামে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আলবানি ওরফে মাহফুজ নামে এক জেএমবি নেতা নিহত হয়। ডিবির দাবি, মাহফুজই হোসনি দালানে হামলা চালায়। তবে বাকিদের এখনো খুঁজে পায়নি পুলিশ। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ২৬ নভেম্বর বগুড়ার শিবগঞ্জে শিয়া মসজিদে বড় ধরনের হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এবার গুলিতে মুয়াজ্জিন মোয়াজ্জেম হোসেন নিহত এবং ইমামসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। এ ধরনের হামলাও দেশে এই প্রথম। সন্দেহভাজন কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করছে পুলিশ। তবে রহস্য উদঘাটন হয়নি এখনো।
পুলিশ হত্যা: গত ১৯ অক্টোবর রাতে রাজধানীর গাবতলীতে পুলিশের চেকপোস্টে এএসআই ইব্রাহিম মোল্লাকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ মাসুদ রানা ওরফে সুমন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে। তথ্য মিলে- বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সাবেক শিবির নেতা এনামুল হক কামালের নেতৃত্বে ইব্রাহিমকে হত্যা করা হয়। ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে কামরাঙ্গীরচর থেকে বোমাও উদ্ধার করে পুলিশ। তবে প্রধান আসামি এনামুলসহ জড়িতদের হদিস মেলেনি এখনো। পুলিশের দাবি, বড় ধরনের নাশকতার পরকিল্পনাকারীরা তল্লাশির মুখে পরে এএসআই ইব্রাহিমকে হত্যা করে। এমন তথ্য পেয়ে দায়িত্ব পালনে সতর্ক থাকতে বলা হয় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের। তবে এরই মধ্যে খুন হন আরেক পুলিশ সদস্য। গত ৪ নভেম্বর আশুলিয়ার বড়ৈপাড়ায় পুলিশের চেকপোস্টে কনস্টেবল মুকুলকে হত্যা করে মোটরসাইকেল আরোহী দুই যুবক। ২২ দিন পর পুলিশ জানায়, জেএমবির জঙ্গিরাই ঘটনাটি ঘটিয়েছে। পুলিশের গুলিতে নিহত মাহফুজ ওই হত্যায়ও অংশ নেয়। তবে অন্যজনকে খুঁজে পায়নি পুলিশ। এখনো জানা যায়নি, এই খুনের পরিকল্পনাকারীরা কারা।

ভিন্ন মতাদর্শীদের ওপর আক্রমণ : ৫ অক্টোবর রাজধানীর মধ্য বাড্ডায় জবাই করা হয় পিডিবি’র সাবেক চেয়ারম্যান ও পীর খিজির খানকে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার জেএমবি সদস্য তারিকুল ইসলাম তারিক ওরফে মিঠু ২৫ অক্টোবর আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়। ২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর গোপীবাগের বাসায় কথিত পীর লুৎফর রহমান ফারুকসহ ছয়জনকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২৭ নভেম্বর মিঠু ওই হত্যার দায়ও স্বীকার করেন। তিনি জানান, ধর্মীয় মতাদর্শের বিরোধের কারণেই দুই হত্যাকাণ্ড ঘটে। গত বছরের ২৭ আগস্ট পূর্ব রাজাবাজারে শায়খ মাওলানা নূরুল ইসলাম ফারুকীকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এই হত্যাও জেএমবি সদস্যরা ঘটিয়েছে বলে সন্দেহ গোয়েন্দাদের। তবে খুনিরা এখনো অধরা। গত ৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের বাংলাবাজারে ‘লেংটা’ ফকির রহমত উল্লাহ এবং তার খাদেম আব্দুল কাদেরকে হত্যা করা হয়। ৬ অক্টোবর খোয়াজনগর আজিমপাড়া থেকে জেএমবি সদস্য জাবেদসহ পাঁচ জনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তবে এই খুনে জড়িত অন্যরা এখনো অধরা।

একই ধরনের হত্যাকাণ্ড, ২০১৩ সালের ৮ আগস্ট খুলনার খালিশপুরে পীর তৈয়েবুর রহমান ও তার ছেলে নাজমুম মনিরকে জবাইয়ের রহস্য এখনো অজানা। ২০১০ সালে উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরে জেএমবির দলছুট সদস্য রাশিদুল ইসলামকে ঘাড়ে ও মাথায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনা যখন আলোচনায়, তখন গত ১০ নভেম্বর রংপুরে কাউনিয়ায় মাজারের খাদেম রহমত আলীকে একই কায়দায় গলাকেটে হত্যা করা হয়। সর্বশেষ গত ১২ নভেম্বর নীলফামারীর সৈয়দপুরে তাজিয়া কারবালার খাদেম হাসনাইনকে নামাজে সিজদারত অবস্থায় ঘাড়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে দুর্বৃত্তরা। তবে প্রাণে বেঁচে গেছেন তিনি। রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি এই দুই ঘটনার।

দেশে বিদেশি হত্যা ও ভিন্নমতার্দীদের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণের ঘটনার পর নতুন আতংক তৈরি করেছে খ্রিস্টান ধর্মজাযকদের ওপর হামলা ও হুমকির ঘটনা। গত ৫ অক্টোবর পাবনার ঈশ্বরদীতে ধর্মযাজক লুক সরকারকে গলাকেটে হত্যার চেষ্টা হয়। ২৬ নভেম্বর রংপুরে ১০ জন খ্রিস্টান যাজককে হত্যার হুমকি আসে। ২৭ নভেম্বর খুলনার সোনাডাঙ্গায় দুই ধর্মযাজককে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। পাবনার ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি পুলিশের। তবে বাকিগুলো এখনো রহস্যঘেরা।

ব্লগার হত্যা: ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পল্লবীতে ব্লগার রাজীব হায়দারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ছয় শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হলেও পরিকল্পনাকারী রেদওয়ানুল আজাদ রানা এখনো পলাতক। এরপর একে একে আর ছয় ব্লগার খুন হয়। ৩০ মার্চ তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়ীতে হত্যা করা হয় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে। ঘটনার তদন্ত শেষ হলেও পরিকল্পনাকারী জুনায়েদ ওরফে তাহের ও হাসিব ওরফে আব্দুল্লাহ ওরফে বড় ভাই আড়ালেই থেকে গেছে। গত ৭ আগস্ট গোড়ানে ব্লগার নিলাদ্রী চট্টপাধ্যায় নিলয়কে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করে চার দুর্বৃত্ত। এ ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় হলেও খুনিদের নাগাল পায়নি তদন্তকারীরা। কোথাও নেই অগ্রগতির কোনো তথ্য। এর আগে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে ব্লগার অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ব্যাপকভাবে আলোচিত এই ঘটনায় এফবিআইর সহায়তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। কয়েকদিন পরই এর অগ্রগতি হারিয়ে যায় অন্ধকারে। ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, আমরা কয়েকজন সন্দেহভাজনের ছবি পেয়েছি। শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এফবিআই কিছু আলামত নিয়েছে। আমরা এখনো সেসব প্রতিবেদন পাইনি।

এদিকে গত ১২ মে সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাসকে একই কায়দায় কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। গত ২৮ আগস্ট সিআইডি সিলেটের কানাইঘাট থেকে উগ্রবাদী ব্লগার মান্নান রাহী ও তার ছোট ভাই মোহাইমিন নোমান ওরফে এএএম নোমানকে গ্রেপ্তার করে। ২ সেপ্টেম্বর মান্নান রাহী আদালতে স্বীকারোক্তিমূরক জবানবন্দি দেন। এই পর্যন্তই অগ্রগতি।হত্যায় কারা জড়িত তা প্রকাশ হয়নি আজও। অন্যদিকে গত বছর আশুলিয়ায় হত্যা করা হয় ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও ব্লগার আশরাফুল আলমকে। এই ঘটনার নেপথ্যের কারণ এখনো জানা যায়নি।

বর্ষবরণে শ্লীলতাহানী: গত ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে এক নারীকে বিবস্ত্র করার চেষ্টা করে কয়েকজন বখাটে যুবক। এই ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় হয়। তবে দুর্বৃত্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এ নিয়ে সমালোচনার মুখে পুলিশের আইজি সংবাদ সম্মেলন করে আট বখাটের ছবি প্রকাশ করেন। এসময় বখাটেদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়। তবে সাত মাসেও শনাক্ত হয়নি তারা।
চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা: গত তিন বছরে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি রহস্যে ঢেকে গেছে। গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে ফিল্মি স্টাইলে এক পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে জেএমবির দুর্ধর্ষ তিন জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয় সহযোগীরা। ব্যাপক আলোচিত এই ঘটনার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ছিনতাই হওয়া দুই জঙ্গি সালেহীন ও বোমা মিজানের অবস্থান এখনো জানা যায়নি।

গত ২১ এপ্রিল আশুলিয়ার কাঠগড়ায় বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ডাকাতি ও আটজনকে হত্যার ঘটনা দেশে ব্যাপক তোলপাড় হয়।১১ আসামি গ্রেপ্তারের পর আব্দুল্লাহ আল বাকী ওরফে মাহফুজ ওরফে হাফিজ ও আসিফ আজওয়াদ নামে দু’জনের নাম পায় পুলিশ। বন্দুকযুদ্ধে নিহত মাহফুজই সেই ব্যক্তি বলে দাবি করছে পুলিশ। গত রোববার এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ। তবে গ্রেপ্তার করা যায়নি আসিফ আওয়াদকে।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আটজনকে গ্রেপ্তারের পরও রহস্যজট খোলেনি। তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাব আলামত ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তদন্ত করছে বলে আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে দাবি করছে।

২০১২ সালের ৩১ জুলাই দক্ষিনখানে একটি বাড়িতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার নাছির উদ্দিন ও তার স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মুক্তাকে হত্যা করা হয়। কেন এ হত্যা- এ প্রশ্নের জবাব মিলেনি সাড়ে তিন বছরেও।
২০১৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর উত্তর বাড্ডায় গুলি করে হত্যা করা হয় ফারুক ও মিলনকে। দীর্ঘদিনেও চাঞ্চল্যকর এ জোড়া খুনের কূল-কিনারা হয়নি।
২০১০ সালের ১৬ এপ্রিল রাতে চট্রগ্রাম ছাত্রলীগ কর্মী আসাদুজ্জামান আসাদ এবং ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী দিবসে শহীদবেদিতে ফুল দেওয়া নিয়ে তাপস সরকার খুন হন। এই দুটি মামলার তদন্ত এখন হিমঘরে।
গত বছরের ৩০ জুলাই রাতে কমলাপুর আইসিডিতে আনসার সদস্য এমদাদুল হক খুন হন। তবে খোলেনি রহস্যজট। ২০১৩ সালের ১২ জুন রাতে দৈনিক বাংলার মোড়ে চলন্ত মাইক্রোবাস থেকে ফেলে দেয়া হয় সরকার দলীয় এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর ব্যক্তিগত সহকারী আমির হোসেন কাঞ্চনের লাশ।

গত বছরের ১৪ জুন মিরপুরের কালশীতে বিহারী পল্লীতে হামলা এবং অগ্নিসংযোগ করে ১০ জনকে হত্যার ঘটনায় কারা জড়িত, তাও জানা যায়নি এক বছরে।
গত ৩০ জানুয়ারি রামপুরার মহানগর আবাসিক এলাকার বাসায় খুন হন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সাবেক ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক প্রয়াত আখতার-উল-আলমের মেয়ে ফাহমিদা আখতার বিথন। সিআইডি তদন্ত করেও চাঞ্চল্যকর এই হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি।
গত ১৪ জুলাই যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইলের কাজিওগাঁও এলাকায় বাড়ির ফটকে গুলি করে হত্যা করা হয় ব্যবসায়ী মজিবুর রহমানকে।

১৮ আগস্ট রাতে ওয়ারীতে ৩১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নানকে তার বাড়ির সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় রনি ও শাহজালাল নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও রহস্য এখনো অজানা।
গত ১৩ মে পল্লবীর ২০ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাড়িতে খুন হন গৃহবধূ সুইটি খাতুন ও তার মামাশ্বশুর আমিনুল ইসলাম। এ জোড়া খুনে শাহিন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও রহস্য উন্মোচিত হয়নি। ধানমণ্ডি জামে মসজিদের খাদেম হত্যা মামলারও কূল-কিনারা হয়নি দীর্ঘ দিনেও।

Related posts