November 16, 2018

চাই নিরক্ষরমুক্ত আত্মনিভর্রশীল ডিজিটাল বাংলাদেশ

downloadমো. আলাউদ্দিন মজুমদার: মানুষের একটি জন্মগত অধিকার হচ্ছে স্বাক্ষরতা। সাধারণত স্বাক্ষরতা বলতে অক্ষর জ্ঞান সম্পন্নতাকে বোঝায়। তবে এক সময় শুধু স্বাক্ষর জ্ঞানকেই স্বাক্ষরতা বলা হতো। কিন্তু দিন দিন এর পরিধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। লোক গণনার অফিসিয়াল ডুকুমেন্টে বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিসরে স্বাক্ষরতা শব্দের প্রথম উল্লেখ ১৯০১ সালে। তখন নিজের নাম লিখতে যে কয়টি বর্ণমালা প্রয়োজন তা জানলেই তাকে স্বাক্ষর বলা হতো। ১৯৪০’র দিকে পড়ালেখার দক্ষতাকে স্বাক্ষরতা বলে অভিহিত করা হতো। আর ষাটের দশকে পড়া ও লেখার দক্ষতার পাশাপাশি সহজ হিসাব-নিকাশের যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষকে স্বাক্ষর সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গণনা করা হতো। আশির দশকে লেখাপড়া ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি সচেতনতা ও দৃশ্যমান বস্তুসামগ্রী পঠনের ক্ষমতা স্বাক্ষরতার দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃত হয়। বর্তমানে এ স্বাক্ষরতার সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা, ক্ষমতায়নের দক্ষতা, জীবন নির্বাহী দক্ষতা, প্রতিরক্ষায় দক্ষতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাও সংযোজিত হয়েছে।

সূত্র মতে সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের বর্তমান স্বাক্ষরতার হার ৬২ দশমিক ৬৬ ভাগ। তবে দেশে স্বাক্ষরতার হার নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যেই। স্বাক্ষরতা মানুষকে সচেতন করে তোলে আর আতœনিভর্রশীল হয়ে উঠতে শক্তি জোগায়। কোন দেশের দারিদ্রতা দূরীকরনের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষার পূর্বশর্ত হচ্ছে সাক্ষরতা। তাই নিরক্ষর মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে আগে চাই স্বাক্ষর সমাজ। কারণ, স্বাক্ষর সমাজ মানেই বাস্তববাদী ও যুক্তিবাদী জনগন। বাংলাদেশকে ক্ষুদা দারিদ্র ও দূর্নীতিমুক্ত একটি সুখি সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে এসব স্বাক্ষরদের ভূমিকার বিকল্প নেই। আমরা বর্তমানে সবার জন্য শিক্ষা কার্যক্রমের লক্ষমাত্রা অর্জনে এখনো অনেক পিছিয়ে।

জাতীয় অভিশাপ নিরক্ষরতা দূরীকরনের জন্য বাংলাদেশ গত ৩০ বছর ধরে আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবসে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করে আসছে। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে পথযাত্রা, সভা সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, গোলটেবিল বৈঠক ইত্যাদি। প্রতি বছর আমরা ধারন করছি নতুন নতুন প্রতিপাদ্য ও স্লোগান। জাতীয়ভাবে অঙ্গীকার করা হচ্ছে বাংলাদেশকে নিরক্ষরমুক্ত করা হবে। কিন্তু এতকিছুর পরও কি দূর হচ্ছে নিরক্ষরতা? নাকি দায়সারা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করছে রাষ্ট্র! সরকারের পাশাপাশি নিরক্ষরতা দূরীকরনে কাজ করে যাচ্ছে গনস্বাক্ষরতা অভিযান, ব্রাক, সেভ দ্য চিলড্রেন, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, ঢাকা আহছানিয়া মিশনের মত বিভিন্ন বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা। তাদের বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য বৈদেশিক ফান্ড যোগাচ্ছে দাতাগোষ্ঠীরা। নিরক্ষরতা দূরীকরনে প্রাথমিক ও গনশিক্ষা মন্ত্রনালয়েরও রয়েছে বিভিন্ন প্রকল্প।

গত কয়েকবছরের দেশের সাক্ষরতা পরিস্থিতির চালচিত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তুলনামূলকভাবে প্রতি বছরেই প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাক্ষরতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছুটা অগ্রগতি কিছুটা লক্ষ করা গেলেও তবে তা যে মাত্রা ও গতিতে হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি আজও। বিগত দশকে প্রাথমিক শিক্ষা বিশেষ করে শিশু স্কুলে ভতির্র ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও বয়স্ক নিরক্ষরতার চিত্র খুবই হতাশাব্যাঞ্জক। আমারা আজ চরম লজ্জিত হচ্ছি এই কারণে যে, রক্তাক্ত মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পরি সমাপ্তির প্রায় ৪৫ বছর পার হয়ে গেলেও এখনও আমাদের স্বাক্ষরতা নিয়ে আলোচনা করতে হচ্ছে। কারন সরকারি বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী এদেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বঞ্চিত শিক্ষার আলো থেকে। ইউনিসেফের তথ্যমতে প্রতি চার জনে একজন শিশু স্কুলে যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী দেশের বিপুল সংখ্যক প্রতিবন্ধী শিশু পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার অভাবে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। কারণ, দেশের ১৮ লাখের অধিক স্কুল গমনোপযোগী শিশুদের মধ্যে মাত্র তিন ভাগ স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষ পরিস্থিতি গবেষনা প্রতিবেদনমতে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাথমিকে ৫৯ শতাংশ এবং মাধ্যমিক স্তরে ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে।

নিরক্ষরতা দূরীকরনে জাতীয় নীতিমালা ও কর্মকৌশল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী অঙ্গীকারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার অঙ্গীকার করা হলেও বিগত কয়েক বছরে এসব বিষয় নিয়ে দেখা যায়নি কোন উদ্যোগ বা তৎপরতার। শহর অঞ্চলের কিছুসংখ্যক বিদ্যালয়ের ভর্তি যুদ্ধের তীব্রতা আর বিদ্যালয়ের উপস্থিতির সংখ্যা শতভাগ হলে আমরা আত্মœতুষ্টিতে ভুগি। কিন্তু যখন উপরের পরিসংখ্যানগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায় আমাদের দেশের সার্বিক স্বাক্ষরতা পরিস্থিতি। তবে জাতীয় পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে যে বিষয়টি ভাববার বিষয় হল নিরক্ষরতা দূরীকরনে যেসব প্রতিজ্ঞা, প্রতিশ্রুতি, লক্ষমাত্রা ও কর্মসূচির বিষয়ে যেসব ঘোষনা এসেছে তা যথাযথ ভাবে কাজের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। এ অভিযোগটি যেমন বাংলাদেশের জন্য সত্য আর বিশ্বসম্প্রদায়ের জন্যও প্রযোজ্য। আর এর দায় কেউই এড়িয়ে যেতে পারবেনা।

এখন শুধু একটাই প্রশ্ন কত দিনের মধ্যে রাষ্ট্র সকল নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করবে শিক্ষা। কবে স্বাক্ষরতার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে কাঙ্খিত অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথে। কবে কমবে সমাজের অস্থিতিশীলতা, অস্থিরতা এবং অশান্তি। এর জন্য আমাদের প্রধান লক্ষ হওয়া উচিত শতভাগ স্বাক্ষরতা অর্জন। এজন্য দরকার সরকারের আন্তরিকতা, বেসরকারী উন্নয়ন সংগঠন সমূহের সহযোগিতা এবং সর্বস্তরের জনগনের অশংগ্রহন। এজন্য জনগনকে আমাদেরই উৎসাহিত করে তুলতে হবে। অবসান ঘটাতে হবে দুঃখজনক কলঙ্কিত এ অধ্যায়ের। সরকারকে শিক্ষার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। করতে হবে জাতীয় করন। শিক্ষা কখনো সুযোগ হতে পারেনা, এটা হবে অধিকার। নিপীড়িত, শোষিতদের মুক্তির হাতিয়ার।

“সামনে আরো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে” -কবি রবার্ট ফ্রস্ট এই কথাটিকে ভিত্তি না করে আজই আমাদের নেমে পড়তে হবে কাজে। শুধু সরকারের উপর সব দায়ভার চাপিয়ে আমরা কখনোই দায়িত্বমুক্ত হতে পারব না। সকলের সম্মিলিত প্রয়াস ছাড়া সরকার ও বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা একা একা নিরক্ষরতা দূর করতে পারবেনা, যদি না আমরা এটাকে সামাজিক গণ আন্দোলনে পরিনত করতে না পারি। বাংলাদেশটা আমাদের। নিরক্ষরদের বোঝায় আমাদের আজ বাংলা মায়ের বদনখানি মলিন। তাই আমদের নয়ন শুধু জল ভাসালে চলবে না জাতীয় সংঙ্গীতের শেষ পংক্তিমালারমত। এক একটি আলোর কনায় যদি লক্ষ প্রদীপ জ্বলতে পারে; একটি মানুষ যদি মানুষের মত মানুষ হয়, তবে যদি বিশ্ব জগত টলতে পারে। তবে আমরা নিজেদের শিক্ষিত ও সভ্য মানুষ দাবী করলেল কেন আমাদের পাশের নিরক্ষর ব্যক্তিটি কে কেন স্বাক্ষর করতে পারবনা?

আমরা কি পারিনা নিজের উদ্যোগে একটি করে গনশিক্ষা স্কুল চালু করতে। কিছুটা সময় এইসব নিরক্ষরদের জন্য ব্যয় করতে। এক একজন স্বাক্ষর ও শিক্ষিত মানে বাংলাদেশের জন্য এক একটি নব দিগন্তের শুভ সূচনা। ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যেতে পারনি, পারনি মুক্তিযুদ্ধে যেতে! আমি বলব সুযোগ শেষ হয়নি। তবে যুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ পেয়েও যদিতা কাজে না লাগালে তোমাকে ভবিয্যত প্রজন্ম যে কি বলে অপমান করবে তা ওরাই ভাল জানে।

এখন নব যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়ার এখন তারশ্রেষ্ঠ সময়। ছাত্র, তরুন, যুবক তোমাদের দুর্জয় তারুন্যই পারবে আমাদের এই ২য় প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী করতে। নিরক্ষরতা ক্ষুধা দারিদ্য ও দূর্নীতি এক একটি হানাদার শত্রুর মত। নিরক্ষরতা ক্ষুধা দারিদ্য ও দূর্নীতি এক একটি হানাদার শত্রুর মত। এই শত্রুগুলোকে হত্যা করতে যে অস্ত্রটি দরকার তাই হল শিক্ষা ও স্বাক্ষরতা। এজন্যই চাই সবার জন্য শিক্ষা। চাই নিরক্ষর মুক্ত শিক্ষিত বিজ্ঞান ও জ্ঞান নির্ভর আত্মনিভর্রশীল ডিজিটাল বাংলাদেশ।

আমরা যদি সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ও সরকারের স্বাক্ষরতা অভিযানের কৌশলগুলো কাজে লাগিয়ে স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন হয়ে ব্যক্তিগত ও বৃহত্তর সামাজিক পরিমন্ডলে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারি, তাহলে আমাদের স্বাক্ষরতার অভিযান সম্পন্ন হবে।

লেখক: মো. আলাউদ্দিন মজুমদার
(সাংবাদিক, লেখক ও সংগঠক)
সহ-সম্পাদক: দৈনিক আমাদের নাঙ্গলকোট
সাধারণ সম্পাদক: নাঙ্গলকোট লেখক ফোরাম
নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা।
মোবাইল: ০১৮৭১-৩২৮৩৭৯
তারিখ: ২৩/০৫/২০১৬ইং

Related posts