November 25, 2017

চাঁদপুরে একই পরিবারের ৫ প্রতিবন্ধীর জীবন যুদ্ধ ॥ বিওবানরা নিয়তির পরিহাস বলে দায়িত্ব এড়িয়ে যান

Printএ কে আজাদ, চাঁদপুর : চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে এক পরিবারের ৬ সদস্যর ৫ জনই প্রতিবন্ধী। পরিবারটিতে ৩০ বছর পূর্বে এ বিরল রোগটি বাসাবাঁধে। ওই রোগটির চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিকভাবে তত্ত্¦ আবিস্কারের প্রয়োজন বহু আগে দেখা দেয়। কিন্তু আজ অবধি চিকিৎসা তো দূরের কথা, অভাবের অক্টোপাসে গিলে থাকা পরিবারটির সমাজে মুখ খোলার সাহস পর্যন্ত নেই। কারন স্থানীয় ইউপির অধিকর্তা থেকে শুরু করে সমাজের বিওবানরা সবাই নিয়তির পরিহাস বলে দায়িত্ব এড়িয়ে পথ চলছেন। এমন জটিল সমস্যা পিড়িত পরিবারটির বাস চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার সূচীপাড়া উওর ইউপি’র ৫নং ওয়ার্ডের ধামরা কামার বাড়িতে। প্রতিবন্ধীত্বের শিকার পরিবারটি জানায়, ৩০ বছর পূর্বে ওই বাড়ির মৃত আঃ লতিফের পুত্র মোঃ সিরাজুল ইসলাম (৬০) চিতোষী পশ্চিম ইউপি’র উঘারিয়া গ্রামের রামার বাড়ির মৃত ফজলুল হকের মেয়ে মরিয়ম বেগমকে বিয়ে করে। সম্পর্কে দু’জনা ফুফাতো-মামাতো ভাই-বোন। তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পূর্ণ হয় পারিবারিকভাবে। মরিয়ম স্বামী সিরাজ সম্পর্কে যা জানতো তা ছিলো অতি সামান্য। ওই কম জানা আবিষ্কার ও সংসার করতে গিয়ে ধরা পড়ে সিরাজ একজন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। ততদিনে পানি অনেক দূর গড়িয়ে মরিয়ম সন্তান সম্ভবা হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় অসুস্থতা জনিত বেকার, দরিদ্র, সিরাজকে ত্যাগে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় আগন্তক সন্তান। এরই মধ্যে ভূমিষ্ঠ হয় প্রথম সন্তান সাহিদা আক্তার (২৩) এর পর জাহেদা আক্তার (২০) তৃতীয় ছেলে মাইনুদ্দিন (১৫) ও মমিন (১২) মেয়ে সাহিদার জন্মের পর অভাবের বৃত্ত ক্রমে বাড়তে থাকে। তখনি মরিয়ম সুযোগ পায় ব্র্যাক পরিচালিত পুষ্টি কার্যক্রমের একজন মাঠ কর্মীর সহকারীর কাজ। ওই সুবাদে শাহরাস্তি ব্র্যাক অফিসে যাতায়াতের তার একটি পথ সৃষ্টি হয়। আজ থেকে ১৫ বছর পূর্বে ঢাকা মহাখালির আইসিডিডিআর-বি থেকে একটি মেডিকেল টিম আসে ওই অফিসে। ওই টিমের একজন নিউরোমেডিসিন ডাক্তারের প্রথম নজরে আসলেই প্রকাশ পায় মেয়ে সাহিদার বুদ্ধি প্রতিবন্ধীর কথা। সে কথা তখন গ্রামের দারিদ্রের সাগরে নিমজ্জিত থাকা মরিয়ম ও তার স্বজনদের ততটা আকৃষ্ট করতে পারেনি। এর কিছু দিন গড়াতে স্কুলে ভর্তি হয় সাহিদা, সেখানে একই কথা চাউর হতে থাকে। এরপর দ্বিতীয় মেয়ে জাহেদাকে নিয়ে ব্র্যাকের পুষ্টি কার্যক্রমের একই অফিসে নিয়ে গেলে অন্য একটি মেডিকেল টিমের আরেকজন ডাক্তার ওকেও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বলে মত দেয়। তখনি মরিয়ম নড়েচড়ে বসে। কিছুদিন যেতে না যেতেই পুষ্টি কার্যক্রমের মাঠ কর্মীর কাজটিও মেয়াদকাল জনিত কারণে হাত ছাড়া হয়ে যায়। পরে সংসারের এক জটিল সমীকরণের মধ্যে তৃতীয় ছেলে মাঈনুদ্দিন (১৫) বড় হয়ে স্কুলে ভর্তি হয়। স্কুলে যেতে তার ভাগ্যেও জুটে একই কথা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। তার বিদ্যালয়ের শ্রেনী শিক্ষক মোঃ মারুফ হোসেন তার আচরন নিয়ে একই কথা বলেন। ২০০৪সালে মরিয়ম জীবনের প্রথম তার ভাইয়ের সহযোগিতায় ঢাকায় যায়, সেখানে মাঈনুদ্দিনের কান পাঁকা সমস্যা দেখা দেয়। ওই সমস্যা থেকে পরিত্রান পেতে ঢাকার মহাখালী আইসিডিডিআর-বি নিউরোমেডিসিন বিভাগে ডাক্তার ফারুক হোসেনকে দেখান। তখনই ডাক্তার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে ছেলেটিকে শারীরিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বলে অভিমত দেন। ওই কথা শুনে মরিয়মের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। সর্বশেষ চতুর্থ সন্তান মমিনকে কিছুদিন পূর্বে শাহরাস্তি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে ডাঃ সাকলাইন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বলে প্রাথমিকভাবে সনাক্ত করে। এ খবর শুনে মরয়িম অঝোর ধারায় বিলাপ করে মাটিতে লুটে পড়ে, পরিবারটির একমাত্র সুস্থ্য উপার্জনক্ষম মরিয়ম। পরে গনমাধ্যম কর্মীরা বিষয়টি টের পেলে প্রথমে জানার চেষ্টা করে, মরিয়মের দুঃখের সুড়ঙ্গের শেষ কোথায়। তখনি উপরোক্ত বিষয়সহ বিস্তারিত গণমাধ্যামকে খুলে জানায় মরিয়ম। আমি আজ ৩০বছর যাবৎ অর্থকড়ি ছাড়া মানুষের বাড়ি বাড়ি ঝির কাজ করে প্রতিবন্ধী স্বামী ও ২৩বছর ধরে ৪টি বাচ্চা নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। আমি আর পারছিনা। সমাজের বিত্তবান ও সদাশয় সরকারের নিকট আর্জি, আমার পরিবারটিকে বাঁচান। সংশ্লিষ্ট ইউপি’র অধিকর্তাদের নিকট ঘুরেছি একটি প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ডের জন্য। সমাজের বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি, বুঝিয়েছি আমার ৪টি বাচ্চা অসুখ, তাদের চিকিৎসা প্রয়োজন। সবাই আমার বোবা কান্না শুনে চুপসে গেলেও, অর্থকড়ি, বুদ্ধি দিয়ে তেমনটা এগিয়ে আসেনি। তাই আমি আজও জানতে পারিনি সঠিক কি রোগ হয়েছে তাদের। এ প্রসঙ্গে স্থানীয় ইউপি সদস্য সিরাজুল ইসলাম জানান, পরিবারটি সম্পর্কে আমি অবগত রয়েছি। এবার নতুন বরাদ্ধ এলে দেওয়া হবে। উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মোঃ মনিরুল ইসলাম জানান, এ উপজেলায় জরিপকৃত প্রে কেউ চাইলে সরকারী নিয়মমতে সুবিধা নিতে পারে। রতিবন্ধীর সংখ্যা ৩ হাজার ২শ’ ৩৩জন বর্তমানে ভাতা ভোগীর সংখ্যা ১ হাজার ১শ’ ৯৪ জন।

Related posts