November 17, 2018

চতুর ‘অনিশ্চয়তা’কৌশল ও ডোনাল্ড ট্রাম্প

১৯৭৯ সালে তামাক কারখানা থেকে একটা গোপন নথি বেরিয়ে পড়েছিল প্রকাশ্যে। নথিটি ছিল ধূমপান এবং স্বাস্থ্য প্রস্তাবের উপরে। এটি লিখেছিল এরও প্রায় একযুগ আগে ব্রাউন অ্যান্ড উইলিয়ামসন টোব্যাকো কোম্পানি। এই নথিপত্রে ফাঁস হয়ে পড়ে, বড় বড় তামাক কোম্পানিগুলো ‘তামাক বিরোধী’ শক্তিগুলোকে মোকাবেলার জন্য কি ধরনের কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।

নথিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কৌশলটি লেখা ছিল সেটা হচ্ছে, ঠিক কোন উপায়ে মানুষের কাছে সিগারেট বিক্রি করা যায়? কৌশলটি বোঝাতে তামাক প্রস্তুতকারীরা লিখেছিলেন, ‘অনিশ্চয়তা হচ্ছে আমাদের মূল হাতিয়ার। কারণ একমাত্র এটা ব্যবহার করেই সাধারণ মানুষের মনে যে নিশ্চয়তার আবয়ব থাকে সেটার সাথে পাল্লা দেয়া সম্ভব। শুধু তাই না এটা ব্যবহার করে বিতর্ক সৃষ্টি করা খুব সহজ।’

এই কৌশল প্রকাশের পর সেটা স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিজ্ঞানী এবং ইতিহাসবিদ রবার্ট প্রোক্টরের আগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি প্রথমে উৎসাহ নিয়ে তামাক কোম্পানিগুলোর কাজকর্মের উপরে নজরদারি এবং গবেষণা শুরু করেন। শেষে ধূমপানের কারণে আদৌ ক্যান্সার হয় কিনা সে ব্যাপারে কোম্পানিগুলো ঠিক কিভাবে মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ছড়িয়েছে সেটা তিনি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন।

খুঁজতে গিয়ে প্রোক্টর আবিষ্কার করলেন তামাক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ধূমপানের ক্ষতিকর দিক সম্বন্ধে ধূমপায়ীদের জানাতে চায় না এবং স্বাস্থ্যের উপর ধূমপানের প্রভাব গোপন করার জন্য তারা লাখ লাখ ডলার খরচ করে। অর্থাৎ ক্ষতি জেনেও তারা স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্ক ছড়িয়ে গোটা বিষয়টা এড়িয়ে যাচ্ছেন। এটা কে কি বলা যেতে পারে বা কিভাবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে? প্রোক্টরের অনুসন্ধান তাকে একটি নতুন শব্দ তৈরি করতে অনুপ্রাণিত করলো, ‘এগনোটোলজি’ বা ইচ্ছাকৃত অনিশ্চয়তা ছড়ানোর কৌশল। এগনোটোলজি শব্দটা এসেছে মূলত নয়া সনাতন গ্রিক শব্দ ‘এগনোসিস’ থেকে। এর অর্থ ‘মূর্খতা’ বা ‘অজ্ঞতা’। এগনোটোলজি হচ্ছে এই অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে অনিশ্চয়তা ছড়ানো।

প্রোক্টর বলেছেন, ‘আমি অনুসন্ধান করে দেখেছি প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা কি পরিমাণ চতুরতার সাথে এই অনিশ্চয়তা ছড়ায়। মানুষের অনিশ্চয়তাই হচ্ছে এখানে ক্ষমতা এবং এগনোটোলজি হচ্ছে ইচ্চাক্রিতভাবে সেটাকে মানুষের মনে ছড়িয়ে দেয়া।’ টোব্যাকো কোম্পানিগুলোর প্রকাশ হয়ে পড়া নথিগুলো এর চমৎকার উদাহরণ। এটা এমন একটি রাজনৈতিক চাল যেখানে কেউ একজন এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে যাতে মানুষ নিজে থেকেই ঘটনার সত্যতা জানার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং অন্ধের মত অনুসরণ করে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এগনোটোলজি এবং এর সাথে বর্তমান পরিস্থিতির সম্পর্ক কি? বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন প্রত্যাশী রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পেরই বা এরসাথে যোগাযোগ কোথায়? সম্পর্কটা আসলে আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে।

প্রথমে একটা ছোট উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যাক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০০৮ সালে প্রথম ক্ষমতায় আসার পর তার জন্ম নিয়ে একটা ইচ্ছাকৃত বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছিল। বিতর্কটাই এখানে অনিশ্চয়তার কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ব্যবসায়ী (তার মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প উল্লেখযোগ্য) প্রথম এই অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে দেয়। এটা এমন একটি রাজনৈতিক চাল যেখানে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ এবং তুচ্ছ কাজের তফাৎ হারিয়ে ফেলে। ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট ওবামা তার জন্ম সনদ প্রকাশ করার আগ পর্যন্ত এই অবস্থা চালু ছিল। এটা একটা উদাহরণ মাত্র। কারণ এই রকম আরও অনেক ঘটনা রয়েছে। তবে এখানে একটা প্রশ্ন ওঠে যে, কিভাবে এই জাতীয় অনিশ্চয়তা ছড়ান প্রভাবশালীরা? আর মানুষই বা তা এতো সহজে গেলে কেন?

প্রোক্টর এখানে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, এই ধরনের প্রচারণা শুরু হয় দুই পক্ষের একটা সুষম বিতর্কের মধ্য দিয়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, মানুষের একটা সাধারণ ধারণা হচ্ছে কোনো সমস্যায় সবসময়ই দুটো পক্ষ বিতর্ক করবে কিন্তু তারা ভুলে যায় যে দুই পক্ষের বিতর্ক মানেই এই নয় যে তারা একটা জাতীয় সমাধানে পৌঁছাতে পারবে। অর্থাৎ প্রকৃত সমস্যাটা এখানে গুরুত্ব হারায়। এটার সত্যতা পাওয়া যায় বর্তমানের বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন বিতর্কে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি যে একটি মারাত্মক সমস্যা এবং এখানে যে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে সেটা অনায়াসে কিছু মানুষ উপেক্ষা করছে এবং সাধারণ মানুষকে করে দিচ্ছে অনিশ্চিত। যদি কারণ খুঁজতে যাওয়া হয় তাহলে দেখা যাবে এই কাজটা মূলত করছে ব্যবসায়ীরা যাদের নিজেদের স্বার্থ এখানে জড়িত রয়েছে। যদি দূষণ কমাতে হয় তাহলে বন্ধ করে দিতে হবে শিল্প কারখানা।

কাজেই ব্যাবসায়ীরা একটা কৃত্রিম বিতর্কের অছিলায় সাধারণ মানুষকে বলছেন যে, প্রত্যেকটা ঘটনার একটা দ্বৈত গল্প রয়েছে যার সাথে বিশেষজ্ঞরা একমত নন। এর ফলে প্রকৃত সত্যের একটা মিথ্যা রূপ বা ‘অজ্ঞতা’ তৈরি হচ্ছে মানুষের মধ্যে।

বর্তমানের অবস্থা কিন্তু এই ধরনের অজ্ঞতার দিকে আরও ভয়ানকভাবে অগ্রসর হচ্ছে। জ্ঞান অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে কিন্তু সেটা কেউ সন্ধান করছে না। অনেক ক্ষেত্রেই এই অজ্ঞতার বিষয়বস্তুগুলো তুচ্ছ বা কম ক্ষতিকর। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই রয়েছে অজ্ঞতার ভয়ংকর পরিণতি। বিশেষ করে এই অজ্ঞতা যখন তৈরি হয় বিশাল কোনো রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ঘিরে। এখানেই উঠে আসছে মার্কিন পুঁজিপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা যিনি কিনা হতে চাচ্ছেন আগামী মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এগনোটোলজির একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছেন তিনি। তার থেকে ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে তার কৌশলে কাজ হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট দৌড়ে তিনি এগিয়ে রয়েছেন।

কিভাবে তিনি এটা করছেন? উত্তর ইতিমধ্যে দেয়া হয়ে গেছে- এগনোটোলজি। তিনি সাধারণ মানুষের জ্ঞানের অভাবকে কাজে লাগাচ্ছেন এবং কৌশলে উস্কে দিচ্ছেন তাদের আদিম প্রবৃত্তিগুলোকে। ভয় তার মধ্যে অন্যতম। মার্কিন জনগণের মধ্যে সন্ত্রাস ভীতি এখন ভয়াবহ। কিন্তু ট্রাম্প যেটা করছেন সেটা হচ্ছে, কৌশলে সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দিয়ে মানুষের ভীতিকে সন্ত্রাসের উপর থেকে সরিয়ে নিয়ে গেছেন মুসলিম তথা ইসলাম ধর্মের উপরে। হাজার হাজার মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে যখন তিনি বলছেন, সমস্ত মুসলিমদেরকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেয়ার কথা তখন মানুষ উল্লাস করে উঠছে। মানুষ অনিশ্চিত এবং ভীত। তারা এই জাতীয় কথা প্রকাশ্যে বলতে পারবেন না। কিন্তু ভীত সন্ত্রস্ত মানুষ যখন দেখেন ট্রাম্প ফলাও করে সারা বিশ্বের সামনে বলছেন এমন কথা তখন সেটা যেন তাদের অনিশ্চিত সচেতন মনকে এড়িয়ে অবচেতন মনের চাপা ভয়কে প্রশমিত করছে। ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়ে উঠেছেন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়।

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক গবেষক ডেভিড ডানিংও এই অনিশ্চয়তা কৌশলের উপরে বিশ্লেষণ করেছেন। তার মতে, মানুষের মধ্যে এই ধরনের অনিশ্চয়তা ছড়ানোর কৌশল অত্যন্ত ক্ষমতাশীল একটা অস্ত্র। কিছু চতুর মানুষ নাচাচ্ছেন গোটা বিশ্বের মানুষকে। এটা নিঃসন্দেহে ক্ষমতা। তিনি আফসোস করে বলেন, ‘মানুষ যে এখন আর নিজে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না তাতে আমি উদ্বিগ্ন নই। আমার উদ্বেগ হচ্ছে মানুষ এটাকেই স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নিচ্ছে এবং অহরহ করছে।’

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/মেহেদি/ডেরি

Related posts