November 14, 2018

চকবাজার-মৌলভীবাজারে এত নকল পণ্য!

ঢাকাঃ বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের টুথপেস্ট সেনসোডাইন কিনে প্রতারিত হলেন স্বয়ং সেখানকার ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা মোহাম্মদ এনায়েতুল্লাহ। তিনি এর আগেও এই টুথপেস্ট ব্যবহার করেছেন। এবার ব্যবহার করার সময় টের পান, চকবাজার থেকে কেনা টুথপেস্টটি নকল। মৌলভীবাজার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ এনায়েতুল্লাহ আক্ষেপ করে এমন প্রতারিত হওয়ার গল্পটি বললেন।

সেনসোডাইন নামের এ টুথপেস্টটির বাজারজাতকারী মূল প্রতিষ্ঠান বহুজাতিক কোম্পানি গ্গ্নাস্কোস্মিথক্লাইন। তবে এনায়েতুল্লাহ জানালেন, পুরান ঢাকার চকবাজারে বিশ্বখ্যাত নানা ব্র্যান্ডের এমন অনেক নকল পণ্য আসছে, যার কথা হয়তো আসল পণ্য উৎপাদনকারীদেরও জানা নেই।

তিনি বলেন, দেশের নাম যাই লেখা থাক, মূলত চীন থেকে আসছে বেশিরভাগ নকল পণ্য। দেশেও দামি ব্র্যান্ডের নকল হয়ে থাকে।

অভিন্ন চিত্র মৌলভীবাজারেও। চড়া শুল্কে আমদানি করা মসলা বিক্রি করে লোকসানে পড়েছেন ওই বাজারের ব্যবসায়ীরা। মৌলভীবাজারেও ঢুকছে চোরাচালান হয়ে আসা মসলা। এতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় ব্যবসা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে হুদা ব্রাদার্স ও সালাম স্টোরের মতো অনেক প্রতিষ্ঠান। নকল এবং ভেজালপণ্যের কারণে অনেকেই বিপাকে রয়েছেন বলে জানান মসলা আমদানিকারকরা।

এক সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা পুরান ঢাকার চকবাজার ও মৌলভীবাজার আসতেন পাইকারি কেনাকাটার জন্য। এখন ব্যবসার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। করপোরেট কোম্পানিগুলো অনেক পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পেঁৗছে দিচ্ছে। পণ্য কেনাবেচার বিকেন্দ্রীকরণের কারণেও এই দুটি বাজারে ব্যবসামন্দা দেখা দিয়েছে। তীব্র যানজটের কারণেও ক্রেতারা বাজার ছাড়ছেন বলে জানা গেল। আগের প্রশস্ত রাস্তাগুলো বেদখল হয়ে যাচ্ছে। তারা বলেন, বড় অঙ্কের রাজস্ব দিলেও এ বাজারের উন্নয়ন হয়নি। দেশের অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে এমন সব ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর উন্নয়নে সরকারের সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। এখানকার ব্যবসায়ীরা স্বপ্ন দেখেন এভাবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর উপায় খুঁজে পাবেন।
কেবল আমদানি নয়, ভেজাল ও নকলপণ্য স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন করেও মৌলভীবাজার-চকবাজারে ছাড়া হচ্ছে। ফলে চকবাজারের দিকে চেয়ে নেই ক্রেতারা। বেশিরভাগ ক্রেতা এ বাজার ছেড়ে গেছেন। কেনাবেচার এই মন্দার মধ্যে নতুন করে ট্যাক্স ও ভ্যাটের চাপে পড়তে যাচ্ছেন বলে জানান পাইকারি ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, ব্যাংক ঋণ নিয়ে মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ করে এখন বিপাকে আছেন। অনেকেই ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছেন। এখন ব্যবসা টিকিয়ে রাখাও অনেকের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।

মৌলভীবাজার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ এনায়েতুল্লাহ বলেন, আশির দশক পর্যন্ত রমরমা ব্যবসা ছিল চকবাজার ও মৌলভীবাজারে। এরপর থেকে কমতে থাকে। তবে কয়েক বছরে কেনাবেচা অর্ধেকে নেমেছে। কারণ হিসেবে বলেন, ঐতিহ্যবাহী এ বাজারে চোরাচালান ও নকল পণ্য আসছে। এ কারণে ক্রেতাদের আস্থা সংকট তৈরি হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রকৃত ব্যবসায়ীরা।

মোহাম্মদ এনায়েতুল্লাহ বাংলাদেশ মসলা ব্যবসায়ী সমিতিরও সভাপতি। তিনি দেশের সবচেয়ে বড় মসলার আড়ত মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ীদের রক্ষা করার জন্য চোরাচালানের মাধ্যমে দেশের বাজারে যে মসলা আসছে, তা বন্ধ করতে হবে বলে মত দেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী লোকসানে পড়ে অনেকেই ব্যবসা ছেড়েছেন, আবার যারা টিকে আছেন, তারাও ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। শুধু মসলার ব্যবসায়ীরা নন, এ বাজারের অন্যান্য পণ্যের ব্যবসায়ীরা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। হুদা ব্রাদার্স ছিল মসলা ও কেমিক্যালের বড় আড়ত। মসলার ব্যবসায়ী সালাম স্টোর, ওষুধের কাঁচামালের জন্য প্রসিদ্ধ মজিদ স্টোর, আশ্রাব টেক্সটাইল অ্যান্ড ট্রেডিংসহ অনেক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান কয়েক বছরে বন্ধ হয়ে গেছে।

সম্প্রতি পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটক থেকে সামনে যেতেই রাস্তায় হেঁটে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। রিকশা, ভ্যান ও ঠেলাগাড়ির জটলা। একটু এগিয়ে চকবাজারের শাহী মসজিদ, ওয়াটার ওয়ার্কস, চক সার্কুলার, বামে বেগমবাজার ও মৌলভীবাজার সড়কেও একই অবস্থা দেখা গেছে। তবে সড়কে যানজট থাকলেও এই বাজারের বিভিন্ন দোকানে তেমন ক্রেতা দেখা যায়নি। বেশিরভাগ দোকানে দু-চারজন করে ক্রেতা ইমিটেশন অলঙ্কার, চুড়ি, ব্যাগ, তালা-চাবি, টুথব্রাশ, সাবান, কটনবাড, ক্লিপসহ বিভিন্ন পণ্য কেনাকাটা করছেন। ক্রেতা বেশিরভাগই ঢাকার। তারা জানান, বিদেশি পণ্য এখানে কম দামে পাওয়া যায়। এ কারণে পাইকারি দামে কিনতে এসেছেন। অন্যদিকে মৌলভীবাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোজ্যতেল ও চিনি কেনাবেচায় ভিড় নেই।

চকবাজার ও মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির হিসাবে মসলা, কেমিক্যাল, ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, আটা, ময়দা, সাজসজ্জার সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের ১০ হাজারের মতো ছোট-বড় পাইকারি দোকান রয়েছে। এই ১০ হাজার দোকানে ৩০ হাজারের মতো প্রত্যক্ষ শ্রমিক রয়েছেন। পরোক্ষে আরও ৫০ হাজারের মতো শ্রমিক এখানে কাজ করছেন। তবে ব্যবসা মন্দার কারণে পরোক্ষ শ্রমিকরা এখন কাজ পাচ্ছেন না।

মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা বলেন, যানজটের কারণে চক-মৌলভীবাজারের ক্রেতা কমে গেছে। এ বাজারের সঙ্গে প্রশস্ত সংযোগ সড়ক প্রয়োজন। সড়ক ব্যবস্থার পরিবর্তন হলে বাজারের কেনাবেচায় গতি আসবে। তিনি বলেন, এক সময় এ বাজারে সব ধরনের পণ্য বিক্রি হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অনেক ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে জুতা, তৈজসপত্র, হারিকেন, তেলের চুলাসহ বিভিন্ন পণ্য।

এই বাজারের ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি মো. আবুল হাশেম বলেন, আগে চিনিসহ অনেক পণ্যের ব্যবসা এই বাজারনির্ভর ছিল। কোম্পানিগুলো সরাসরি দেশের সব প্রান্তে চিনি পেঁৗছে দিচ্ছে। আবার আমদানি করা প্রায় সব পণ্য আগে চট্টগ্রাম থেকে চকবাজার হয়ে সারাদেশে যেত। এখন সরাসরি যাচ্ছে। এতে এ বাজারের কেনাবেচা কমেছে। তিনি বলেন, পণ্যে ভেজাল দিয়ে বেশি দিন ব্যবসা করা যায় না। এ বাজারে ভেজালপণ্য বিক্রি করে ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে। বাজারে আগের মতো জৌলুস নেই। এ অবস্থায় সরকার বাড়তি ভ্যাটের চাপে বিপাকে আছেন তারা।

প্রসঙ্গত, বাংলার নবাব সুজাউদ্দিন মুহাম্মদ খান ১৭২৭ মসনদে আরোহণের পর মেয়ের জামাই মির্জা লুৎফুল্লাহকে (দ্বিতীয় মুর্শিদ কুলী খান) ঢাকার নায়েব-নাজিমের পদ দেন। ১৭২৮ সালে লুৎফুল্লাহই নির্মাণ করেন চকবাজার। তবে বাজারটি ‘চকবাজার’ হয়ে ওঠার আগে থেকেই ছিল মোগল ঢাকার কেন্দ্রীয় বাজার। আগে নাম ছিল ‘বাদশাহী বাজার’। উনিশ শতকেও চকবাজার ছিল ঢাকার প্রাণকেন্দ্র। হাছন রাজার ছেলে গনিউর রাজা ১৮৯৩ সালে চকবাজারকে ‘চৌক বন্দর’ অ্যাখায়িত করেছেন। গত শতাব্দীর চলি্লশের দশকে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতেই বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এর পরেও চকবাজারের পাইকারি বাণিজ্য বাড়তে থাকে। আশির দশকে সবচেয়ে রমরমা ছিল এ বাজার।
উৎসঃ সমকাল

Related posts