November 20, 2018

ঘরে বসেই আউটসোর্সিং পেশায় বড়লোক!

838

জাফর ইমাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবেমাত্র পড়াশোনা শেষ করেছেন। এখন কাজ খুঁজছেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ‘আউটসোর্সিংকে আমি পেশা হিসেবে নিতে চাই। এখানে আমি নিজেই বস। সব কিছুই আমি নিজেই করতে পারবো। কারো অধীনে আমাকে কাজ করতে হবে না।’

এই ‘আউটসোর্সিং’ নামের পেশাটা বাংলাদেশে খুব পুরোনো কোনও ধারণা নয়। বছর কয়েক আগে বাংলাদেশের তরণ-তরুণীরা অনলাইন ব্যবহার করে বিশ্বের নানা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করতে শুরু করে। এক হিসাব মতে, দেশে এখন এমন আউটসোর্সিং পেশায় কর্মজীবীর সংখ্যা প্রায় চার লাখ। তবে এদের অধিকাংশই খণ্ডকালীন।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় গত বুধবার বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) সামিটে বলেছেন, ২০২১ সালের মধ্যে বিপিও খাতে ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এ খাতে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে আয় যত বাড়বে, দেশ অর্থনৈতিকভাবে ততই এগিয়ে যাবে।

জানা গেছে, ২০২১ সালের মধ্যে বিপিও খাত থেকে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে সরকার। এজন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের বিপিও খাত সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা দেয়া, দেশের তরুণ সমাজের কাছে এ খাতকে কাজের ক্ষেত্র হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া ও দেশের বিপিও খাতকে এগিয়ে নিতে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এই সামিটের আয়োজন করা হয়।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক জানান, ফ্রিল্যান্সারদের জন্য স্বল্প মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা দিতে বিশেষ কার্ড দেয়া হবে, যাতে তারা স্বল্প সময়ে কাজ সম্পন্ন করতে পারে। এ বিষয়ে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের সঙ্গে চুক্তি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে পুরুষের তুলনায় নারী ফ্রিল্যান্সাররা বেশি আয় করছেন, তাই আউটসোর্সিংয়ে অধিকসংখ্যক নারী ফ্রিল্যান্সারের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নতুন উদ্যোক্তা বাড়াতে সরকার ‘আর্ন এন্ড পে’ নামে একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, যাতে নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধা দেয়া হবে।

জুম বাংলা প্রাইভেট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী ইউসুফ চৌধুরী আউটসোর্সিং পেশার সম্ভাবনা নিয়ে বলেন, আউটসোর্সিং বিষয়ে সরকারি নানা উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার দাবি রাখে। সরকার ফ্রিল্যান্সার তৈরির জন্য নানা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে। তবে ইংরেজিতে দক্ষতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। কেননা ইন্টারন্যাশনাল বায়ারদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এটা প্রয়োজন। শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের প্রশিক্ষণ দিলে এটি ফলপ্রসূ হবে। এছাড়া এটার সঙ্গে সরকারের উচিত অনলাইন ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উদ্যোক্তাদের পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থা করা।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, আমদানি নির্ভর আমাদের দেশে যত বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের প্রয়োজন হয় তার একটি বড় অংশ আসে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে। ২০১২ সালে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের শ্রমিকেরা প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন। প্রতিবছর ১০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হবে—এটা ধরে নিলে ২০১৫ সাল নাগাদ সেটা হবে প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।

অন্যদিকে ২০১২ সালে ৩৬৫ কোটি টাকারও বেশি আয় করেছেন বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা। ২০১৫ সালে সর্বমোট ৪৪৩ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণের কাজ আউটসোর্সিং-এর মাধ্যমে হওয়ার কথা। বাংলাদেশ যদি এর ১০ ভাগ মার্কেট শেয়ার নিয়ে থাকে তাহলে সেটা প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং ৫ ভাগ মার্কেট শেয়ার নিয়ে থাকলে সেটা হবে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বর্তমানের সবচেয়ে বড় খাতকেও অতিক্রম করা সম্ভব।

আউটসোর্সিং : অনলাইন মার্কেট প্লেসে হাজার হাজার কাজ থেকে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোনো কাজ খুঁজে নেয়া ও কাজ সম্পাদন করার পর বায়ারের কাছ থেকে তার পেমেন্ট গ্রহণ করার মাধ্যমে যে উন্মুক্ত পেশা বা ফ্রিল্যান্সিং কাজের সৃষ্টি হয়েছে সেটাই আউটসোর্সিং। সাধারণত খরচ কমানোর লক্ষ্যে আউটসোর্সিং করা হয় অথবা প্রযুক্তিগত সমস্যা এবং লোকবলের অভাবে আউটসোর্সিং করা হয়।

সাধারণত বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন আউটসোর্সিংয়ের বেশিরভাগ কাজ করে থাকে। জানা গেছে, আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। আউটসোর্সিং কাজ সাধারণত দুইভাবে করা হয়ে থাকে। সরাসরি বায়ারের কাজ এবং মার্কেটপ্লেসের কাজ। সরাসরি কাজের জন্য একটি ওয়েবসাইট থাকতে হবে এবং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সার্ভিস দেবে। মার্কেটপ্লেস কাজের জন্য প্রথমে কাজের জন্য একাউন্ট করতে হবে। এরপর কাজের জন্য বিড করতে হবে। বায়ার যাকে পছন্দ করবে তাকে কাজটা দেবে এবং কাজ শেষে হলে মার্কেটে পেমেন্ট দেবে।

ইতিহাস : বাংলাদেশে আউটসোর্সিং পেশার ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়। দেশে গত তিন-চার বছরে এই পেশা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশে আউটসোর্সি ধারণাটি আগে থেকেই ছিল। শিল্প বিপ্লবের পর ব্যবসা-বাণিজ্যের ধারণায় পরিবর্তন আসে। তারই ধারাবাহিকতায় আউটসোর্সিং পেশার সূচনা হয় ১৯৯৮ সালে। ‘গুরু’ সর্বপ্রথম আউটসোর্সিং মার্কেটপ্লে­স যা ১৯৯৮ সালে সফটমুনলাইটার ডটকম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় ইলান্স ডটকম, রেন্টএকোডার ডটকম, ওডেক্স ডটকমসহ আরও অনেক মার্কেটপ্লে­স প্রতিষ্ঠিত হয়। ইন্টারনেটের বিস্তৃতির কারণে বাংলাদেশেও আউটসোর্সিং দিন দিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

কাজের সুযোগ : বাংলাদেশে অনলাইনের মাধ্যমে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান কাজ দিয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে ওডেক্স ও ইল্যান্স, ফ্রিল্যান্সার, নাইনটি নাইন ডিজাইন, পিপলপারআওয়ার ওয়েবসাইট অনলাইনের মাধ্যমে কাজ দিয়ে থাকে। এইসব ওয়েবসাইট মূলত ওয়েব ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, থ্রিডি অ্যানিমেশন, কন্টেন্ট রাইটিং, লোগো ডিজাইন, অ্যাপ্লিকেশন বিষয়ে কাজ দিয়ে থাকে।

সম্ভাবনা : বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে সারা পৃথিবীজুড়ে চলছে আউটসোর্সিং পেশার জোয়ার। আইসিটি উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে জন্ম নিয়েছে নতুনতর এক অর্থনীতি যার নাম জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি বা নলেজ ইকোনোমি। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি বিকাশের সাথে সাথে আমেরিকা, ইউরোপ অথবা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে বিপুল পরিমাণ ডাটা প্রসেসিংয়ের। যার ফলে উন্নয়নশীল দেশসমূহ আইসিটি এনাবল্ড সার্ভিসকে কাজে লাগিয়ে অর্জন করছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন নয়, এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে দেশের বিপুল সংখ্যক প্রশিক্ষিত বেকার দক্ষ জনগোষ্ঠীর।

কাজের ধরন : আউটসোর্সিং করে টাকা উপার্জন করতে গেলে কম্পিউটার চালানোর উপর ভালো দক্ষতা থাকতে হবে। এরপর কাজের একটি বিষয় নির্ধারণ করতে হবে। ওই বিষয়ের উপর কর্মদক্ষতা অর্জন করতে হবে। ওয়েবসাইট ডিজাইন, ওয়েব প্রোগ্রামিং, ই-কমার্স, ইউজার ইন্টারফেস ডিজাইন, ওয়েব সাইট টেষ্টিং, ওয়েবসাইট প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, ডেস্কটপ আপ্লিকেশন, গেম ডেভেলপমেন্ট, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, নেটওয়ার্কিং এডমিনিস্ট্রেশন, সার্ভার এডমিনিস্ট্রেশন, ট্যাকনিক্যাল রাইটিং, ওয়েবসাইট কনটেন্ট, ব্লগ ও আর্টিকেল রাইটিং, কপি রাইটিং, অনুবাদ রাইটিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন, লোগো ডিজাইন, ইলাস্ট্রেশন, প্রিন্ট ডিজাইন, থ্রিডি মডেলিং, অটোক্যাড, অডিও ও ভিডিও প্রোডাকশন, ভয়েস ট্যালেন্ট, অ্যানিমেশন, বিজ্ঞাপন, ই-মেইল মার্কেটিং, এসিইও, এসইএম, এসএমএম, পিআর, বিজনেস প্লানিং এবং মার্কেটিং, সেলস ও লিড বিষয়ে কাজ পাওয়া যায়। এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষতা বাড়াতে হয়।

প্রশিক্ষণ : ইউটিউব থেকে টপিক ধরে ভিডিও দেখে কাজ শেখা যায়। অথবা প্রশিক্ষণ সেন্টার থেকে নির্দিষ্ট বিষয়ের ৩-৬ মাস মেয়াদী কোর্স করা যেতে পারে। রাজধানীতে এরকম কিছু প্রশিক্ষণ সেন্টার বা আইটি ইন্সটিটিউট রয়েছে। স্কলারশিপের ব্যবস্থাও রয়েছে। ক্রিয়েটিভ আইটি ইন্সটিটিউট, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল প্রফেশনাল ট্রেনিং ইন্সটিটিউট, আরআর ফাউন্ডেশন, আউট সোর্সিং ইন্সটিটিউট ছাড়াও অনেক ট্রেনিং ইন্সটিটিউট রয়েছে। এছাড়া সরকারিভাবেও আইসিটি বিভাগের অধীনে এই বিষয়ের উপর বিভিন্ন জায়গায় প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। নিয়মিত পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলেই এসব বিষয়ে জানা যাবে।

নারী প্রসঙ্গ : আমাদের দেশে মোট জনসংখ্যার বেশিরভাগই নারী। আর এ নারীদের একটা বিশাল অংশ জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে- এমন কাজ খুব কমই করেন। কিন্তু তাদের একটা বড় অংশ চাইলে বাসায় বসে প্রতিদিন ৩-৪ ঘণ্টা সময় দিলে প্রতি ঘণ্টা ১ ডলার হিসাবে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩-৪ ডলারও ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করতে পারেন। মোট কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা যদি ৭ কোটি হয় তাহলে নারী আছে ৩ দশমিক ৫ কোটি। এর মধ্যে শিক্ষিত তরুণী এবং মহিলা যদি অর্ধ কোটিও হয় এবং তাদেরকে ফ্রিল্যান্সার হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব হয় তবে প্রতিদিন ১ দশমিক ৫ কোটি ডলার আয় আসবে এ ক্ষেত্র থেকে। বছরে এ আয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০০ কোটি ডলারে।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts