November 22, 2018

গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমে ১০৭ কোটি ব্যয়ে বাঁধের কাজ চলছে

জাকিরুল ইসলাম, সিরাজগঞ্জ থেকেঃ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্বাবধানে প্রায় ১০৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সিরাজগঞ্জের চৌহালী সদর রক্ষা বাঁধের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। চৌহালীর খাসকাউলিয়া থেকে আটাপাড়া পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে যমুনা নদীর পূর্বপাড়ে বালি ভর্তি জিও টেক্্রটাইলের ব্যাগ ডাম্পিং শেষ হয়েছে। এখন চলছে ওয়েভ প্রটেকশন। এই প্রকল্প কাজে প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরন না করে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে স্থায়ী ভাঙনরোধে যমুনা নদীর তলদেশে রিভেটমেন্ট তৈরি করা হয়েছে বলে টাংগাইল পানি উন্নয়ন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। জানা যায়, সিরাজগঞ্জ জেলার সবচেয়ে বেশি ভাঙনপ্রবন চৌহালী উপজেলা।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড যমুনা নদীর ভাঙন রোধে চৌহালী শহর রক্ষা প্রকল্প হাতে নেয়। এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১০৭ কোটি টাকা। এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও নেদারল্যান্ড সরকারের অর্থায়নে ২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বর শুরু হওয়া ৯০০ দিনের চৌহালী সদর রক্ষা বাঁধের কাজ আগামী ২০১৮ সালে শেষ হবে। এই প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে টাংগাইল জেলার নাগরপুর ও সিরাজগঞ্জের চৌহালী শহরসহ ভাটি এলাকার ৪০টি গ্রাম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বসতভিটা ও ফসলী জমিসহ অন্যান্য স্থাপনা যমুনা নদী ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা পাবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জরিপ প্রতিবেদনে জানা যায়, গত ২০ বছরে বিলীন হয়েছে চৌহালী উপজেলা হেডকোয়ার্টার, থানা ভবন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পশু হাসপাতাল, টিএনটি অফিস, পল্লী উন্নয়ন ভবন, ডাকঘর অফিস, পরিবার কল্যান অফিস, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অফিস, ৩টি সরকারী কোয়াটার, ঘোরজান ইউনিয়ন পরিষদ, এনজিও মানব মুক্তি অফিস, খাসকাউলিয়া কবরস্থান এবং উপজেলা পরিষদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

এছাড়া হিজুলিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর ছলিমাবাদ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সম্ভুদিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, চৌবাড়িয়া উত্তর পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, চৌবাড়িয়া পূর্ব পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, অ্যয়াজি ধুপুলীয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, পয়লা পূর্বপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাথরাইল নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বৃদাশুরিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাকুরিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বৃদাশুরিয়া পশ্চিম পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাটাইল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, দত্তকান্দি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাথরাইল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্য শিমুলিয়া পূর্বপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, থাক মধ্য শিমুলিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাফানিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাফানিয়া-২ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, করুয়াজানি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরবোয়ালকান্দি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, খাষদেলদার পুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চৌহালী মহিলা ফাজিল মাদরাসা, এসবিএম কলেজ, চৌবাড়িয়া কাগিগরি কলেজ, মুঞ্জুর কাদের কারিগরি কলেজ, দত্তকান্দি কেএম উচ্চ বিদ্যালয়, হাটাইল নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আরআরকে দাখিল মাদরাসা, পয়লা দাখিল মাদরাসা, পয়লা উচ্চ বিদ্যালয়, খাষপুখরিয়া বিএম উচ্চ বিদ্যালয়, চৌহালী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, খাষকাউলিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ প্রায় ৬৫ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৪টি হাট-বাজারসহ প্রায় ৩০ হাজার ঘর-বাড়ি ও ১৫ হাজার একর আবাদি জমি যমুনা নদীতে বিলীন হয়েছে।

টাংগাইল পানি উন্নয়ন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১০৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩টি গ্রুপে বিভক্ত চৌহালী শহর রক্ষা বাঁধের ৩১ কোটি টাকার জিও টেক্সটাইল ব্যাগ সাপ্লাইয়ের একটি গ্রুপ কাজ বিজে এবং স্থায়ী ভাঙন রোধের ৭৬ কোটি টাকা ২টি গ্রুপ কাজ পেয়েছে আই-জে ( জেভি) ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রথম পর্যায়ে চৌহালীর খাসকাউলিয়া থেকে আতাপাড়া পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় এরিয়া কভারেজ কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে ওয়েভ প্রটেকশনের কাজ চলছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে সিসি ব্লক পিসিং কাজ শুরু হবে আগামী বছরের শুস্ক মওসুমে। সূত্র জানায়, খাসকাউলিয়া থেকে আটাপাড়া পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে যমুনা নদীর পূর্বপাড়ে চৌহালী শহর রক্ষা বাঁধে দুই ধরনের কাজ রয়েছে। বণ্যাকালীন সময়ে নদীর তীর সংরক্ষণ ও শুস্ক মওসুমে নদীর তীর সংরক্ষণ। এই প্রকল্প কাজ বাস্তবায়নে বাংলাদেশে প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরন না করে সম্পূর্ণ নতুন প্রয়োগ পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ফ্লোটিং উকুইপমেন্ট আটটি বার্জ, টাগবোট, ডাবল মোরিং উয়িংস সেট, ক্রেন ও পল্টুন ব্যবহার করে নদীর তলদেশ থেকে বালিভর্তি জিও ব্যাগ প্লেসিং-ডাম্পিং করে রিভেটমেন্ট তৈরি করা হচ্ছে। গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে নদীর ভাঙন গতি, প্রকৃতি, গভীরতা, অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ নির্ণয় করে নদীর মূল চ্যানেল অক্ষত রেখে রিভেটমেন্ট নির্মাণ করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের টাস্ক ফোর্সের তদারকিতে প্রথম পর্যায়ে এরিয়া কভারেজ কাজ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হওয়ায় স্থায়ী ভাঙনরোধে শতভাগ সফলতা পাওয়া যাবে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ভাঙনপ্রবণ চৌহালীর খাসকাউলিয়া থেকে আটাপাড়া পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে যমুনা নদীর পূর্বপাড়ে ওয়েভ প্রটেকশন কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। নদীর পাড় কেটে ১ঃ৩ আনুপাতিক হারে স্লোপ (ঢালু) করা হচ্ছে। এরপর স্লোপে নদীর পানির স্তর থেকে পাড় পর্যন্ত একটার পর একটা বালি ভর্তি জিও ব্যাগ বিছিয়ে ওয়েভ প্রটেশন দেয়া হবে। এতে নদীর পানি প্রবাহ বাধা প্রাপ্ত হবে না। ফলে  ও ঢেউয়ের আঘাত থেকে নদীর পাড় ভাঙন অস্থায়ীভাবে রক্ষা পাবে। তবে এবছর আতাপাড়ার উজানে আরো দুই কিলোমিটার এলাকায় অস্থায়ী ভাঙনরোধ কাজ না করা হলে বর্ষা মওসুমে ভাটির পাঁচ কিলোমিটার চৌহালী শহর রক্ষা বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যে এই দুই কিলোমিটার ভাঙনরোধ কাজের অনুমোদন পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। স্থায়ী ভাঙনরোধ কাজের জন্য তৈরি করা হচ্ছে সিসি ব্লক। আগামী শুস্ক মওসুমে স্থায়ী ভাঙনরোধের কাজ শুরু হবে। এ সময় পানির সর্বনি¤œ স্তর থেকে নদীর পাড় পর্যন্ত জিও টেক্সটাইল বিছিয়ে একের পর এক সিসি ব্লক সাজিয়ে স্লোপ প্রটেকশন নির্মাণ করা হবে। গ্রাউন্ড ম্যাট্রেস দ্বারা স্লোপ প্রটেকশন করায় নদীর পানি প্রবাহ বাধা প্রাপ্ত হবে না। স্রোতধারা, ঢেউয়ের আঘাত ও বৃষ্টির ধারা থেকে নদীর পাড় ভাঙন স্থায়ীভাবে রক্ষা পাবে। পানি প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত না হওয়ায় বালির স্তর পড়ে চর জেগে উঠবে এবং নদীর প্রবাহ ধীরে ধীরে পশ্চিম প্রান্তে সরে যাবে।

টাংগাইল পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাজাহান সিরাজ এর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গ্লোবাল পজিশনিং পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে চৈহালী শহর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পের কাজ হচ্ছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে টাংগাইল সদর, নাগরপর চৌহালীর বাঘুটিয়া ইউনিয়নের চৌবাড়িয়াপূর্ব পাড়া, চরছলিমাবাদ, হাটাইল দক্ষিন পাড়া ও চরবিনানুই, খাসকাউলিয়া ইউনিয়নের চোদ্দরশি ও উত্তর খাসকাউলিয়া, খাসপুখুরিয়া ইউনিয়নের মিটুয়ানী ও শাকপাল, ওমরপুর ইউনিয়নের পাথরাইল ও শৈলজানা ও ঘোরজান ইউনিয়নের চরজাজুরিয়াসহ ভাটির বির্স্তীর্ণ এলাকা ভাঙনের কবল থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষা পাবে।
জাকিরুল ইসলাম
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

Related posts