September 25, 2018

গ্রেনেড বিস্ফোরণের পরই টনক নড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর

ঢাকাঃ  গুলশান-২ এর ৭৯ রোডস্থ হলি আর্টিসান রেস্টুরেন্টে খেতে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে এক বাংলাদেশি শুক্রবার রাত সোয়া ৯টার দিকে গুলশান থানায় দায়িত্বরত এক আত্মীয় পুলিশ সদস্যকে ফোন করে বলেন, ‘বন্দুক নিয়ে ৮/১০ জন যুবক এখানে (আর্টিসান রেস্টুরেন্ট) ঢুকে সবাইকে জিম্মি করেছে। আমাদের মেরে ফেলবে। আমাদের বাঁচান।’

এমন খবরের পর গুলশান থানা থেকে মাত্র একটি মোবাইল টিম পাঠানো হয় ঘটনাস্থলে। ওই মোবাইল টিমে একজন এসআইয়ের নেতৃত্বে কয়েকজন মাত্র কনস্টেবল ছিলেন। তারা রেস্টুরেন্টের বাইরে মোটর সাইকেল থেকে নেমে হেঁটে রেস্টুরেন্টে ঢুকার জন্য মূল রাস্তার ফটকে যান। পরে সেখানে ঢুকতেই ভেতর থেকে পুলিশ সদস্যদের পা লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়।

শুক্রবার রাতে হলি আর্টিসেন রেস্টুরেন্টে হামলা ও জিম্মি করা দেশি-বিদেশি নাগরিকদের উদ্ধারে অংশ নেয়া ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের হামলায় ২/৩ জন গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দ্রুত বিষয়টি জানানো হয়। পুলিশ সদস্যদের উপর সন্ত্রাসী হামলার খবরে ঘটনাস্থলে গুলশান বিভাগের ডিসি, গুলশান ও বনানী থানার ওসিসহ অর্ধশত সদস্য উপস্থিত হন। তখনই খবর দেয়া হয় ডিএমপি’র সোয়াট টিমকে। তখন সোয়াটের একটি টিম ঘটনাস্থলে আসে।

খবর পেয়ে ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও আসে। তারা প্রথমে পর্যালোচনা করে কিভাবে ভেতরে প্রবেশ করা যায়।

আলোচনার পর সোয়াট টিম ও গুলশান থানা পুলিশ ভেতরে ঢুকে রেস্টুরেন্টের গণ্ডির ভেতরে ঘাসের উপরে গ্রেনেড দেখতে পান। তা পরিত্যক্ত কিনা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। কয়েক সেকেন্ডের চিন্তার দোলাচলের মধ্যেই হঠাৎ ওই গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হয়। এসময় সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

কিন্তু অবস্থা বেগতিক হয় যখন একই সময়ে দ্বিতীয়তলা থেকে আরেকটা গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। পাশাপাশি রেস্টুরেন্টের নিচে হামলাকারীদের মধ্য থেকে কয়েকজন আল্লাহু আকবার বলে গুলি ছোড়তে থাকে।

ওই সময়ই দেখা যায় ঊর্ধ্বতন কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত অবস্থায় পড়ে আছেন। তাদের সরিয়ে নেয়া হয়। ওই সময়ই বনানী থানার ওসি সালাহউদ্দিন ও ডিবির সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম গ্রেনেডের স্প্রিন্টারে বিদ্ধ হন।

গ্রেনেড বিস্ফোরণের আগ পর্যন্ত ডিএমপির একটি মাত্র সোয়াট টিম ও গুলশান থানা পুলিশ সেখানে ছিল। গ্রেনেড বিস্ফোরণে বেশ কয়েকজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় সরিয়ে নেয়ার পরই মূলত টনক নড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।

এরপরই ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া, বেনজীর আহমেদ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। শুরু হয় পরবর্তী অভিযানের পরিকল্পনা। ঘটনার গুরুত্ব বুঝিয়ে যোগাযোগ করা হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তখনই সেনাবাহিনীর কমান্ডো টিম দিয়ে অপারেশন চালানোর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসে নেভাল কমান্ডো টিম। কয়েকটি পিকআপ ভ্যানে আসা সেনা সদস্যরা ঘটনাস্থলের ব্যাকগ্রাউন্ড সংগ্রহ করে রেকি করতে থাকেন।

অপারেশন শুরুর প্রাথমিক পর্যায়েই ঘটনার দায় স্বীকার করে জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের ঘোষণা আসে। জঙ্গিদের অনলাইনভিত্তিক কর্মকাণ্ড তদারককারী মার্কিন ওয়েবসাইট ইনটেলিজেন্স গ্রুপে এই ঘোষণা দেয়া হয়।

পরে রাতভর অপারেশন চালানোর সব ধরণের চেষ্টাও চলে। মোতায়েন করা হয় বিপুল সংখ্যক সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), নৌবাহিনীর কমান্ডো এবং বিশেষ বাহিনী সোয়াট।

ভোর ৪টার দিকে পুলিশ এক তরুণকে আটক করে। গ্রেফতার এড়াতে পালানোর সময় তার পায়ে গুলি করে পুলিশ। ভোর সোয়া ৪টার দিকে ইতালির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, ঢাকার রেস্তোরাঁয় বন্দুকধারীদের হাতে জিম্মিদের মধ্যে ইতালির সাতজন নাগরিক আছেন।

ঘটনাস্থল থেকে এক ইতালীয় জিম্মি নাগরিক পালিয়ে এসে জানান, সাতজন ইতালীয় সেখানে আটকা আছেন।

শনিবার সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে জিম্মিদের উদ্ধারে যৌথ কমান্ডো অভিযান শুরু হয়। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, সোয়াট সদস্যদের নিয়ে এই কমান্ডো অভিযান চালানো হয়।

সকাল সোয়া ৮টার দিকে কমান্ডোরা পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এতে তারা সময় নেন মাত্র ৪৫ মিনিট। বেলা ১১টার দিকে যৌথ কমান্ডো অভিযান শেষ হয়।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) জানায়, অভিযান শেষ হয়েছে। পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে।

সর্বশেষ গুলশান জিম্মিদশা ও হামলার ঘটনার পর সেনাবাহিনী সংবাদ সম্মেলনে জানায়, ২০ বিদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন।

পরে আরও জানা যায়, ৯ ইতালি ৭ জাপানি, ১ ভারতীয় ও বাংলাদেশি ৩ জন নিহত হয়েছেন। কমান্ডো অপারেশনে নিহত হন ৬ জন হামলাকারী। একজনকে হামলাকারী সন্দেহে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

ঘটনাস্থল থেকে জীবিত উদ্ধার করা জিম্মিদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয়ে নেয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, শনিবার রাতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৬ জনকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে জীবিত উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগী ১৩ জন, হলি আর্টিসান রেস্টুরেন্টের দুই স্টাফ ও হামলাকারী সন্দেহে আটক একজন রয়েছেন।

Related posts