September 19, 2018

‘গ্রিক হয়ে আমি লজ্জিত, গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশিরা ন্যায়বিচার পায়নি।’

নিজস্ব প্রতিনিধি,০২ এপ্রিল, ২০১৬ ২০১৩ সালের ১৭ এপ্রির গ্রিসের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের নিয়ামানো লাজায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের উপর বর্বরোচিত এক ঘটনা ঘটে। দেশটির রাজধানী এথেন্স থেতে ২৬৫ কিলোমিটার দূরে একটি স্ট্রবেরি ফার্মে কর্মরত ছিল ২০০ বাংলাদেশি শ্রমিক।
তাদের কেউই সময়মতো ন্যায্য বেতন ভাতা পাচ্ছিল না। বেতন চাইতে গেলে মালিক পক্ষ অর্থ না দেয়ার কথা বলে। বাংলাদেশি শ্রমিকরা তাদের দাবিতে অনড় থাকে। একসময মালিক অস্ত্র নিয়ে হুমকি দেয়। বের হয়ে যেতে বলে কারখানা থেকে। কিন্তু তারপরও অটল অবস্থানে থাকেন শ্রমিকরা।

এমন সময় ফার্মেরই পোষা দুই কুকুরকে গুলি করে হত্যা করে মালিক। এবং হুঙ্কার দিয়ে জানায়, ‘তোদেরও ওই কুকুরের মতো করে মারবো।’

এর কিছুক্ষণ পরেই শ্রমিকদের উপর গুলি চালায়, এলোপাতাড়ি ছুটতে থাকেন সবাই। প্রায় প্রত্যেক শ্রমিক কমবেশি আহত হন। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশি শ্রমিকরাই। ৩৫ জন বাংলাদেশি গুরুতর আহত হন।

এত বড় ঘটনা চাপা থাকেনি। ছড়িয়ে গ্রিস সহ বেশ কয়েকটি দেশের গণমাধ্যমে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন নিন্দা জানাতে থাকে।

গ্রিসে বাংলাদেশি সংগঠন এবং স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলো ফুসে উঠে। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট থেকেও আসে নিন্দা। সাথে সাথে সাড়াবিশ্ব থেকে ‘স্ট্রবেরি শ্রমিকের রক্ত আছে’ স্লোগানে শুরু হয় আন্দোলন।

পরেরদিন ফার্মের সামনে মানববন্ধন করে ৭ হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী। দোষীদের শাস্তি দাবি করতে থাকে। তাদের কথা ফলাও করে ছাপায় বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ানের মতো সংবাদমাধ্যমগুলো। বর্তমান সরকারের সংসদ সদস্যদের সাথে নিযে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করিয়ে শ্রমিকদের বাসস্থানসহ স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও ন্যায় বিচারের দাবি জানান।

পরবর্তীতে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সুবিচার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টে শ্রমিকদের স্বাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ১ মাস ৬দিন ধরে চলে স্বাক্ষ্যগ্রহণ। বাংলাদেশ চেম্বার অফ কমার্সসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন আদালত প্রাঙ্গনে সমাবেশ করতে থাকে।

কিন্তু আদালত সেই মালিকপক্ষকে নির্দোষ ঘোষণা করে তার সহযোগী একজনকে ১৪ বছর ৭ মাস কারাদণ্ড দেয়। আর আপিল করে সেদিনিই মুক্ত হয়ে যায় আসামিরা।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের আইনজীবী বলেন, ‘আজ একজন গ্রিক হয়ে আমি লজ্জিত। বাংলাদেশিরা ন্যায়বিচার পায়নি।’

সেসময়ই আবারও আন্দোলনের ঝড় উঠে। এ অবস্থায় চাপে পড়ে। সেই গুরুতর আহত শ্রমিকদের বৈধ করে নেয় সেদেশের সরকার। এখন পর্যন্ক ২ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে শ্রমিকদের।

সেই আপিলের দিন ছিল ৩১ মার্চ। আসামিরা হাজির হন বন্দরনগরী পাত্রা হাইকোর্টে।

গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাশে রাষ্ট্রদূত জসিম উদ্দিনঃ

এখন তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন গ্রিসে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত মো. জসিম উদ্দিন। গ্রিসে যাওয়ার পর থেকেই গুলিবিদ্ধ শ্রমিকদের নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে তাদের পক্ষের আইনজীবীর সাথে বসেন হাইকোর্টে্। শ্রমিকদের আগেই সেখানে পৌছে যান রাষ্ট্রদূত। তাকে কাছে পেয়ে সাহস পাচ্ছেন শ্রমিকরা।

জসিমউদ্দিন শ্রমিকদের জড়িয়ে শান্তনা দিতে থাকেন। তিনি তাদের সঙ্গে বসে সব সমস্যা লিপিবদ্ধ করেন। তিনি সকল প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশের স্বার্থে কাজ করার আহ্বান জানান।

এক শ্রমিক জানান, দীর্ঘ পাঁচঘণ্টা সময় দিয়ে রাষ্ট্রদূত তাদের যে উৎসাহ দিয়েছেন তাতে তারা খুবই গর্বিত। শুরু থেকেই যদি তার মতো মানুষ পাশে থাকতেন তাহলে অনেক আগেই সুবিচার পেতেন তারা।

এসময় রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মিশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ।

Related posts