November 13, 2018

গ্রাম্যগল্প এবং আলেমদের আগামীর অমানিষা

রাজু আহমেদ
গ্রামবাংলায় ছোট্ট অথচ বেশ শিক্ষণীয় একটি গল্প মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে । গল্পটা হচ্ছে এমন, গ্রামের এক চাষীর আখক্ষেতে তিন চোরা আখ খাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেছে । আখক্ষেতের মালিক তাদেরকে দেখে হেসে হেসে বলতেছে, তোমরা আমার ক্ষেতের আখ খাবে, সেটা বলে খেলে কি হত ? আমি কি তোমাদের বারণ করতাম ? চাষী বুঝে গিয়েছিলে তিন চোরার সাথে দেহের শক্তিতে পারা যাবে না । তাই তিনি কৌশলে বুদ্ধির আশ্রয় নিয়েছিলেন । তিন চোরার একজন ছিল ভিন্ন ধর্মের, অন্যজন পাশের গ্রামের এবং বাকীজন নিজ বংশের । ক্ষেতের মালিক পাশের গ্রামের এবং নিজ বংশের চোরাকে ডেকে কানে কানে বলল, তোরা আমার ধর্মের মানুষ । তোদের প্রতি আমার সহজাত টান আছে । তোরা তো আখ খেতেই পারিস কেননা তোরা আমার স্বজাতীর । কিন্তু অন্য ধর্মেরটা আমরা আখ খেয়ে যাবে, এটা কি মেনে নেয়া যায়, বল ? তোরা যত ইচ্ছা আখ খাবিনে, তার আগে ভিন্ন ধর্মেরটারে বেঁধে পিটিয়ে নে । যেমন পরামর্শ তেমন কাজ ! এক চোরা দমন । পরে নিজ বংশের চোরাকে ডেকে চাষী বলল, তুই আমার ঘরের লোক । আমার ক্ষেত আর তোর ক্ষেতের মধ্যে কোন পার্থক্য আছে ? তুই ইচ্ছা করলে আমার ক্ষেতের সব আখ খেয়ে ফেলতে পারিস । তাই বলে পাশের গ্রামের ওকে তো খেতে দেয়া যায়না । পরামর্শ হলো, পাশের গ্রামের চোরকে আটকিয়ে চরম মার দিতে হবে । বংশীয় চোরা ভাবল কথা তো ঠিক । মালিক ও আপন চোরা পাশের গ্রামের চোরাকে বেঁধে ঠিকছে মার দিয়ে বেহুঁশ করে ফেলল । এবার আখ খেতের মালিক মনে মনে হাসে আর বলে এবার জাদু তোমার পালা । নিজ বংশের চোরাকে বলল, পাশের গ্রামের এবং ভিন্ন ধর্মের লোক আমার ক্ষতি করতেই পারে । আমার আখ সব খেয়ে ফেলতে পারে কেননা ওরা আমার আপন কেউ নয় কিন্তু ব্যাটা তুই কি করে লোক ভাড়া করে আমার সর্বনাশ করতে পারিস । জোয়ান আখ চাষীর লাঠির আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছিল নিজ বংশের চাষীকেই  । চাষীর মত বুদ্ধি থাকলে চোর যত শক্তিশালী হোক কিংবা সংখ্যায় যে ক’জন হোক তাদেরকে যে দমন করা যাবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই ।

বর্তমান বাংলাদেশের আলেমসমাজের বৃহদাংশ যে কোন কর্তৃপক্ষের চক্রান্তে দলিত হচ্ছে, তা তারা কতটুকু অনুধাবন করতে পারছে জানিনা তবে নিকট ভবিষ্যতে যে তাদের মেরুদন্ড কুঁজো হয়ে যাবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ আছে বলে বুদ্ধিমানদের মনে করা উচিত নয় । আলেমসমাজের চরম দ্বিধা-বিভক্তির সুযোগ নিয়ে তাদের এক পক্ষকে যে অন্যপক্ষের দমনে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটুকু বোঝার ক্ষমতা অন্তত আলেমদের থাকা উচিত কিন্তু আদৌ সে ক্ষমতা তাদের আছে বলে তাদের কোন পদক্ষেপে মনে হয়না । বাংলার মাটিতে দৃশ্যত আলেমরাই আলেমদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য শত্রুতে পরিণত হয়েছে । স্বার্থবাদ, গোঁড়ামী এবং অদূরদর্শীতার কারণে তারা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে নেতৃত্বের স্থান থেকে । ধর্মীয় দৃষ্টিকোনে আলেমদের যে সম্মানের স্থানে থাকা উচিত ছিল তার ধারেকাছেও আলেমরা নাই । কেননা বৃহৎ কিংবা ক্ষুদ্র কোন অদৃশ্য শক্তির অশুভ ক্রীড়ানকের কলকাঠি হয়েই তারা ব্যবহৃত হচ্ছে । আক্বীদার দোহাই দিয়ে তারা পরস্পরকে মুসলিম পর্যন্ত মনে করতে কার্পণ্য করছে । তুরুস্কের গাজী আতাতুর্ক কামাল পাশা কিংবা ইরানের রেজা শাহ পাহলভীর মত শাসকরা সে দেশের আলেমদেরকে ঘৃণ্যজীবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল বটে কিন্তু আমাদের দেশের আলেমদের সম্মান খোয়াতে কোন তৃতীয়পক্ষ প্রয়োজন হচ্ছে না বরং তারা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসবর্তিকা হিসেবে কাজ করছে । ‘আমিত্ব’ ভাব তাদেরকে সাধারণ মানুষের কাছে হাস্যের খোরাক হিসেবে উপস্থাপন করলেও তারা মনে করছে ওটাই বোধহয় তাদের জন্য মহাসম্মান । তারিক, খালিদ, হউসূফের উত্তরসূরীদের কমজোড়তা দেখলে বিশ্ববিজয়ী বীরতুল্য পূর্বসূরীর সাথে দূর্বল উত্তরসূরীর সম্পর্ক বর্ণনা করতে লজ্জা হয় । আকাশের নিচে এবং জমিনের ওপর যাদের মহাসম্মানে থাকার প্রত্যাশা ছিল তারা তাদের কৃতকর্মের দরুণ সবচেয়ে বেশি নির্য্যাতিত, অপদস্থ, অপমানিত, অবহেলিত, লাঞ্চিত গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে । ইসলাম বিরুদ্ধ কিংবা রাষ্ট্র বিরুদ্ধ কোন ব্যাপারে আলেমরা যখন তাদের স্বার্থ বহাল আছে কিনা তা দেখে মন্তব্য করে কিংবা চুপ থাকে তখন তাদের সম্মান তুলে রাখবে এমন ঠেকা পড়েছে কার ? আরেকদল মানুষ ইসলামের ব্যানার ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করে সর্বত্র আলেম এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন করলেও আলেমরা তার বিরুদ্ধে সোচ্চা নয় । আপন সিদ্ধুক ঘোচাতে গিয়ে যে তারা ঘরসহ বসত ভিটা হারাচ্ছে, সে ব্যাপারে তাদের কোন খেয়াল নাই । মূলকথা, বর্তমানের আলেম সমাজ তাদের পদ-পদবী তথা স্বার্থ টিকিয়ে রেখে তারপর কারো বিরোধিতা করবে নয়ত অন্ধ অনুসরণ ।

আক্বীদার দোহাই দিয়ে আলেমরা তাদের গা-বাঁচিয়ে রাখবে । তাদের সাথে কথা বলতে গেলেই আগে প্রমাণ দিতে হবে, মাজহাবী নাকি লা-মাজহাবী । মাজহাবীরা লা-মাজহাবীকে কিংবা লা-মাজহাবীরা মাজহাবীকে অন্তরে অন্তরে মুসলিম পর্যন্ত ঠাহর করে না । কওমী-আলীয়ার দ্বন্দ্ব যেন ধর্মের মূল ভিত্তিজাতীয় কিছু । জামা’আত আর হেফাজতের পরস্পর বিরুদ্ধ যুক্তি-তর্কশুনলে মনে হয় এরা পরস্পর পরস্পরকে আধা শয়তানের দল মনে করে । এক পীর সাহেবের মুরীদ আরেকপীর সাহেবের মুরীদকে মুসলিম মনে করে কিনা সন্দেহ, এক পীরসাহেব অন্য পীরসাহেবের বরাতে জান্নাত আছে কিনা তা নিয়েই বোধহয় সন্দিহান । কেউ কেউ তাবলীগকেও ভ্রান্ত মনে করে তাদের বিরুদ্ধাচারণ করে । মাঝে মাঝে মনে হয়, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সাথে আহলে হাদীসের যুদ্ধ ঘনালো আর কি ! অথচ এই আলেমদেরকে জিজ্ঞাসা করুন, তারা অকপটে বলবে তাদের স্রষ্টা এক, তাদের রাসূল এক, তাদের কিতাব এক, তাদের কালেমা এক, তাদের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যও এক-সবকিছু এক হওয়ার পরেও তারা এক প্লাটফর্মে আসবে না । কারো কাছে কেউ ছোট হবে না । একদল আকাবের নিয়ে মত্ত তো আরেকদল তাদের নিজস্ব মতের বাইরেও যে ধর্মের কোন বিধি-নিষেধ থাকতে পারে সেটা স্বীকার করতে নারাজ । আলেমদের দূরত্বের কারণে আজকের ইসলামের শত্রুরা যে ইসলাম ও মুসলিমদের শুধু প্রকাশ্যভাবে হাসি-ঠাট্টা করছে এমনটা নয় বরং আলেমদেরকে প্রমাণ করে ছেড়েছে, নিকৃষ্ট মানসিকতার । ধর্মের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার সাহস পাচ্ছে । আলেমদের মাঝে সৃষ্ট বৈষম্য-বিভাজনে জ্ঞানহীনরা আলেমদের পুতুলের মত নাচাচ্ছে আর আলেমরা সঙ হয়ে বেড়াচ্ছে সমাজজুড়ে ।

ভাবতে পারছি না, আলেমদের পরিণতি কি হবে । সামান্য মিলাদ-কিয়াম নিয়ে যাদের একদল আরেকদলকে কাফের ফতোয়া দিতে পারে তারা যে সমাজের সম্মানের স্থানে থাকছে না সেটা নিশ্চিত । ইসলামের মৌলিক ব্যাপারগুলোতে যারা বাড়াবাড়ি করছে, তাদের ব্যাপারে আলেমদের কোন হুঙ্কার নাই অথচ কে মিলাদের সময় দাঁড়ালো আর কে দাঁড়ালো না, কে নামাজের শেষ বেঠক সমাপান্তে হাত উঁচিয়ে মোনাজাত করলো আর কে করলো না-এ নিয়েই তাদের বহাসের শেষ নাই । সমাধান তো কিছুর করতেই পারে না বরং সাধারণ মুসল্লিদের প্রত্যহ বিভ্রান্তিতে ফেলছে । প্রাচীন গ্রিসে সোফিস্টরা যেমন টাকার বিনিময়ে কপটতা প্রচার করে বেড়াত তেমনি দশা হয়েছে কিছু নামধারী আলেমের । যাদের ইসলাম সম্পর্কে কোন মৌলিক জ্ঞান নাই অথচ শুধ সুরেলা কন্ঠ পুঁজি করে এবং অভিনয় শিল্পীদের মত বাচন-ভঙ্গির বিক্রি করে তারা সমাজের মস্তবড় আলেম সেজে ইসলামকে করে তুলছে বিতর্কিত । ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথে প্রকৃত বিজ্ঞানের তেমন কোন সাংঘর্ষিকভাব নাই কিন্তু এইসব অজ্ঞাশ্রেণীর জ্ঞানী দাবীদাররা ইসলামের নামে এমন সব উদ্ভট মতবাদ বলে বেড়াচ্ছে যা ইসলামের কোথাও নাই এবং যা বিজ্ঞাসম্মত নয় । সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতজনরা ব্যবসায়ী আলেমদের কথাকে ইসলামের কথা ভেবে ইসলাম সম্পর্কে নৈতিবাচক ধারণা পাচ্ছে ।

আলেমদের স্বার্থেই আলেমদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে । সসম্মানে সমাজে টিকে থাকতে হলে তাদের মধ্যকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিরোধ ভুলে মতানৈক্যসহ ঐক্য গড়ে তুলতে হবে । কোরআন হাদীসের বিধি-নিষেধ যারা মানে তাদের মধ্যে একতা সৃষ্টির মাধ্যমের রুখে দাঁড়াতে হবে ইসলাম বিদ্বেষী চক্রের বিরুদ্ধে, মুসলিম সেজে যারা ইহুদী-নাসারার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে তাদেরকে পরিত্যাগ করতে হবে দলেবলে । ভন্ডপীর এবং কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে করতে হবে মানসিক যুদ্ধ । ইসলামের ব্যানারে যারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করছে তাদেরকে দমন করতে হবে শক্ত হাতে । আলেমরা অন্ধ অনুকরণে সরকারের শত্রু কিংবা বন্ধু কোনটাই হতে পারে না । সরকার যদি ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষা করে রাষ্ট্র পরিচালনা করে তবে আলেমদের ওপর কর্তব্য হয় সে সরকারকে সহায়তা করা । আর সরকার যদি ইসলাম বিরুদ্ধ পথে হাঁটে তবে আলেমদের ওপর আবশ্যক হয় এর প্রতিবাদ করে মিথ্যাকে প্রতিহত করার । পারস্পরিক কাঁদাছোড়াছুড়ি বন্ধ করে আলেমদের হৃদয়ে যদি ইসলামের প্রতি স্বার্থহীন ভাবনা-ভালোবাসা জাগ্রত হয়, জাগ্রত হয় দেশপ্রেম তবেই কেবল প্রতিষ্ঠা পাবে শান্তি । আজও মানুষ আলেমদেরকে শ্রদ্ধা করে, সম্মান দেখায় । এটা ধরে এবং জিইয়ে রাখার দায়িত্ব প্রকৃত আলেম সমাজের । তাদের মধ্যে রেষারেষি বড় বেমাননা দেখায় । আলেম সমাজে সমাজে দূরত্ব তাদের জন্য যেমন অকল্যান বয়ে আনবে, দুর্দশার অমানিষায় ডোবাবে তেমনি রাষ্ট্রকেও করে তুলবে বিশৃঙ্খল । সর্বোপরি গ্রাম্য মানুষের রচিত শিক্ষণীয় গল্প থেকে শিক্ষা গ্রহন করা আলেমদের জন্য অতি আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

রাজু আহমেদ। কলামিষ্ট ।

Related posts