September 25, 2018

গ্যাংস্টার’ থেকে যেভাবে আত্মঘাতী হামলাকারী

27 Mar, 2016, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে জেল খেটে অপরাধী চক্রের সদস্য হিসেবে পুলিশের নজরে ছিলেন দুই ভাই, তারাই ব্রাসেলসে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে প্রাণ নিলেন ৩১ জনের।ইব্রাহিম এল-বাকরাউয়ি ও খালিদ এল-বাকরাউয়ি বেলজিয়ামের পুলিশ ও বিচার বিভাগ কর্তৃপক্ষের কাছে পরিচিত মুখ হলেও তাদের উগ্রপন্থি হয়ে ওঠার বিষয়টি অগোচরেই থেকে গেছে।

গত ২২ মার্চ সকালে ব্রাসেলসের ইয়াবেনতেম বিমানবন্দরে হামলা চালানো দুই আত্মঘাতী হামলাকারীর একজন ইব্রাহিম। তার ঘণ্টাখানেকের মাথায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান কার্যালয়ের কাছে মালবিক মেট্রো স্টেশনে আত্মঘাতী হামলা চালায় খালিদ। দুই ঘটনায় ৩১ জনের প্রাণহানির পাশাপাশি ২৭০ জন আহত হন।

গত বছর সিরিয়া সীমান্তের কাছে ইব্রাহিমকে ধরার পর দেশে ফেরত পাঠানোর সময় জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার সন্দেহের কথা বেলজিয়াম কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল তুরস্ক। তারপরও প্যারোলে মুক্তি পাওয়া এই দণ্ডিতকে কারাগারে ঢোকানো হয়। তার ভাই খালিদও প্যারোলে ছিলেন।
২০১০ সালের জানুয়ারিতে ব্রাসেলসের একটি মুদ্রা রূপান্তর প্রতিষ্ঠানে ডাকাতির চেষ্টাকালে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে কালাশনিকভ রাইফেল দিয়ে গুলি চালিয়ে এক কর্মকর্তাকে আহত করেন ইব্রাহিম।

ওই বছর সেপ্টেম্বরে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন ২৯ বছর বয়সী ইব্রাহিম। তার ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়।
চার বছর কারাভোগের পর প্যারোলে মুক্তি পান তিনি। ২০১৫ সালের মে মাসের শেষ দিকে হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যান। ওই বছর জুনে সিরিয়া সীমান্তে তুর্কি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন এবং তাকে বেলজিয়ামে ফেরত পাঠানো হয়।
একমাস পর ইব্রাহিম নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডামে ঢোকার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

প্যারোলে মুক্ত থাকার সময় কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়াই যেখানে শর্তের লংঘন সেখানে তুর্কি কর্তৃপক্ষ সতর্ক করার পরও ইব্রাহিমকে কারাগারে না নেওয়ায় বেলজিয়ামের ভেতর ও বাইরে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে পদত্যাগ করতে চেয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্র ও বিচারমন্ত্রী।

‘ব্যর্থতা’ স্বীকার করে বিচারমন্ত্রী কুন গেন্স বলেন, “তার (ইব্রাহিমের) তুরস্কে যাওয়া এবং পরে সিরিয়া সীমান্তে ধরা পড়াই তাকে পুনরায় কারাগারে ফেরত পাঠানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। আমাদের উচিত ছিল সে দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তাকে জেলে ঢোকানো।
“ওই মুহূর্তেই সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তার যোগাযোগের বিষয়টি আমাদের বোঝা উচিত ছিল এবং আমরা সেটা ধরতে ব্যর্থ হয়েছি। অপরাধের পথে হাঁটতে আগ্রহী ব্যক্তি যে ধর্মীয় উগ্রপন্থিতে পরিণত হতে পারে সেটা আমরা ঠিক সময়ে অনুধাবন কারতে পারিনি।”
অগাস্টে ইব্রাহিমের নাম ‘ওয়ান্টেড’ তালিকায় যুক্ত হলেও তখনও তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়নি।
অন্যদিকে ছোট ভাই খালিদকে (২৭) কালাশনিকভ হাতে একদল ছিনতাইকারীর সঙ্গে গাড়ি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করার সময় গ্রেপ্তার করা হয়। এজন্য ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয় তার।

২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ‘প্রবেশনে’ কারাগার থেকে ছাড়া পান খালিদ, প্যারোলে মুক্তির শর্ত পূরণের জন্য ২০১৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সেবামূলক কাজ করেন তিনি। এ সময় একবার উল্টো পথে গাড়ি চালিয়ে আসার জন্য তাকে আটক করা হয়।
পাশাপাশি ওই গাড়ি ছিনতাই চক্রের এক সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা লংঘন করেন তিনি। এজন্য ২০১৫ সালের মে মাসে আদালত তাকে সতর্ক করে এবং অক্টোবরে তিনি গায়েব হয়ে যান।

প্রসিকিউটর ক্রিস্টিয়ান হেনরি বলেন, “সে (খালিদ) আদালতের সমনের জবাব দেয়নি, টেলিফোন ধরেনি। এমনকি নিজের বাসস্থানের যে ঠিকানা সে আদালতকে দিয়েছিল সেখানেও সে বেশি দিন থাকেনি।
“গত মাসে আদালত তাকে পুনরায় কারাগারে ফিরিয়ে আনার আদেশ জারি করে। কিন্তু তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।”

গত ১৩ নভেম্বর প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলায় শতাধিক মানুষ নিহতের ঘটনার তদন্তে খালিদের সংশ্লিষ্টতা উঠে আসে। হামলাকারীরা যে ফ্ল্যাটে ছিলেন সেটি ভুয়া নামে ভাড়া করেছিলেন তিনি।
সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর খালিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
এই দুই ভাইয়ের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে না আসার বিষয়ে ইউরোপোলের পরিচালক রব ওয়াইনরাইট রয়টার্সকে বলেন, “আমরা জাতীয় কর্তৃপক্ষকে নজরদারিতে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তথ্য পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছি। কিন্তু তাদের কাছ থেকে খুব কমই তথ্য পাওয়া গেছে।”

অন্যান্য দেশের তুলনায় বেলজিয়ামে দ্রুত (সাজার মেয়াদের মাত্র এক তৃতীয়াংশ পার হওয়ার পর) বন্দিদের প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় বলে সমালোচনা রয়েছে।

এর জবাবে পার্লামেন্টে বিচারমন্ত্রী গেন্স বলেন, খালিদকে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র ১১ মাস আগে ছেড়ে দেওয়া হয়। আর ব্রাহিম ২০১৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্যারোলের শর্ত মেনে চলেছে।
“এ সপ্তাহে এল বাকরাউয়ি ভাইয়েরা যে ভয়ঙ্কর কাণ্ড করেছে তাদের অতীত অতোটাও ভয়ঙ্কর ইঙ্গিত দেয়নি।”

তবে চরমপন্থিদের নিয়ে কাজ করা পিটার ফন অস্টেয়াইন বলেন, বাকরাউয়ি ভাইদের সঙ্গে জঙ্গিদের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি বেলজিয়ান কর্তৃপক্ষ যথা সময়ে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।

“কারণ তারা সন্দেহভাজনদের ভুল তালিকা করেছে এবং বাকরাউয়ি ভাইদের সন্ত্রাসী হামলার হুমকি হিসেবেই বিবেচনা করেনি।” বি. নিউজ

Related posts