November 18, 2018

গ্যাংবাজির খুন ও ব্যোম্যানের বিদায়

asnanউত্তরায় এক গ্যাংয়ের হাতে খুন হয়েছে আরেক গ্যাংয়ের কিশোর আদনান। একই সময়ে মারা গেলেন পোলিশ সমাজতাত্ত্বিক জিগমুন্ত ব্যোম্যান। ওদিকে রুশ সমুদ্রকিনারে ভেসে এল বোতলবন্দী এক চিঠি, যার ভাষা কেউ পড়তে পারে না। কিসের বশে একদল কিশোর আরেক কিশোরকে খুন করে উল্লাস করে? গোষ্ঠীগত সহিংসতার বিপক্ষে কী উপায় বাতলাবেন সমাজতাত্ত্বিক? সময়সাগরতীরে ভেসে আসা চিঠির উত্তরই বা কী?
দুটি মৃত্যুর মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক এটুকুই, ব্যোম্যানের কাজই ছিল সময়ের সংকটের চেহারা তুলে ধরে সমাধানের উপায় খোঁজা। তাঁর কথা ধরেই বলি, ‘আসল সমস্যা হলো, কেন বিশেষ অবস্থার চাপে সাদাসিধা লোকও সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে?’ বিশ শতকের সমাজতাত্ত্বিকদের সারিতে ব্যোম্যানের স্থান একদম ওপরের সারিতে। নির্বাসিত এই চিন্তক অধ্যাপনা করতেন ইংল্যান্ডের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর তত্ত্বের নাম দেওয়া হয়ে থাকে ‘লিক্যুইড সোসিওলজি’। তিনি বলতেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে যাত্রী একই তরণির এবং এটাই মানুষের নিয়তি।’ কিন্তু যারা ত্রাস সৃষ্টি করে আনন্দ পায়, তারা ভাবে উল্টোটা।
ঢাকার উত্তরার ‘গ্যাংবাজি’ করা কিশোরেরা ভয় দেখিয়ে আনন্দ পেত। ব্যোম্যানের ভাষায় বললে, স্বৈরাচারীর মতো তারা ভাবত, তোমার ভয়ই আমার আনন্দ, আমার ক্ষমতা। ভয়ের শাসনের দাপট পরিবার থেকে সমাজ ও রাষ্ট্র পর্যন্ত। ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, গুম–হত্যা ও নির্যাতনের রাষ্ট্রীয় চর্চারই নকল করে সন্ত্রাসীরা। ‘গ্যাং কালচার’ ভয়ের শাসনেরই কৈশোরিক প্রতিবিম্ব। শুধু বড়লোকের পাড়া নয়, গরিব মধ্যবিত্ত পাড়ার তরুণদের মধ্যেও দাপুটে গ্যাংবাজি ছড়াচ্ছে।
উঠতি বয়সের কিশোরেরা দাপুটে মাচো বা ‘ব্যাটাগিরি’ ভালোবাসে। তারা বীর-নায়ক হতে চায়। সুস্থ সমাজে তাদের এই অভিলাষ পূরণ হয় সুস্থ পথে। রোমাঞ্চকর অভিযান, অন্যায়ের প্রতিরোধ কিংবা জনহিতকর কাজে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু এই সমাজ হয়ে পড়েছে মাইনফিল্ডের মতো। এখানে–ওখানে এর–ওর মনে বারুদ জমছে। কখন কোথায় সেই বারুদ ফুটবে, তা আগে থেকে বলার উপায় নেই।
সামাজিক সহিংসতায় বন্ধু বন্ধুকে, পুত্র পিতাকে, প্রতিবেশী প্রতিবেশীকে হত্যা করছে। ঘাতক ও নিহতদের তালিকাভর্তি তরুণদের নাম। তারুণ্য নিজেই যেমন ঝুঁকিতে, তারাই আবার ঝুঁকিরও সর্বনাম। আর ব্যোম্যানের দাবি, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা একসঙ্গেই চাই। এ দুটি সোনার পাথরবাটি না, পরস্পরের পরিপূরক। সমাজটাকে কারাগারের মতো সুরক্ষিত রাখা যায় বটে, কিন্তু তাতে স্বাধীনতা বলে আর কিছু থাকে না। সন্ত্রাস ও হানাহানি বাড়ার মুখে বিশ্বব্যাপী সরকারগুলো নাগরিক স্বাধীনতাকে নিরাপত্তার কাঁচি দিয়ে কেটে যাচ্ছে। এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্যের উপায় খুঁজেছেন ব্যোম্যান।

যখন এক ভাই কাবিল আরেক ভাই হাবিলকে হত্যা করে, তখন ব্যোম্যান বলেন, একের মুক্তির জন্য অপরকে দরকার। যে আদনানের লাশ ফেলল, তার মনুষ্যত্ব কি বাঁচল? মুক্তি তো তারও দরকার। সমাজতাত্ত্বিক এক অর্থে নৈতিক ও চিন্তাগত নেতাও। ‘অপরাধী’ ধরা পুলিশের কাজ, তঁার কাজ কীভাবে অপরাধীর ভেতরের সামাজিক মানুষটাকে ফিরিয়ে আনা যায়। ব্যোম্যানের ভাবনা সামাজিক এতিম, শিকড়হারা শরণার্থী, দুস্থ ও খ্যাপাটে তরুণ, পণ্যাসক্ত ক্রেতা, বিশ্বায়নের কুফল তথা আজকের মানব-বাস্তবতা নিয়েই। সংহতি ও ভালোবাসা হারানো মানুষের মনের এক্স–রে যেন ব্যোম্যানের গবেষণাগুলো।
লিক্যুইড মডারনিটি বইয়ে তিনি দেখান, সংহত আধুনিকতা থেকে তরল উত্তরাধুনিকতায় ভাসতে ভাসতে দিশা হারাচ্ছে সভ্যতা। ষাটের দশকে (আমাদের আশির দশক পর্যন্ত) মানুষে মানুষে আস্থা ছিল, রাষ্ট্রের কাছ থেকে ভরসা ছিল, মানবতার মুক্তির আশা ছিল। তিনি একে বলছেন সলিড মডার্নিটি বা সংহত আধুনিকতা। কিন্তু বিশ্বায়িত পৃথিবীতে সবই গলে গলে গরল ভেল হয়ে গেছে। সলিড বিশ্বাস, সম্পর্ক, প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র সব যেন গলে যাচ্ছে। সমাজ নিজেই এতিম, মানুষ হয়ে গেছে নিঃসঙ্গ। রাষ্ট্র হয়ে পড়ছে নিদায় ও নির্দয়। নতুন প্রজন্ম মানাতে পারছে না পরিবার বা প্রতিষ্ঠান কোনো কিছুর সঙ্গে। এরা কেউ বা মাকড়সার মতো নিজ জালের মধ্যে নিঃসঙ্গ, কেউবা ফেঁসে যাওয়া সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে হয়ে পড়ছে খুনি, মাদকাসক্ত বা জঙ্গি। এভাবে সৃষ্টি হচ্ছে বাড়তি, পরিত্যক্ত ও খরচযোগ্য মানুষের।
ব্যোম্যানের লিক্যুইড লাভ বইটি আগের যুগের অমর প্রেমের তরল বাসনায় বুদ্বুদের মতো ফেটে পড়ার বিবরণ। আগেকার সম্পর্কগুলো ছিল ল্যান্ড ফোনের মতো স্থির ও প্লাগ্ড। আর এখনকার প্রেম মোবাইল ফোনের মতো আনপ্লাগ্ড; চলমান ও বদলযোগ্য। লিক্যুইড ফিয়ার বইয়ে এই উত্তরাধুনিক জীবনের অফুরান অনিশ্চয়তায় তটস্থ মানুষের ওপর আলো ফেলেছেন। তাঁর এসব কাজের ওপর ভিত্তি করে সমাজতত্ত্বে লিক্যুইড সোসিওলজি নামে একটি ধারাই গড়ে উঠেছে।
ফরাসি দার্শনিক ইমানুয়েল লেভিনাস ছিলেন ব্যোম্যানের ভাবনার আত্মীয়। দুজনই ভাবতেন, নৈতিকতাই হলো প্রথম দর্শন। কী সেই নীতির উদ্দেশ্য? তোমার ভাই, প্রতিবেশী, প্রজাতিকে হত্যা কোরো না। লেভিনাস বলতেন, ভাষার নির্যাস হলো বন্ধুত্ব ও সৌজন্য। যুদ্ধ ও হত্যার জন্য ভাষার প্রয়োজন হয় না, কথার দরকার পড়ে না, ঘৃণা হলেই চলে। এ জন্যই ঘৃণা অন্ধ আর মারণাস্ত্র নির্বোধ। যদি গ্যাংবাজরা শত্রুতা মেটাতে আদনানের সঙ্গে সংলাপ চালাত, তাহলে আর অস্ত্র ব্যবহারের দরকার হতো না। দল, জাতি, রাষ্ট্রের বেলায়ও এটা সত্য। যতক্ষণ আমরা সংলাপ চালাই, ততক্ষণ অস্ত্র বের করি না। তা তখন খাপে পোরা থাকে।
লেভিনাস বোঝাচ্ছেন: কাছে এলে মানুষ মুখের দিকেই তাকায়। মুখ—যা খোলা, অরক্ষিত ও নাজুক। অচেনা কাউকে দেখলে মানুষ প্রথমেই ভাবে সেই মুখ কি বিশ্বাসযোগ্য? ঘুমন্ত মুখ যেমন সরল, হিংসা ও অহংকে ঘুম পাড়াতে পারলে মানুষও তার মুখের মতোই সহজ হয়ে উঠত। পরিচিত মানুষ যখন অন্য মুখ নিয়ে আসে, তখন তাকে আর বিশ্বাস করি না। আদনানের খুনিরা সেই অচেনা মুখ নিয়েই এসেছিল। লেভিনাস বলেন, মানুষের মুখ নিয়ে আসে এক অন্তর্বিষ্ট বিল্ট-ইন ‘ঔচিত্যবোধ’। বিবেক তখন আমাদের বলে, মুখের ওপর ‘না’ কোরো না, অপমান কোরো না, কারও মুখ ভোঁতা করে দিয়ো না। অথচ হত্যার আগে আদনানের মুখ ওরা ভোঁতা করে দিয়েছিল।
এমন সার্বিক সংকটে রাজনীতির মারাত্মক প্রয়োজন। ব্যোম্যান বলেন। যে রাজনীতি মুক্তিকামী এবং যে রাজনীতির গোড়ায় থাকবে মানুষ। যেখানে তরুণের অপমৃত্যু, শরণার্থীর দেশান্তর, আর গণজীবন খরচযোগ্য ভাবা হবে না।
সমুদ্রকিনারে ভেসে আসা ওই বোতলবন্দী চিঠির ভাষা উদ্ধার করা যায়নি। কিন্তু সমকালের তীরে ভেসে আসা বোতলবন্দী প্রশ্নের উত্তর না খুঁজলে আরও বিপর্যয় অবধারিত। ব্যোম্যান নিজেকে আজীবন বামপন্থী বলতেন। বলতেন নতুন চিন্তা ও সংকল্প দিয়ে মানবমুক্তির পুরোনো আশাকে বাঁচিয়ে রাখার কথা। বলতেন জনগণ ও বুদ্ধিজীবীর মধ্যে সংহতির কথা। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি যুগের বুদ্ধিজীবীর কাজ হলো যুগের জ্বলন্ত প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায়ও প্রশ্নটা দেখা দিয়েছিল, ‘কেবলই ব্যক্তির—ব্যক্তির মৃত্যু শেষ করে দিয়ে আজ আমরাও মরে গেছি সব’?

Related posts