September 20, 2018

গোয়েন্দা নজরদারিতে ১০০ বিলাসী গাড়ি

ঢাকাঃ  শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা অন্তত একশত বিলাসবহুল গাড়ি ধরতে ফাঁদ পেতেছে গোয়েন্দারা। ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী রাজনীতিকরা ভুয়া তথ্য দিয়ে এসব গাড়ি আমদানি করেছেন। আমদানিতে তারা বড় অঙ্কের শুল্ক ফাঁকি দিয়েছেন। অবৈধভাবে বা বৈধভাবে এনে নিয়ম বহির্ভূতভাবে যেসব বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার হচ্ছে তা চিহ্নিত করতে নজরদারি শুরু করেছে শুল্ক গোয়েন্দারা। এসব গাড়ির অবস্থান ও মালিকদের শনাক্ত করার পাশাপাশি কোথা থেকে কিভাবে গাড়িগুলো এসেছে তার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকা এসব গাড়ির মধ্যে বিশ্বখ্যাত রেসিং কার ওডিআর-আটও রয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি টের পাওয়ার পর থেকেই গাড়িগুলো স্থানান্তর করা হয়েছে। অনেক গাড়ির নম্বর প্লেট পরিবর্তন করা হয়েছে। এসব গাড়ি আমদানিকারীরা অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় বেগ পেতে হচ্ছে গোয়েন্দাদের। আমদানি করা এসব গাড়ির মূল্য দুই থেকে ১৪ কোটি টাকা পর্যন্ত। গত কয়েক দিন ধরে তথ্য নিয়ে রাজধানীতে একই ব্যক্তির অধীনে এরকম ১০টি গাড়ির সন্ধান পেয়েছেন গোয়েন্দারা। গাড়িগুলো আটক করতে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যে কোনো সময় তা আটক করা হবে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। ওই ১০টি গাড়ির মধ্যে একটি গাড়ির নজরদারির কথা স্বীকার করেছেন শুল্ক গোয়েন্দারা। ওই গাড়ির মূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা।

‘ওডিআর-আট’ ব্র্যান্ডের গাড়িটি সাদা রঙের। এটি বিশ্বখ্যাত রেসিং কার। গাড়ির দাম অনুযায়ী ৮৪১% হারে শুল্ক পরিশোধযোগ্য। যার পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি টাকা। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, গুলশানে কামাল নামে একজনের গ্যারেজে রয়েছে গাড়িগুলো। গাড়িগুলো যাতে অন্যত্র সরাতে না পারে এজন্য তৎপর গোয়েন্দারা। সূত্রমতে, গোয়েন্দা নজরদারি টের পাওয়ার পর থেকেই গাড়িগুলো বাইরে বের করা হচ্ছে না। বিভিন্ন কৌশলে জার্মান থেকে এসব গাড়ি আমদানি করা হয়। ইপিজেড কোটায় অনেক গাড়ি শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আমদানি করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শুল্ক ফাঁকি দেয়ার জন্য ব্র্যান্ড সম্পর্কে ভুয়া তথ্য দিয়ে গাড়ি আমদানি করা হয়। সূত্রমতে, ৫২০০ সিসি গাড়িকে দেখানো হয়েছে ২৫০০ সিসি। এভাবেই শুল্ক ফাঁকি দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও বিদেশি পর্যটকদের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিদেশ থেকে দেশে গাড়ি আনার সুযোগ রয়েছে। ওই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিলাসবহুল অনেক গাড়ি দেশে আনা হয়েছে। নিয়মানুযায়ী এসব গাড়ি পর্যটকদের জন্য ‘কার্নেট ডি প্যাসেজ’ সুবিধায় বাংলাদেশে এনে আবার বাইরে ফেরত নিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বেশিরভাগ গাড়িই ফেরত যায়নি। নানা প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি গাড়ি উদ্ধার করেছেন গোয়েন্দারা। গত এক বছরে আটটি গাড়ি জব্দ করেছেন তারা।

শুল্ক ও গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান মানবজমিনকে জানান, নানা কৌশলে ভুয়া তথ্য দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অনেক গাড়ি আমদানি করা হয়েছে। এসব গাড়ি উদ্ধারের জন্য শুল্ক গোয়েন্দারা তৎপরতা চালাচ্ছেন। ইতিমধ্যে অনেকগুলো গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে।

গত ৩০শে এপ্রিল এ্যাপেলো হাসপাতালের পার্কিং থেকে বিলাসবহুল রেঞ্জ রোভার নামের গাড়ি জব্দ করেন গোয়েন্দারা। তার আগে ২৮শে এপ্রিল ওই গাড়ি সম্পর্কে তথ্য পান তারা। গাড়িতে জাতীয় সংসদ সদস্যের স্টিকার ছিল। তাৎক্ষণিকভাবে হযরত শাহজালাল (রহ.) বিমানবন্দরের খিলক্ষেতের হোটেল ‘ঢাকা রিজেন্সি’তে ওই দিন রাতে অভিযান চালানো হয়। অভিযানের খবর পেয়ে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যান সংশ্লিষ্টরা। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গাড়ি আটকের জন্য অভিযান জোরদার করা হয়। শেষ পর্যন্ত এ্যাপেলো হাসপাতালের পার্কিং থেকে গাড়িটি জব্ধ করা হয়।

গোয়েন্দারা জানান, উদ্ধারের পর ওই গাড়িতে এমপি স্টিকার পাওয়া যায়নি। এমনকি নম্বর প্লেটটিও পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু হাসপাতালের পার্কিং রেজিস্ট্রারে আগের নম্বরটি এন্ট্রি থাকায় এ বিষয়ে নিশ্চিত হন গোয়েন্দারা। গাড়িটি কারনেট সুবিধায় শুল্কমুক্ত হিসেবে আনা হয়েছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এটি ফেরত দেয়া হয়নি। বিলাসবহুল এই গাড়ির মূল্য সাড়ে তিন কোটি টাকা।

১০ই এপ্রিল সিলেট থেকে দুই কোটি টাকা মূল্যের মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি জব্দ করেন গোয়েন্দারা। সিলেট নগরীর মজুমদারির বিএম টাওয়ারের পার্কিং থেকে রাত সাড়ে ১২টার দিকে গাড়িটি জব্দ করা হয়। গোয়েন্দারা জানান, কারনেট সুবিধা নিয়ে শুল্ক ছাড়াই সিলেটের প্রবাসীরা যুক্তরাজ্য থেকে গাড়ি দেশে আমদানি করেন। পরে গাড়ি ফিরিয়ে না নিয়েই তারা যুক্তরাজ্যে ফিরে যান। এছাড়াও অনেকে বাইরে গাড়ি আমদানি করে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার করে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছেন গোয়েন্দারা।

গত ৬ই এপ্রিল পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের পোরশে জিপ আটক করা হয়। গুলশান-১ এর ৩৩ নম্বর সড়কের তার্কিশ হোপ স্কুলের পেছনের ১০ নম্বর বাড়ি থেকে ওই গাড়িটি উদ্ধার করা হয়। প্যাসিফিক গ্রুপের মালিক শফিউল আজম মহসিন শুল্ক ফাঁকি দিয়ে কারনেট সুবিধায় গাড়িটি বাংলাদেশে নিয়ে আসেন বলে গোয়েন্দারা জানান। গাড়িটি কারনেট সুবিধায় আমদানি করা হয়েছিলো। বৃটিশ রেজিস্ট্রেশন (ঝঋ০৫ অটগ) ব্যবহার করে গাড়িটি ব্যবহার করছিলেন মডেল জাকিয়া মুন ও তার স্বামী ব্যবসায়ী শফিউল আজম মহসিন। মডেল মুন এলিফ্যান্ট রোডের এআরসি টাওয়ারের ২/এ, ৭৪ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টে বসবাস করেন।

তার আগে ৪ঠা এপ্রিল একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি উদ্ধার করে গোয়েন্দারা। গুলশান-২ এর ১০৪ নম্বর সড়কের ৫-জি নম্বর বাড়ি থেকে গাড়িটি উদ্ধার করা হয়। শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়িটি এনে অবৈধভাবে ভুয়া দলিল দাখিল করে বিআরটিএ থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে তা ব্যবহার করছিলেন বাসিন্দা কাজী রেজাউল মোস্তাফা।মানব জমিন

Related posts