December 13, 2018

গুলশান অফিস থেকে যেভাবে ২ নক্ষত্রের পতন: স্বস্তি লন্ডন ও তৃনমূলে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃঃ সম্প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার সাথে অসৌজন্যমুলক আচরন করায় মহিলা দলের সাধারন সম্পাদিকা শিরিন সুলতানা ও সাবেক এমপি রেহানা আক্তার রানুকে ধমকালেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে। তিনি তাদেরকে তার সাথে দেখা করতে নিষেধ করেছেন। একই সঙ্গে গাড়ি থেকে নামার পর তার হাত ধরে ভেতরে নিয়ে যাওয়াও বন্ধ করেছেন চেয়ারপারসন নিজেই।

গুলশান কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত সমালোচিত ছিলেন বিএনপির অঙ্গ সংগঠন মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরীন সুলতানা। প্রতিদিন রাতে খালেদা জিয়া নিজ কার্যালয়ে আসার আগেই উপস্থিত হতেন শিরীন। নেত্রী গাড়ি থেকে নামলেই তার হাত ধরে নিয়ে যেতেন ভেতরে। এছাড়া খালেদা জিয়ার নিজ আসন ফেনী-১ এর(পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া) দায়িত্বে ছিলেন সাবেক এমপি রেহেনা আক্তার রানু। তিনিও প্রতিদিন গুলশান কার্যালয়ে আসা যাওয়া করেন। শিরীন সুলতানার অনুপস্থিতিতে নেত্রী গাড়ি থেকে নামলেই রানু তাকে হাত ধরে ভেতরে যেতে সাহায্য করতেন।

দলের চেয়ারপারসনের হাত ধরাকে পূঁজি করে ওই দুই নেত্রী দীর্ঘদিন ধরে দলের অভ্যন্তরে আধিপত্য বিস্তার ও নানা রকমের বাণিজ্য করে আসছেন। বিষয়টি তৃণমুল নেতাকর্মীরা ভালো চোখে না দেখলেও নেত্রীর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কের কারণে তাদের এতদিন কেউ কিছু বলতেন না। এবার নেত্রী নিজেই তাদেরকে ধমকিয়ে এই হাত ধরার কাজ থেকে বিরত থাকতে বলায় মুখ খুলছেন অনেকেই। এছাড়া এই ঘটনার পর গুলশান কার্যালয়ে মিষ্টি বিতরণ ও আনন্দ উল্লাসও করেছেন দলের কিছু নেতাকর্মী। তাদের ধারণা নেত্রীর এই পদক্ষেপের ফলে দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ হবে।

সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রিকায় গুলশান কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নানা অনৈতিক কাজের খবর প্রকাশ হয়। তারা সবাই সিন্ডিকেট করে বিভিন্ন বাণিজ্যে জড়িত রয়েছেন। এদের ঘটনা ফাঁস হওয়ার পরই তৃণমুলের নেতাকর্মীরা জানান, বিতর্কিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো এই দুই নেত্রীর ব্যাংক একাউন্টেও অস্বাভাবিক লেনদেন পাওয়া যাবে।

সুত্র জানায়, শিরীন সুলতানা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক হলেও তিনি সংগঠনের সভাপতি নূরী আরা সাফাকে কোনঠাসা করে রেখেছেন। মহিলা দলের নেত্রীরা বলেন, শিরীনের কারণে কোনো শিক্ষিত ও ভদ্র নারীরা এই সংগঠনে যোগ দিতে অনিহা প্রকাশ করেন। কেউ যোগ দিলে তাকে শিরীনের কথামতো চলতে হয়। না চললে তাকে অপমাণিত হতে হয়। তার বিরুদ্ধাচরণ করলেই কপালে জোটে সবার সম্মুখে অপদস্থ হওয়া অথবা বহিষ্কার। তার পূঁজি একটাই, তিনি এতদিন নেত্রীর হাত ধরতেন।

এদিকে রেহেনা আকতার রানু নেত্রীর নিজের নির্বাচনী এলাকা ফেনীর দায়িত্বে থাকার কারণে গড়ে তুলেছেন সিন্ডিকেট। তার বাণিজ্যের প্রসার ঘটে এই দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি ছিলেন রানু। একই সাথে বেগম খালেদা খালেদা জিয়ার ফেনী-১ আসনের দায়িত্বও পালন করতেন তিনি। মূলত ওই সময়ই প্রভাব খাটিয়ে প্রচুর সম্পদের মালিক হন তিনি।

ফেনীতে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে তিনি দলের মধ্যে ঘষেটি বেগম নামে পরিচিত। তার কারণেই বিএনপির প্রধান দুর্গ খ্যাত চেয়ারপারসনের নিজ জেলা ফেনীতে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড রুগ্ন ও দেউলিয়া হয়ে গেছে। চেয়ারপারসনের কাছাকাছি থাকার সুবাদে মাত্রাতিরিক্ত স্বেচ্ছাচারিতা ও কতিপয় ব্যবসায়ী নেতার কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ফেনী জেলা বিএনপিকে অযোগ্যদের হাতে তুলে দিয়েছেন। এর প্রভাব পড়ে গত উপজেলা ও পৌর নির্বাচনে।

ফেনী পৌরসভা নির্বাচনে দেশের শ্রেষ্ঠ পৌর মেয়র আফসার আহমেদকে মনোনয়ন না দিয়ে একজন অযোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন পেতে সহযোগিতা করেন রানু। এর ফলে ফেনীর মতো বিএনপির ঘাটিতে বিএনপি প্রার্থী পরাজিত হন। ফেনী জেলার নেতাকর্মীরা জানান, রানুর কারণে আফসার আহমেদের মতো নিবেদিত প্রাণ রাজনৈতিক নেতারা এখন কোনঠাসা। গত ৭/৮ বছর ধরে তার এই স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে জেলা বিএনপি ও অংগ সংগঠনের নেতারা অভিযোগ দিয়ে আসলেও নেত্রীর কাছাকাছি থাকায় তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

জানা গেছে, এই রানু প্রতিদিন সন্ধ্যায় হাজির হন গুলশান কার্যালয়ে। নেত্রীকে সালাম দেয়া আর শিরীন অনুপস্থিত থাকলে নেত্রীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দোতলায় পৌঁছে দেয়াই ছিল তার কাজ। আর এটা দেখিয়ে দলে পদ-পদবি দেয়াটা তার বড় বাণিজ্য। হঠাৎ গত বৃহস্পতিবার নেত্রী গাড়ি থেকে নামার পর হাত ধরতে গেলে তাকে ধমক দিয়ে দূরে সরিয়ে দেন খালেদা জিয়া। এতে সেখানে উপস্থিত অনেকেই খুশী হন।

এরপর একই ঘটনা ঘটে গত শনিবার রাতে। ওইদিন খালেদা জিয়া গাড়ি থেকে নামার পর শিরীন সুলতানা তার হাত ধরতে গেলে তাকেও ধমক দিয়ে সরে যেতে বলেন। বিষয়টি নিয়ে তখনই গুলশান কার্যালয়ে কানাঘুষা শুরু হয়ে যায়। কেউ কেউ এতে অবাকও হন। নেত্রী কেন এই দুজনকে তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন এনিয়ে নানা জনকে নানা কথা বলতে শোনা যায়। কেউ বলেন, শিরীন আর রানুর বাণিজ্যের খবর নেত্রীর কানে পৌঁছার কারণেই তিনি তাদেরকে কাছে আসতে নিষেধ করতে পারেন।

এদিকে বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা চলমান। এরই মধ্যে সদ্য ঘোষিত দলের কয়েকটি যুগ্ম-মহাসচিবসহ সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদের বেশ কয়েকটি পদ বিক্রি করে কয়েক কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছেন গুলশান কার্যালয় কেন্দ্রীক সিন্ডিকেট। সাধারণ নেতাকর্মীদের ধারণা ওই সিন্ডিকেটে এই দুজন জড়িত থাকতে পারেন। অথবা খালেদা জিয়ার কাছে এমন তথ্য থাকায় তিনি এই দুজনকে দূরে সরিয়েছেন। কেননা সম্প্রতি দলের ৪২ জনের যে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে তাদের বেশ কয়েকজনকে খালেদা জিয়া চেনেন না। বাণিজ্য করেই তাদের পদ দেয়া হয়েছে।

লন্ডনে স্বস্তি

এদিকে লন্ডনে অবস্থানরত ঘনিষ্ঠ একজন নেতার সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত একটি অনলাইনের ( তাঁরা সংবাদটি প্রকাশও করেন) সাংবাদিক কথা বলে জেনেছেন, শিরীন-রানুকে দূরে সরানোর কারণে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান খুশী হয়েছেন। এই দুজনের চেয়ারপারসনের হাত ধরাটা পছন্দ করতেন না তারেক। এদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে লন্ডনে অনেক তথ্য প্রমাণসহ অভিযোগও জমা পড়েছে।

ওই নেতা আরো বলেন, সম্প্রতি জাতীয় কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যে দূরত্ব বেড়েছে তা অনেকাংশেই নিরসন হবে এরা দূরে থাকলে। ওই দুই নেত্রীর মতো গুলশান কার্যালয়ের সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তারেক রহমানের ক্ষোভ দূর হবে।

 

তৃনমূলের প্রতিক্রিয়াঃ
তৃনমূলের অনেক নেতা জানিয়েছেন, অনেক সাবেক এমপিও তার ( শিরিন সুলতানার) জন্য বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাত করতে পারে না । মহিলা দলের সাধারন সম্পাদিকা হিসাবে রাজপথে আন্দোলন করতে ব্যর্থ হয়ে শুধু গুলশান অফিসে হাজিরা দেওয়ায় তৃনমুলে অনেক ক্ষোভ রয়েছে । অনেক ভাল পরিবারের মহিলারা বেগম খালেদা জিয়ার কাছে আসতে পারে না। দেরীতে হলে ও বেগম খালেদা জিয়া চিনতে পেরেছেন ঘোষেটি বেগম কে ।

এ নেতারা আরো বলেছেন, শোনা যাচ্ছে আবার বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরার জন্য অনেকের কাছে কান্না-কাটি করছেন আরও অভিনব কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন । হাসপাতালে অসুস্হতার অভিনয় করে বেগম খালেদা জিয়ার সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করবেন বলে শোনা যাচ্ছে।

কথা বলার জন্য শিরীন সুলতানা ও রেহেনা আকতার রানুর মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও রানুর মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। অপরদিকে শিরীন সুলতানার মোবাইলে বহুবার রিং হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি সাংবাদিক পরিচয়ে এসএমএস করলেও তিনি যোগাযোগ করেননি।

Related posts