December 18, 2018

গুমের পর লাশ মিলছে তবে যত্রতত্র

ঝিনাইদহ জেলা শহরে অপহরণ-আতঙ্কে হারাম হয়ে গেছে অনেকের ঘুম। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কাউকে না কাউকে অপহরণ করা হচ্ছে কিংবা গুম হওয়া কারও লাশ মিলছে। অপহৃত হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের দাবি, সাদাপোশাকে অস্ত্রধারী কে বা কারা তাদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে এবং পরে মাথা বা বুকে গুলি করে হত্যা করে যেখানে-সেখানে লাশ ফেলে রেখে যাচ্ছে।

নিখোঁজ সন্তানের উদ্ধারের দাবিতে আবুজারের বাবা সেলুনকর্মী নুর ইসলাম গত ২৪ মার্চ ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে জানান, ১৮ মার্চ ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ পৌরসভা শিবিরের সভাপতি আবুজার গিফারীকে (২২) জুমার নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে বাসার সামনে থেকে সাদাপোশাকে পুলিশ পরিচয়ে চার ব্যক্তি মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যায়। একই দিনে দুপুরের পর শিবিরের নেতা কেসি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র শামীমকে (২০) কালীগঞ্জ পৌরসভাধীন মাহাতাব উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের পাশ থেকে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যায় সাদাপোশাক পরিহিত চার ব্যক্তি। ঘটনার প্রায় চার সপ্তাহ পর গত ১৪ এপ্রিল যশোরের বিরামপুর শ্মশান থেকে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে যশোর কোতোয়ালি থানার পুলিশ তাঁদের গুলিবিদ্ধ দুটি লাশ উদ্ধার করে। খবর পেয়ে নিহত আবুজর গিফারীর চাচাতো ভাই পাননু মিয়া ও শামিমের ভাই তাজনিম হুসাইন ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ দুটি আবুজার ও শামিমের বলে শনাক্ত করেন।

১০ এপ্রিল কালীগঞ্জের ঈশ্বররা গ্রামের মহসিন আলীর ছেলে ও স্থানীয় শহীদ নূর আলী কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র সোহানুর রহমানকে (১৬) কে বা কারা পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায়। সোহানুর রহমানের মা পারভীনা বেগম ১৮ এপ্রিল জেলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, সাদাপোশাকে চারজন অস্ত্রধারী তাঁর ছেলেকে কালীগঞ্জ-কোটচাঁদপুরের বড় রাস্তার ধার থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। তাঁর ছেলে কোনো রাজনীতি করে না। সে পড়ালেখা করে। তিনি ছেলেকে উদ্ধারের দাবি জানান। কিন্তু ২০ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার খাড়াগোদা গ্রামের চন্নতলা মাঠ থেকে পুলিশ তার কপালে গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি সিলেট থেকে ঢাকায় ফেরার পথে গোয়ালন্দ ঘাট পার হয়ে শিবির নেতা হাফেজ জসিম উদ্দীন (৩৩) তাঁর বাবাকে জানান, ডিবি পুলিশ পরিচয়ে সাদাপোশাকের লোকজন তাদের বাসটি চেক করবে বলে থামিয়েছে। এরপর থেকেই জসিমের মুঠোফোন বন্ধ রয়েছে। প্রায় ২০ দিন নিখোঁজ থাকার পর ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হিঙ্গেরপাড়া মোস্তবাপুর গ্রামের মাঠ থেকে পুলিশ জসিমের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে।

গত ২৩ জানুয়ারি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কুঠিদুর্গাপুর দাখিল মাদ্রাসা থেকে গান্না ইউনিয়নের অশ্বস্থলী গ্রামের মৃত নাসির উদ্দিনের ছেলে মাদ্রাসাশিক্ষক আবু হুরাইরাকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ৩৫ দিন নিখোঁজ থাকার পর গত ২৯ ফেব্রুয়ারি যশোর-চৌগাছা সড়কের আমবটতল এলাকার বেলতলা নামক স্থান থেকে আবু হুরাইরার লাশ উদ্ধার হয়।

পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের চিত্র

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি শৈলকুপার আনন্দনগর এলাকায় অবস্থিত শ্বশুরবাড়ি থেকে ঢাকার শনির আখড়ায় বসবাসকারী বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলামকে (৩৭) তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তার ফাঁস দেওয়া লাশ উদ্ধার করা হয়। ঝিনাইদহ শহরের লক্ষ্মীকোল গ্রামের ইউসুফ আলী বিশ্বাসকে (৪০) পানি উন্নয়ন বোর্ড এলাকা থেকে তুলে নেওয়ার পর তাঁর গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায় ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সুতিদুর্গাপুর গ্রামে। হাজীডাঙ্গা গ্রামের উজ্জ্বল হোসেনকে (৩২) নিজ বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার পর লাশ পাওয়া যায় সদরের লক্ষ্মীপুর গ্রামে। একই গ্রামের আসাদুল ইসলামকে (৩০) তুলে নেওয়ার পর তাঁর লাশ পাওয়া যায় লক্ষ্মীপুর গ্রামে। হরিপুরের মফিজুল হককে (৩০) নিজ বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার পর তার গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায় ঝিনাইদহ সদরের মাধবপুর চান্দেরপোল গ্রামে। কোটচাঁদপুর উপজেলা পরিষদ থেকে এনামুল হক বিশ্বাসকে (৫৫) তুলে নেওয়ার পর তার গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায় উপজেলার নওদাপাড়া গ্রামে। একই উপজেলার বলাবাড়িয়া গ্রামের ইউপি সদস্য হাফেজ আবুল কালামকে (৩৮) নিজ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার কয়েক দিন পর তার গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায় সদর উপজেলার মামুনশিয়া গ্রামে।

যশোর বড় রাজাপুর গ্রামের হাদিউজ্জামান হাদি (৪০) ও সোহাগ সরদারকে (৩০) তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের লাশ পাওয়া যায় কালীগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়িয়া গ্রামের মাঠে। ঝিনাইদহের হামদহডাঙ্গা গ্রামের মইনুদ্দীনকে তেতুলতলা বাজার থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর লাশ পাওয়া যায় নবগঙ্গা নদীতে। খাজুরা গ্রামের গোলাম আজম ওরফে পলাশকে (২৮) চুয়াডাঙ্গার দশমাইল বাজার থেকে ও দুলাল হোসেন (২৯) ঝিনাইদহ শহরের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁদের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায় ঝিনাইদহ সদরের ডেফলবাড়ি গ্রামের মাঠে। ঝিনাইদহ শহরের কাঞ্চননগর এলাকার মিরাজুল ইসলামের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায় চুয়াডাঙ্গা সদরের পান্নাতলা মাঠে। আরাপপুর এলাকার তৈমুর রহমান তুরানকে (৩৫) নিজ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায় মাগুরা সদরের রামনগর এলাকার আলমখাল ব্রিজে। কোটচাঁদপুর উপজেলার ধোপাবিলা গ্রামের ছব্দুল হোসেনকে (৪৫) নিজ বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার পর গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায় মাগুরার শালিখা উপজেলার ছোট থৈয়পাড়ায়। যশোর শহরের এনামুল হোসেনকে (২৩) বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর কালীগঞ্জের ফুলবাড়িয়ায় রেললাইনে ট্রেনে কাটা লাশ পাওয়া যায়। কালীগঞ্জের নলডাঙ্গা গ্রামের রবিউল ইসলাম (৪৭) ঝিনাইদহ থেকে বাড়ি ফেরার সময় তেঁতুলতলা বাজার থেকে গুম হওয়ার পর গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায় চুয়াডাঙ্গার ভুলটিয়া মাঠে। আজও সন্ধান মেলেনি গুম হওয়া শৈলকুপার কাচেরকোল গ্রামের আইয়ুব, ঝিনাইদহ শহরের ব্যাপারীপাড়ার আজাদ হোসেন এবং ঝিনাইদহ সদরে হরিপুর গ্রামের মোফাজ্জেল হোসেনের।

ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজবাহার আলী শেখ বলেন, ‘এ রকম কোনো তথ্য আমার জানা নেই।’ কালীগঞ্জ থানা অফিসার ইনচার্জ আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে এ বিষয়ে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেনকে বারবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন ডেরি/২ মে ২০১৬

Related posts