November 19, 2018

গুপ্তহত্যাঃ পুলিশের ভেতরে নানামুখী আলোচনা

ঢাকাঃ  রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে একের পর এক গুপ্ত হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বিগ্ন খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আগে থেকেই এসব হামলা কিভাবে ঠেকানো যায় তা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা নানারকম কৌশল প্রয়োগের চিন্তা করছেন। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলির কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও ঘটে যাওয়া হামলার আসামিদের দ্রুত চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনাকেই মূল কর্মকৌশল হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরে বিভিন্ন রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্রোপলিটন এলাকার কমিশনার ও ইউনিট প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসের (জানুয়ারি-মার্চ) অপরাধ পর্যালোচনার এই সভায় দেশজুড়ে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর গুপ্ত হামলার বিষয়টি আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। কিভাবে এই গুপ্ত হামলা ঠেকানো যায় তা নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজেদের মতামত দেন এবং সেগুলোর ভিত্তিতে আলোচনা করেন।

আইজিপি এ সময় জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান এবং সুষ্ঠু আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্যে আরও সতর্ক ও তৎপর থাকার জন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। সভায় আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। জঙ্গি কার্যক্রম সম্পর্কে পুলিশকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘ভাড়াটিয়া, ভাসমান ও অস্থায়ী আগন্তুকদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। তাদের সঠিক পরিচয় শনাক্ত করতে হবে। অপরাধী ও সন্ত্রাসী চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে কমিউনিটি পুলিশকে সম্পৃক্ত করার জন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের আহ্বান জানান তিনি।

বৈঠকে উপস্থিত হওয়া ডিআইজি পদমর্যাদার একাধিক কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে ব্লগার, ভিন্ন মতাবলম্বী পীর ও মাওলানা, বিদেশি নাগরিক হত্যা, হিন্দু পুরোহিত, শিয়াদের তাজিয়া মিছিল ও মসজিদে হামলা, খ্রিস্টিয়ান উপাসনালয়ের ফাদারদের হামলাসহ সর্বশেষ সমকামীদের অধিকার বিষয়ক ম্যাগাজিক রূপবান সম্পাদক ও যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য সংস্থা কর্মরত জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু নাট্যকর্মী তনয় হত্যা এবং টাঙ্গাইলের এক হিন্দু ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়। গুপ্ত হামলাগুলো কিভাবে ঠেকানো যায় সেজন্য পুলিশের কর্মকর্তারা তাদের নিজেদের মতামত দেন। এক্ষেত্রে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি গোষ্ঠী বিশেষ করে জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কার্যক্রমের বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারির বৃদ্ধির জন্য বলা হয়। একই সঙ্গে পুলিশের বিশেষ শাখা এসবিকে মাঠপর্যায়ে আরো বেশি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং পুলিশের পক্ষ থেকে সরকারের বিশেষ দুই গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বৃদ্ধি করে জঙ্গি দমনে জোরদার ভূমিকা রাখার বিষয়টি উঠে আসে।

জঙ্গি প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করেন, বৈঠকে উপস্থিত থাকা এমন একজন কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গিদের রাজধানীকেন্দ্রিক তৎপরতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে জঙ্গিরা নিজেদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। এজন্য উত্তরাঞ্চলে জঙ্গিদের বিষয়ে বিশেষ নজরদারি এবং গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করার আহ্বান জানান তিনি। সভায় ওই কর্মকর্তা বলেন, রাজধানীতে একাধিক হামলার ঘটনায় দেখা গেছে- বাইরে সংগঠিত হয়ে তারা ঢাকার অভ্যন্তরে এসে হামলা করেছে। জঙ্গি সংগঠন জেএমবি নানা ভগ্নাংশে ভাগ হয়ে গেছে। আনসারুল্লাহ বাংলা টিম খুব গোপনে তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে। জঙ্গিদের দলে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষিত কিছু তরুণ-যুবক ঢুকেছে যারা তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে অধিক দক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে পারঙ্গম। এ কারণে পুলিশের নবগঠিত কাউন্টার টেররিজম ইউনিটকে জোরেশোরে কাজ শুরু করার আহ্বানও জানানো হয় ওই সভায়।

বৈঠক সূত্র জানায়, সারা দেশে একের পর এক গুপ্ত হামলায় সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের মন থেকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূর করার জন্য এসব ঘটনা নিয়ন্ত্রণে রাখাটা জরুরি। এজন্য গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। একই সঙ্গে পুলিশকে জনমুখী করা এবং কমিউনিটি পুলিশিং বাড়ানোর জন্য জোর দেয়া হয়। এতে জনগণের কাছ থেকে অনেক আগাম তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও বলা হয়। সভায় ব্লগার হত্যা মামলার অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পাশাপাশি জানানো হয়, ১১টি ব্লগার হত্যা মামলার মধ্যে একটি মামলার বিচার হয়েছে। তিনটি মামলা বিচারাধীন এবং সাতটি মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, ত্রৈমাসিক অপরাধ সভা হলেও জঙ্গি হামলাগুলো বিশেষ আলোচনা হয়েছে। জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে সমূলে উৎপাটন করার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর নেপথ্য মদতদাতা ও টপ লিডারদের আইনের আওতায় আনা গেলেই এসব হামলা কমে যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। উত্তরাঞ্চলে একাধিক জঙ্গি হামলা এবং জঙ্গি তৎপরতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর প্রায় প্রত্যেকটিরই আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মূল হোতাদের ধরার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে জঙ্গিদের সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পর্কে আগাম তথ্য নেয়ার চেষ্টা চলছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত তিন বছরে ধর্মীয় উগ্রপন্থিরা ২৯টি হামলা করেছে। এর মধ্যে অন্তত ২০টি হয়েছে গত বছরেই। ২০১৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি কথিত নাস্তিক ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যার মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব নতুন করে জানান দেয় ধর্মীয় উগ্রপন্থিরা। এরপর মাঝের এক বছর বিরতি থাকলেও গত বছরের বিভিন্ন সময়ে একাধিক গুপ্ত হত্যা ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার মধ্যে ২৭শে ফেব্রুয়ারি টিএসসিতে বিজ্ঞানমনস্ক লেখক-ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যা, ৩০শে মার্চ তেজগাঁওয়ে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান হত্যা, ১২ই মে সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস হত্যা, ২৮শে সেপ্টেম্বর গুলশানে ইতালীয় নাগরিক হত্যা, ৩রা অক্টোবর রংপুরে জাপানি নাগরিক হোশিও কুনি হত্যাকাণ্ড, ৫ই অক্টোবর বাড্ডায় খিজির খান নামে এক কথিত পীরকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।

একই দিন পাবনার ঈশ্বরদীতে খ্রিষ্টান যাজকের ওপর হামলা, ৭ই অক্টোবর ব্লগার নীলাদ্রী চট্টোপাধ্যায় ওরফে নিলয় নীল হত্যা, ২২শে অক্টোবর গাবতলী পুলিশ চেকপোস্টে হামলা, ২৩শে অক্টোবর পুরান ঢাকার হোসেনি দালানের তাজিয়া মিছিলে হামলা, ২রা নভেম্বর একই সঙ্গে লালমাটিয়ায় ব্লগার-প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলের কার্যালয়ে ও শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে ব্লগার-প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনের ওপর হামলা চালানো হয়। ৪ঠা নভেম্বর আশুলিয়ায় পুলিশের চেকপোস্টে হামলা, ১৮ই নভেম্বর দিনাজপুরে ইতালীয় এক পাদরিকে হত্যাচেষ্টা, ২৬শে নভেম্বর বগুড়ায় শিয়া মসজিদে হামলা, ৫ই ডিসেম্বর দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দিরের রাসমেলায় হামলা ও ১০ই ডিসেম্বর দিনাজপুরে ইসকন মন্দিরে হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। চলতি বছরের ২১শে ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড়ের মঠ প্রধানকে হত্যা, ২২শে মার্চ কুড়িগ্রামে ধর্মান্তিরত এক খ্রিষ্টানকে হত্যা, ৭ই এপ্রিল পুরান ঢাকায় অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নাজিমউদ্দিন সামাদ হত্যা, ২৫শে এপ্রিল কলাবাগানে সমকামীদের অধিকার বিষয়ক ম্যাগাজিন রূপবান সম্পাদক ও যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য সংস্থায় কর্মরত জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব তনয়কে হত্যা করা হয়। সর্বশেষ ১লা মে টাঙ্গাইলে এক হিন্দুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

তিন মাসের অপরাধ পর্যালোচনা

ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের অপরাধ পর্যালোচনা সভায় পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অতিরিক্ত ডিআইজি জহিরুল ইসমাল ভূঁইয়া চলতি বছরের প্রথম তিন মাসের (জানুয়ারি-মার্চ) সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতি তুলে ধরেন। দেশব্যাপী অপহরণ, খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, নারী ও শিশু পাচার, অস্ত্র উদ্ধার, মাদকদ্রব্য উদ্ধারসহ সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সভায় পর্যালোচনা করা হয়। পর্যালোচনায় দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি গত বছরের শেষ তিন মাসের তুলনায় ভালো বলে দাবি করা হয়। গত বছরের শেষ তিন মাসে মোট মামলা হয়েছিল ৪৪ হাজার ২১৫টি। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে মামলার সংখ্যা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ২৬৯টি। এমনকি সারা দেশে আলোচ্য সময়ে খুন, দ্রুত বিচার, দাঙ্গা, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন ইত্যাদি মামলার পরিমাণ কমেছে বলে জানানো হয়। অপরদিকে ডাকাতি, দস্যুতা, অপহরণ, সিঁধেল চুরি, চুরি মামলার সংখ্যা বেড়েছে বলে জানানো হয়। এ ছাড়া মাদকদ্রব্য এবং চোরাচালান দ্রব্য জব্দ এবং বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধারের পরিমাণও বেড়েছে বলে জানানো হয়।

গতকাল বৈঠকের বিষয়ে পুলিশ সদরদপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে মোটর কার, মাইক্রোবাস, জিপ, মোটরসাইকেল, বেবি ট্যাক্সিসহ বিভিন্ন ধরনের ৫৬২টি গাড়ি চুরির মামলা হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কম। ২০১৫ সালের জানুয়ারি-মার্চ কোয়ার্টারে গাড়ি চুরির মামলা হয়েছে ৬২৩টি। আলোচ্য কোয়ার্টারে ৫৬২টি চুরি যাওয়া গাড়ির মধ্যে ৪৪৬টি গাড়ি উদ্ধার হয়েছে। গাড়ি উদ্ধারের হার শতকরা প্রায় ৮০ শতাংশ বলে জানানো হয়। এই তিন মাসে পুলিশ হতাহতের ঘটনায় সারা দেশে বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে মোট ১৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। বর্তমানে একটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। সভায় আইজিপি প্রতিটি খুনের মামলার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য সকল জেলা পুলিশ সুপারদের নির্দেশ দেন।

উৎসঃ   মানব জমিন

Related posts