December 11, 2018

গরমে পুড়ছে চার মহাদেশ


ঢাকাঃ  প্রকৃতির খাম-খেয়ালী আচরণে ওষ্ঠাগত প্রাণী জীবন। কোথাও টানা বৃষ্টি তো কোথাও পানির জন্য চরম হাহাকার। কোথাও শীত, আবার কোথাও তীব্র গরম। কড়া তাপে পুড়ছে আফ্রিকা, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ। ইতিমধ্যে ভারতে তীব্র তাপদাহে মারা গেছে ১৬০ জনের বেশি লোক। গরমের রেকর্ড ভেঙেছে থাইল্যান্ডে। গত ৬৫ বছরের মধ্যে দীর্ঘ তাপদাহ চলছে দেশটিতে। তীব্র পানি সংকটে রয়েছে ইথিওপিয়া। বাংলাদেশেও বয়ে যাচ্ছে তাপদাহ। দ্যা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক খবরে বলা হয়েছে, এসব হচ্ছে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে। অস্ট্রেলিয়ার একদল বিজ্ঞানী সতর্কবার্তা দিয়েছেন, চলতি বছর এই এল নিনো আরও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখাবে। জাতিসংঘ বলেছে, এল নিনোর প্রভাবে জলবায়ুর মারাত্মক পরিস্থিতির শিকার বিশ্বের প্রায় ছয় কোটি লোকের সহযোগিতা প্রয়োজন।

এল নিনো কী

এল নিনো হচ্ছে বায়ুমন্ডলীয় এবং গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের সমুদ্রগুলোর মাঝে একটি পর্যায়বৃত্ত পরিবর্তন। এর প্রভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার লক্ষণ দেখা দেয় এবং আবহাওয়ার নিয়মিত ধরণগুলোতে পরিবর্তন দেখা দেয়। এল নিনো হচ্ছে পর্যায়বৃত্তের উষ্ণ পর্যায়, আর লা নিনা হচ্ছে শীতল পর্যায়। পর্যায়বৃত্ত এই পরিবর্তনের কোন নির্দিষ্ট সময় নেই, তবে প্রতি ৩ থেকে ৮ বছরের মাঝে দেখা যায়। এল নিনো বন্যা, খরা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে সম্পর্কযুক্ত। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া এল নিনো ২০১৬ সালেও থাকবে বলে জানান আবহাওয়াবিদরা।

গরমে পুড়ছে চার মহাদেশ

গ্রীষ্মকাল আসতে না আসতেই গরমে প্রাণ উষ্ঠাগত। এই পরিস্থিতি কেবল বাংলাদেশে নয়, প্রতিবেশি দুই দেশ ভারত-মিয়ানমারের পরিস্থিতি আরো খারাপ। গ্লোবাল ইন্টেগ্রেটেড ড্রট মনিটরিং এন্ড প্রেডিকশন সিস্টেম (জিডম্যাপস) এর ম্যাপে দেখা যায় এশিয়ার মধ্যে মিয়ানমার, থাইল্যাল্ড, লাওস, কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনামে গরম-খরা-অনাবৃষ্টিতে জীবন-কৃষি সবই বিপন্ন। প্রতিদিনই হিটস্ট্রোকে মারা যাচ্ছে মানুষ।

এশিয়ার বাইরে আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশে বৃষ্টিপাতের দেখা নেই। দক্ষিণ আমেরিকার আর্দ্র ব্রাজিল ৩৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরার কবলে রয়েছে। অনাবৃষ্টির কারণে ৪৯ ট্রিলিয়ন লিটার পানি হারিয়েছে। নাসার তথ্য বলছে, হন্ডুরাস ও গুয়াতেমালায় ৩০ লাখের বেশি মানুষ কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। ইকুয়েডর ও এল সালভাদরে অনাবৃষ্টির কারণে ৬০ লাখ লোক অপুষ্টির শিকার হচ্ছে।

আফ্রিকাতে অনাবৃষ্টি-খরার কারণে ফসল না হওয়ায় চার কোটি মানুষ খাদ্য সংকটের মুখে পড়েছে। মালাবি, মোজাম্বিক, লেসেথো এবং জাম্বিয়াতে খরা ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া, জেবুতি এবং সোমালিয়ায় অনাবৃষ্টিতে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে। অস্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিউ সাউথ ওয়েলস, সা্থ অস্ট্রেলিয়া, তাসমানিয়াতে বৃষ্টির দেখা মিলছে না। কুইন্সল্যান্ড ও নিউ সাউথ ওয়েলসে অনাবৃষ্টি চলছেই।

আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোর কবলে পৃথিবী। যে কারণে চলতি বছরটি যে হতে যাচ্ছে সবচেয়ে উষ্ণতম বছর, এমন আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। ফলে ২০১৬ সালে ব্যাপক খরা এবং খাদ্যসঙ্কটের মুখোমুখি হতে চলেছে বিশ্ব। এ কারণে ২০১৬ সালে ক্ষুধা ও রোগবালাইয়ের প্রবণতা বাড়বে।

ভারতে মারা গেছে ১৬৫ জন

ভারতে তীব্র তাপদাহে মারা গেছে ১৬০ জনের বেশি লোক। বেশিরভাগই মারা গেছে দক্ষিণের রাজ্য অন্ধ্র প্রদেশ ও তেলেঙ্গানায়। তাপামাত্র বৃদ্ধির কারণে খরা বাড়ছে। একইসঙ্গে দেশব্যাপী পানি সংকট দেখা দিয়েছে। দেশটির সুপ্রিম কোর্টে দেয়া সরকারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত কারণে হুমকির মুখে রয়েছে দেশটির প্রায় ৩৩ কোটি লোক। বিহারে অদ্ভূত নির্দেশনা জারি করা হয়েছে গরমের কারণে। সকাল নয়টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে রাজ্যে রান্না করলে দুই বছরের কারাদণ্ড হবে। ভারতে সাধারণত মে ও জুন মাসে বেশি গরম পড়ে। কিন্তু এপ্রিলেই তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় এ কারণে মৃত্যু হার বাড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত বছর ভারতে তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত কারণে ২৪২২ জনের মৃত্যু হয়। ভারতের তাপদাহের কারনে ১৯৯২ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ২২ হাজার ৫৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

থাইল্যান্ডে ৬৫ বছরের মধ্যে রেকর্ড তাপামাত্রা

গরমের রেকর্ড ভেঙেছে থাইল্যান্ডে। গত ৬৫ বছরের মধ্যে দীর্ঘ তাপদাহ চলছে থাইল্যান্ডে। দেশের অনেক জায়গাতেই তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। থাইল্যান্ডে পানির অভাবে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। পূর্ব এশিয়ার সব কটি দেশের পরিস্থিতিও একই রকম।

এল নিনোর প্রভাব বাংলাদেশেও

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এপ্রিল মাস দেশে সবচেয়ে উঞ্চতম মাস। এই সময়ে সূর্যের অবস্থান থাকে মাথার উপরে। এছাড়া দিনের চেয়ে রাতের ব্যাপ্তিকালও কম। ফলে রাতের ব্যাপ্তিকাল কম হওয়ায় উপরের বায়ুমন্ডল ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ কম পাচ্ছে। যাতে গরম বেশি অনুভূত হচ্ছে। তবে তারা বলছেন, বাংলাদেশ এবং ভারতের বিশাল এলাকাজুড়ে এল নিনোর প্রভাবে এই সময়ের স্বাভাবিক বৃষ্টি হচ্ছে না। এই সময়ে বঙ্গোপসাগর থেকে দখিনা বাতাস দেশের ভূখন্ডে প্রবেশ করে বজ বৃষ্টি সৃষ্টি করে। এবার হঠাত্ করে পশ্চিমা বায়ু এই সময়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ওই দখিনা বায়ুকে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট, মৌলভীবাজারসহ কয়েকটি জেলার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফলে ওই এলাকায় টানা বৃষ্টি হচ্ছে আর সারা দেশ শুষ্ক খটখটে আবহাওয়া বিরাজ করছে।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রাজশাহী বিভাগে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। ঢাকা, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাঈজদীকোর্ট, খুলনা, যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলসহ রাজশাহী বিভাগের অবশিষ্টাংশের উপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারী ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এ তাপ প্রবাহ পরিস্থিতি আরো ২/৩ দিন অব্যাহত থাকতে পারে।ইত্তেফাক

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন ডেরি/২৮ এপ্রিল ২০১৬

Related posts