November 19, 2018

গণপরিবহনে বিড়ম্বনায় নারীরা, আসন সংরক্ষণের শর্ত লঙ্ঘিত


সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিট। অফিস শেষে মিরপুরে বাসায় যাওয়ার জন্য পল্টন মোড়ে অপেক্ষা করছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মিলি রহমান। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর ভিড় ঠেলে উঠলেন একটি বাসে। কিন্তু কোনো সিট খালি নেই। তবে ভাগ্য ভালো যে, একজন পুরুষযাত্রী তার আসন ছেড়ে দিলেন, যে অভিজ্ঞতা তার সচরাচর হয় না।
মিলি রহমান বলেন, “প্রতিদিন অফিসে আসা-যাওয়ার সময় বাসে উঠতে গিয়ে অনেক হেনস্তা হতে হয়। ভিড়ের মধ্যে কিছু বলাও যায় না। আর সিট তো প্রায়ই পাওয়া যায় না। আমরা তো পুরুষের মতো বাসের হাতল ধরে যেতে পারি না। আবার অনেক বাসে নারী সিট নেই বলে উঠতে দেয়া না।”

কয়েকবছর আগের তুলনায় এখন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের যাতায়াতের জন্য পরিবহন সুবিধা নেই। ফলে গণপরিবহনের ওপরই নির্ভরশীল থাকতে হয় তাদের। এছাড়া বিভিন্ন স্কুল, কলেজের ছাত্রীদের কিংবা অন্য কোনো কাজে গণপরিবহনের বাসে করে যাতায়াত করতে হয় নারীদের।
নারী যাত্রীদের জন্য রাজধানীর গণপরিবহনগুলোতে নেই পর্যাপ্ত আসন ব্যবস্থা। বাধ্য হয়েই অনেককে ঠেলাঠেলির মধ্যে দাঁড়িয়ে যেতে হয় গন্তব্যস্থলে। বিকল্প পথে গেলে খরচ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। রাজধানীর গণপরিবহনগুলোতে প্রতিনিয়তই দেখা যায় এ সমস্যা। নারীদের জন্য অাসন সংরক্ষণের শর্তও অনেক বাসেই লঙ্ঘন করা হচ্ছে।
রাজধানীর গণপরিবহনগুলোর মধ্যে দোতলা বিআরটিসির বাসগুলোর ১৩টি সিট নারীদের জন্য সংরক্ষিত। যার মধ্যে নিচে নয়টি এবং উপরে চারটি। অন্যগুলোর মধ্যে মিনিবাসগুলোতে ছয়টি এবং বড় বাসগুলোতে নয়টি আসন প্রতিবন্ধী, শিশু এবং নারীদের জন্য বরাদ্দ থাকে। এগুলোর মধ্যে আবার অনেক বাসের নারী আসনগুলো থাকে উত্তপ্ত ইঞ্জিনের ওপরে। যেগুলোতে বসা দায়।
সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন রুট ঘুরে দেখা যায়, নারী যাত্রীদের বরাবরই পুরুষদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে বাসে চড়তে হয়। এক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত দুর্বল নারীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলেও বাসে উঠতে পারেন না। আবার বাসগুলোতে নারী যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত যেসব আসন থাকে তাতে প্রায়ই পুরুষ যাত্রী বসে থাকেন। তাদের উঠে যেতে বলা হলেও সহজে উঠতে চান না। অনেক সময় বাসের হেলপার এবং পুরুষ যাত্রীদের বিকৃত মানসিকতার শিকার হতে হয়।
নারী সিট পুরুষ যাত্রী দখল করে বসার বিষয়ে ৮ নম্বর রুটের একটি বাসের হেলপার নাদিম নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “আমরা তো সবসময় নারী সিটে বসতে পুরুষদের মানা করি। অনেক সময় চিল্লাইলেও কাজ হয় না। বেশি কিছু বললে খারাপ ব্যবহার করে, মারতেও আসে।”
নারী যাত্রীদের নিতে চান না কেনো এমন প্রশ্নের জবাবে নয় বছর ধরে এ পেশায় থাকা নাদিম বলেন, “নারী যাত্রীদের বাসে উঠতে এবং নামতে অনেক বেশি সময় লাগে। তারা তাড়াহুড়ো করে উঠতে বা নামতে পারে না। বেশি সময় স্ট্যান্ডে থাকলে আবার সার্জেন্ট ঝামেলা করে।”
এ বিষয়ে যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “বর্তমানে ঢাকাসহ সারা দেশের কর্মজীবী নারীরা দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে কাজ করছেন। নারীদের কর্মক্ষেত্রে ও বিভিন্ন কাজে বাইরে যেতে হয়। কিন্তু তাদের চলাচলের জন্য গণপরিবহনে যে ছয়টি বা নয়টি সিট রাখা হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। সিট না পেলে তাদের অনেক সময় দাঁড়িয়ে যেতে হয়। নারীরা তো পুরুষের মতো বাসের হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে যেতে পারে না। এছাড়া গণপরিবহনে তাদের অনেক সময় বিড়ম্বনার মুখেও পড়তে হয়।”
তিনি বলেন, “এ সমস্যা সমাধানে গণপরিবহনে নারী সিটের সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং বিআরটিসিকে নারী বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করে এর ব্যবহার বাড়ানোর জন্য প্রচারণা চালাতে হবে।”
নারীনেত্রী ও মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “একটা কমপ্লেইন বক্স চালু করতে হবে। কোনো মেয়েকে যদি বাসে উঠতে না দেয় অথবা সে যদি হ্যারেজমেন্টের শিকার হয় তাহলে সে যেন কমপ্লেইন করতে পারে। পরবর্তীতে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ওই গাড়ির লাইসেন্স বাতিল করা কিংবা তাদের লাইসেন্স বাতিল করার ব্যবস্থা নিতে হবে। বাসের কন্ডাক্টর, হেলপার, ড্রাইভার এদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।”
বাসের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “শুধু নারী বাস বৃদ্ধি করলে হবে না। নারী বাস যখন চলবে অনেক সময় বেশি নারী থাকবে না। অনেক সময় পিক আওয়ারে অন্য বাসগুলো নারীদের নিতে চাইবে না। সেজন্য সব বাসে নারীদের সহজে যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে।”
তিনি বলেন, “সহযাত্রীর দ্বারা কোনো হ্যারেজমেন্ট হলে অন্য যাত্রীরা যদি তাকে সহযোগিতার হাত বাড়ায় তাহলে নারীর চলাচলে অনেক সুবিধা বাড়বে। সর্বোপরি আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে।”
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা গোলাম কাদের গণপরিবহনে নারীদের জন্য ৩০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ করা যায় কী না তা যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিত ঢাকা মহানগর পরিবহন কমিটির বৈঠকে নারী আন্দোলনের প্রতিনিধিদেরও রাখা হয়। আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হয়, প্রতিটি বড় বাসে নয়টি এবং মিনিবাসে ছয়টি আসন নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষণ করা হবে।
ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সংরক্ষিত আসনগুলো হবে চালকের পেছনে, চালকের পাশের লম্বা আসন কিংবা দরজার পাশে নয়। এটাকে চলাচলের অনুমতির (রুট পারমিট) অন্যতম শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এই সিদ্ধান্তের পর বিআরটিএ প্রতিটি বাসের রুট পারমিটের দলিলে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ড্রাইভারের পেছনে নয়টি আসন সংরক্ষণ করুন লিখে সিল মেরে দেয়া শুরু করে। একইভাবে মিনিবাসেও ছয়টি আসন সংরক্ষণের এমন সিল দেয়া হয়।
রুট পারমিটের শর্ত ভাঙলে চলাচলের অনুমতি বাতিল করার এখতিয়ার রয়েছে পরিবহন কমিটির। কিন্তু ২০০৮ সালে সিদ্ধান্ত নেয়ার পর নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী আসন সংরক্ষণ না করার কারণে কোনো গণপরিবহনের চলাচলের অনুমতি বাতিলের কোনো নজির নেই।
নিউজবাংলাদেশ

Related posts