December 11, 2018

খোদ রংপুরে জাপা ডুবতে যাচ্ছে

রাত পোহালেই শুরু হবে পৌর নির্বাচনের ভোটের লড়াই। প্রথম দফায় রংপুর বিভাগের ২৮টি পৌরসভার মধ্যে ২০টি পৌরসভায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এসব পৌরসভায় এলাকা ভিত্তিক মর্যাদারও লড়াই হবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। তবে জাতীয় পার্টির দুর্গে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় এই নির্বাচন হলেও লাঙ্গলের তেমন কোনো শোরগোল দেখা যাচ্ছে না। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী পৌরসভায় এরশাদের জাতীয় পার্টি শক্ত অবস্থানে থাকলেও সেখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থানও রয়েছে সমানে সমানে। বাকিগুলোতে জাপার অবস্থা নড়বড়ে। স্থানীয় ভোটার, পর্যবেক্ষক ও বিভিন্ন সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এদিকে, ভোট গ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা বেড়েই চলছে ভোটারদের মধ্যে। কিছু কিছু কেন্দ্র সংঘর্ষের আশঙ্কা করছে কোনো কোনো প্রার্থী।

যদিও নির্বাচন কমিশনের দাবি, কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি সাধারণ কেন্দ্রে ১০ জন এবং গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ১২ থেকে ১৪ জন অস্ত্রধারী পুলিশ, আর্মড পুলিশ, ১০ জন করে আনসার সদস্যের পাশাপাশি র‌্যাব ও বিজিবি থাকবে। এছাড়াও র‌্যাব পুলিশ স্ট্রাইটিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে। এক জন করে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রতি তিন কেন্দ্রের জন্য এক জন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ১১২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করবে।

নির্বাচন অফিস জানিয়েছে, ২০টি পৌরসভায় ৭ লাখ ১৯ হাজার ৬৪৪ টি ভোটের জন্য ১০৫ জন মেয়র, ২৭৩ জন মহিলা কাউন্সিলর ও ৮৩৮ জন সাধারণ কাউন্সিলর ভোটযুদ্ধে লড়াই করবেন।

স্থানীয় ভোটার ও পর্যবেক্ষদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের ২০টি পৌরসভা নির্বাচনে ১০টিতে বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগ, দুটিতে বিএনপির সঙ্গে ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী, দুটিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াত, একটিতে জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগ এবং দুটিতে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনার কথা।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, রংপুর বিভাগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে ঠাকুরগাঁও সদরে আওয়ামী লীগের তাহমিনা আক্তার মোল্লা ও বিএনপির মির্জা ফয়সল আমিনের মধ্যে। এছাড়া দিনাজপুর সদরে আওয়ামী লীগের আনোয়ারুল ইসলাম ও বিএনপির সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম; হাকিমপুরে আওয়ামী লীগের জামিল হোসেন ও বিএনপির সাখাওয়াত হোসেন শিল্পী; নীলফামারীর সৈয়দপুরে আওয়ামী লীগের সাখাওয়াত হোসেন খোকন ও বিএনপির আমজাদ হোসেন সরকার ভজে; লালমনিরহাট সদরে আওয়ামী লীগের রিয়াজুল ইসলাম রিন্টু ও বিএনপির আব্দুল হালিম; পাটগ্রামে আওয়ামী লীগের শমসের আলী ও বিএনপির একেএম মোস্তফা সালাউজ্জামান; কুড়িগ্রাম সদরে আওয়ামী লীগের আবদুল জলিল ও বিএনপির নুর ইসলাম নুরু এবং গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে আওয়ামী লীগের মো. আতাউর রহমান সরকারের সঙ্গে বিএনপির ফারুক আহমেদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আর রংপুরের বদরগঞ্জে আওয়ামী লীগ প্রার্থী উত্তম কুমার সাহার সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আজিজুল ইসলামের লাড়াইয়ের কথা বলছে স্থানীয় ভোটাররা।

দিনাজপুরের বিরামপুরে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী লিয়াকত হোসেন টুটুলের সঙ্গে বিএনপির আজাদুল ইসলাম আজাদ এবং সুন্দরগঞ্জ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী এটিএম মাসুদ-উল-ইসলাম চঞ্চলের সঙ্গে বিএনপির আজাদুল করিম প্রামানিক নিপুর।

অন্যদিকে, দিনাজপুরের বীরগঞ্জে আওয়ামী লীগের মোশাররফ হোসেন বাবুল ও জামায়াতের মাওলানা মোহাম্মদ হানিফ এবং নীলফামারীর জলঢাকায় আওয়ামী লীগের আবদুল ওয়াহেদ বাহাদুরের সঙ্গে জামায়াতের মকবুল হোসেন এবং গাইবান্ধা সদরে আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট শাহ মাসুদ জাহাঙ্গীর কবির মিলনের সঙ্গে জামায়াতের এ কে এম ফেরদৌস আলমের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ হোসেন ফাকুর সঙ্গে জাতীয় পার্টির আবদুর রহমান মিয়ার লড়াই হবে বলে স্থানীয় ভোটাররা ধারণা করছেন। যদিও সেটি মানতে নারাজ বিএনপি। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির দ্বন্দ্বের কারণে মেয়র পদটি বিএনপির ঘরে আসবে।

কুড়িগ্রামের উলিপুরে আওয়ামী লীগের আবদুল হামিদ সরকার, বিএনপির আবু আলা তারেক চৌধুরী ও জাতীয় পার্টির একেএম শফিকুল ইসলামের মধ্যে লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছে পর্যবেক্ষরা।

ভোটের মাঠের এমন খবরে হতাশ এরশাদ ভক্তরা। এক সময়কার রংপুর বিভাগ জাতীয় পার্টির দূর্গ হলেও এমপি এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের মত বড়বড় পদগুলো বেশিরভাগ দখলে গেছে আওয়ামী লীগের ঘরে। আর পৌরসভার মেয়র পদটিও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ঘরে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

বিভিন্ন সুত্র জানিয়েছে, এর আগে রংপুরের ৬টি এমপি আসনের মধ্যে জাতীয় পার্টির ঘরে ছিল ৬টিই। কিন্তু এই ৬টির মধ্যে এখন আওয়ামী লীগের দখলে গেছে ৪টি। শুধু সদরে দলের প্রধান এইচ এম এরশাদ আর গঙ্গাচড়ায় মশিউর রহমান রাঙ্গা। কুড়িগ্রামের চারটি আসনের মধ্যে শুধুমাত্র কুড়িগ্রাম-১ আসনটি আছে এরশাদের দখলে।

গাইবান্ধার সিনিয়র সাংবাদিক উত্তম সরকার জানান, এক সময় গাইবান্ধার সংসদীয় ৫টি আসনের মধ্যে ৪টি দখলে ছিল জাপার। এখন সবগুলোই আওয়ামী লীগের দখলে। লালমনিরহাটের ৩ সংসদীয় আসনের মধ্যে ২টি ছিল এরশাদেও জাতীয় পার্টির দখলে। এখন ২টি আছে আওয়ামী লীগের দখলে।

ঠাকুরগাঁও এর-৩টি আসনের মধ্যে জাপার দখলে ছিল একটি আসন। এখন সেটিও নাই। পঞ্চগড়ের ২টি আসনের মধ্যে জাতীয় পার্টি এখনো আসন নিতে পারেনি। একই অবস্থা দিনাজপুরেও। নীলফামারীর ৪টি আসনের মধ্যে ৩টি ছিল এরশাদের দখলে। এখন জাপার দখলে আছে একটি আসন। একই ভাবে উপজেলা নির্বাচনেও জাতীয় পার্টির অবস্থা হয়েছে সংসদীয় আসনের মত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার পৌরসভা নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অবস্থা আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না অবস্থার অবনতি হবে সেজন্য অপেক্ষা করতে হবে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু ভোটের মাঠে এরশাদের লাঙ্গলে হাওয়া খুব একটা লাগেনি বলে ধারণা স্থানীয় ভোটারদের।

রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা জানান, ‘নানা কারণে এই আসনগুলো আমাদের হারাতে হয়েছে। তবে আগামীতে স্যারের নির্দেশে আমরা হারানো আসনগুলো ফিরে পেতে সব ধরণের চেষ্টা করব।’

যেখানে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আছে, তারা বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন বলে আশা করছেন তিনি।

রংপুর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষভাবে ভোট গ্রহণের জন্য সকল প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে ও আশপাশের এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হয়েছে। ভোটাররা যাতে ভোট দেয়া থেকে শুরু করে ভোট দেয়ার পর বাড়ি পর্যন্ত নির্বিঘ্নে যেতে পারে সে জন্য সকল ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।ঢাকাটাইমস

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts