November 16, 2018

খালেদা-বার্গম্যানের শাস্তি রেখে আইন দাবি!

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বক্তব্যের জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের জামাতা ডেভিড বার্গম্যানকে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ রেখে আইন করার দাবি জানিয়েছেন আপিল বিভাগের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক একজন বিচারপতি।

সদ্য সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, “যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বা মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক সম্পর্কে কোনো রকম প্রশ্ন তুলবেন, সেগুলো অবশ্যই অপরাধের আওতায় আনতে হবে।”

মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞকে অস্বীকার বা এর বিকৃতি রোধে আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে যুদ্ধাপরাধ বিচারকারী অন্যতম এই বিচারক বলেন, “সেই আইনটি করতে হবে ভূতাপেক্ষ প্রয়োগ দিয়ে। অর্থাৎ অতীতে যারা এই ধরনের কথা বলেছেন, খালেদা জিয়া বা ডেভিড বার্গম্যানের মতো লোক, তাদেরকেও যেন এই আইনের অধীনে বিচারের আওতায় আনা যায়।”

এর পক্ষে তার যুক্তি, “আইন হয়ে যাওয়ার পর হয়ত খালেদা জিয়া বা বার্গম্যান সতর্ক হয়ে যাবেন।”

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেন, একাত্তরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা নয়, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন।

খালেদার আগে মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বাংলাদেশে অবস্থানরত ব্রিটিশ নাগরিক ও আইনজীবী সারা হোসেনের স্বামী ডেভিড বার্গম্যান, যিনি ব্লগ লিখে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে প্রচার চালান।

মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর মুক্তিযুদ্ধকে কটাক্ষ করে বক্তব্য ঠেকাতে আইন প্রণয়নের দাবি ওঠে। এ ধরনের একটি আইনের খসড়া তৈরিতে হাত দেওয়ার কথা জানিয়েছে আইন কমিশন।

এরইমধ্যে শনিবার যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে নব্বই দশকে গড়ে উঠা সংগঠন একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির এক সংবাদ সম্মেলনে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, “শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিএনপি নেত্রী যে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন, তাতে আমি বিস্মিত হইনি। কারণ আগাগোড়াই তিনি স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিলেন, যেমনটি ছিলেন তার স্বামী জিয়াউর রহমান।”

কিছুদিন আগে ড. কামাল হোসেনের জামাতা ডেভিড বার্গম্যানের লেখায়ও এই সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “তিনি (বার্গম্যান) কীভাবে এই দেশে থাকেন, সেটা একটা প্রশ্ন।

“এক কথায় যারা এই সব প্রশ্ন তুলছে, তারা সকলেই পাকিপ্রেমী। এগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুধু নয়, আমাদেরকে অ্যাকশনে যেতে হবে।”

একাত্তরে শহীদদের সংখ্যা স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে সরকার তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে দিয়েছিল বলে জানান বিচারপতি চৌধুরী।

“আমরা যখন দেখতে পেলাম, একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান এই বিষয়ে কথা বলছে, তখন আমাদের আর অপেক্ষা করার সময় নেই। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের কাছে আমাদের দাবি, অতি শিগগিরই যেন এই আইন প্রণয়ন করা হয়।”

ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির একাত্তরে শহীদ ও যুদ্ধাহতদের ক্ষতিপূরণ দিতে আলাদা আইন প্রণয়ন অথবা ১৯৭৩ এর আইন সংশোধন করে একটি ধারা সংযুক্ত করার দাবিও জানান।

এই বিষয়ে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, “যুদ্ধাপরাধীদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে আইন করতে হবে বা ’৭৩ এর আইনে একটি অধ্যায় সংযোজন করতে হবে।”

যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিষয়টি ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল, রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল, যুগোস্লাভ ট্রাইব্যুনাল এবং রোম সংবিধির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টে রয়েছে বলে জানান তিনি।

“এই সব ট্রাইব্যুনালের আইনে বলা আছে, যারা অপরাধী হিসাবে সাজাপ্রাপ্ত হবে, তাদের সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে।”

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ বলেন, “আমরা এর মধ্যে দুটি মামলায় ট্রাইব্যুনালের কাছে ভিকটিমদের জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়েছি। এগুলো হচ্ছে, হবিগঞ্জের সৈয়দ কায়সার ও রংপুরের এটিএম আজহারের মামলা।

“উভয় মামলাতেই ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, অবশ্যই ভিকটিমরা ক্ষতিপূরণ পাবার যোগ্যতা রাখেন এবং এই ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ পাবে এটাই স্বাভাবিক। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এই ধরনের আইন রয়েছে, এই ধরনের প্রচলিত পদ্ধতি রয়েছে।

“এই সব বলার পরও তারা বলেছেন, কিন্তু তারা দিতে পারছেন না। কারণ আমাদের আইনে এই ধরনের কোনো বিধান নেই।”

যুদ্ধাপরাধে দলের বিচারের জন্য যে সংশোধনীর প্রস্তাব রয়েছে, সেখানে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি যুক্ত করার আহ্বান জানান তুরিন আফরোজ।

মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকারে খেতাব কেড়ে নেওয়ার প্রস্তাব

কোনো মুক্তিযোদ্ধাও যদি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অস্বীকার করেন তাহলে তার নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ দেওয়া, ভাতা বন্ধ এবং খেতাব থাকলে তা কেড়ে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে।

খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমেদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতর অভিযোগ সম্পর্কে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে শাহরিয়ার কবির বলেন, “এই বিষয়ে অনেক লেখালেখি হচ্ছে, এ বিষয়ে আমরা আগেও বলেছি, কোনো খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা যদি ‘অস্বীকার অপরাধ আইন’র অধীনে অপরাধ করে, তাদের খেতাব কেড়ে নেওয়া হবে।

“খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে এটা আরও বড় অপরাধ বলে আমরা মনে করি। আইনে যে বিচার ও শাস্তির কথা থাকবে সেটাতো হবেই। সাথে সাথে খেতাব কেড়ে নিতে হবে।”

বিএনপির জোটসঙ্গী এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমেদ সম্প্রতি একটি টকশোতে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে দাবি করেন। ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি বলে দাবি করেন তিনি।

এ বিষয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক ও গবেষক মুনতাসির মামুন বলেন, “কোনো মুক্তিযোদ্ধা যদি এই ধরনের অপরাধ করেন, তাহলে তার ভাতা বন্ধ করতে হবে। তাকে আমরা মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি দিতে পারব না।”

‘জামায়াতকে কাছে টানতে খালেদার এই বক্তব্য’

পৌরসভা ভোট সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীকে কাছে টানতে বিএনপি চেয়ারপারসন মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য দিয়েছেন বলে মনে করেন অধ্যাপক মুনতাসির মামুন।

তিনি বলেন, পৌরসভা নির্বাচন স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তির লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

“খালেদা জিয়ার জোটের অনেকে মান অভিমান করে আসছেন না। পাকিস্তান চাচ্ছে তাদের পক্ষে কেউ কিছু বলুক, খালেদা জিয়া একদিকে সেই নির্দেশ মানছেন, অন্যদিকে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে তিনি পাকিস্তান পক্ষের ভোটাদের একত্রিত করার চেষ্টা করছেন।”

খালেদা জিয়া খুব ‘ভেবে-চিন্তেই’ ওই কথা বলেছেন বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

মুনতাসির মামুন বলেন, “গবেষণা প্রচুর হয়েই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নির্ধারিত হয়েছে। এখানে সরকারি ভাষ্যকেই মানতে হবে।

“ইউরোপীয় গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে প্রশ্ন উঠেছিল। তখন রায়ে বলা হয়েছিল, এটা যেহেতু সরকারি ভাষ্য। সেটাই সত্যি হবে। প্রতিদিন কতজন মারা গেছে, সেটা গুণে গুণে এটা ঠিক করা যায় না।”

তিনি বলেন, “আমরা বলি, ১৯৭০ সালের টর্নেডোতে ১০ লাখ লোক মারা গেছে। এটা কি গুণে গুণে লাশ দেখেছি। আনুমানিক হিসাবের ভিত্তিতে এই সংখ্যা হয়েছে। সরকার যেটা বলবে, সেটাই ভাষ্য হিসাবে ধরে নেওয়া হয়।

“৩০ লাখের বিষয়টি বঙ্গবন্ধুর আগে ‘প্রাভদা’ (সোভিয়েত ইউনিয়নের পত্রিকা) থেকে প্রথমে বলা হয়েছে। পরে বঙ্গবন্ধুও বলেছিলেন। সব সময় এটাই বলে আসা হচ্ছে। এটা নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নাই।”

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ, নির্যাতিত নারী, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা, চার মূলনীতি- এগুলো নিয়ে কোনো বিতর্ক চলতে পারে না বলে মন্তব্য করেন মুনতাসির মামুন।

“কোনো দেশে করতে দেওয়া হয় না,” বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে শহীদজায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীও বক্তব্য রাখেন।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts