November 14, 2018

খালেদা এ কেমন চমক?

ঢাকাঃ  বিএনপির নতুন কমিটি গঠনে সাংগঠনিক গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে অপেক্ষাকৃত তরুণদের দায়িত্ব দিয়ে চমক দেখিয়েছিল দলটির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। কাউন্সিলের পর এই পর্যন্ত বিএনপির মহাসচিব, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষসহ ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ পদের নেতা নির্বাচন করা হয়েছে। ঘোষিত কমিটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলক কম প্রভাবশালীদের হাতেই বিএনপি হাইকমান্ড দলের সাংগঠনিক পদগুলো তুলে দিয়েছেন। জানা গেছে, দলের প্রতি আনুগত্য ও সরকারবিরোধী আন্দোলনে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করায় গুরুত্বপূর্ণ এসব পদে তরুণদের দায়িত্ব দিয়েছেন খালেদা জিয়া। বিএনপি হাইকমান্ডের দল পুনর্গঠনে নেতা নির্বাচনকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন দলের নীতি নির্ধারকরা। এই পর্যন্ত ঘোষিত কমিটির মনোনীত নেতাদের দেখে উল্লসিত দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহাবুবুর রহমান নতুন কমিটি গঠনের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, দল পুনর্গঠনে অপেক্ষাকৃত তরুণরা গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পেয়েছেন। বিশেষ করে যারা ঝুঁকি নিয়ে অতীতে আন্দোলন-সংগ্রামে কাজ করেছেন আমাদের চেয়ারপার্সন সেই পরীক্ষিত নেতাদের পদায়ন করেছেন। যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও অধিকাংশ নতুন মুখ নেতৃত্বে এসেছে। এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। আশা করছি উদীয়মান তরুণদের নেতৃত্বে আমাদের ভবিষ্যৎ আন্দোলন বেগবান হবে। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি গ্রহণযোগ্য নতুন নির্বাচন আদায়ের লক্ষ্য অর্জিত হবে।

খালেদা-তারেক রহমান মুক্তি পরিষদের এক নেতা বলেন, দলের মধ্যে অনেক প্রভাবশালী নেতা আছেন। যারা দলের বিপদে মাঠে থাকেন না। কিন্তু বিভিন্ন কমিটিতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখা যায়। এবার তার ব্যতিক্রম দেখতে পাচ্ছি। একেবারে সাধারণ পর্যায়ের নেতাদেরও মূল্যায়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এভাবে ত্যাগী, পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করা হলে ভবিষ্যতে দলের জন্য ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার লোকের অভাব হবে না।

বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পদ-পদবি পাওয়ার ক্ষেত্রে অতীতের কর্মকাণ্ড ও দলের প্রতি কমিটমেন্টকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন খালেদা জিয়া। বিএনপি চেয়ারপার্সন ঘরোয়া এক আলোচনায় বলেছেন, ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি পরে বড় সালাম দিয়ে পদ নেয়ার দিন বিএনপিতে শেষ। মুখ দেখে আর পদ পদবি পাওয়া যাবে না। কাজ করে পদ নিতে হবে। যারা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করবে তাদের পদায়ন হবে।

১৯ মার্চ প্রায় সাত বছর পর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একাংশে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটি গঠনের সর্বময় ক্ষমতা কাউন্সিলররা অর্পণ করেন। দল সাজাতে বিএনপি চেয়ারপার্সন নিজেই হোমওয়ার্ক শুরু করেন। নেতাদের আমলনামা, বিগত সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা পর্যালোচনা শেষে তিনি ধাপে ধাপে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির নেতা নির্বাচন করছেন। কাউন্সিলের ১০ দিন পর প্রথম দফায় দলের মহাসচিব, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও কোষাধ্যক্ষ পদের নাম ঘোষণা করা হয়। দায়িত্ব দেয়া হয় যথাক্রমে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, রুহুল কবির রিজভী আহমেদ ও মিজানুর রহমান সিনহাকে। শনিবার ঘোষণা করা হয় দলের ৭ যুগ্ম মহাসচিব ও ৯ সাংগঠনিক সম্পাদকের নাম। যুগ্ম মহাসচিব পদে ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন ছাড়া বাকি ৬ পদেই নতুন মুখ নিয়োগ দেন খালেদা জিয়া। সাংগঠনিক সম্পাদক পদেও ফজলুল হক মিলন, আসাদুল হাবীব দুলু ছাড়া ৭ পদেই নতুনদের দায়িত্ব দিয়েছেন।

যুগ্ম মহাসচিব পদে নতুনভাবে দায়িত্ব পেয়েছেন- মজিবুর রহমান সরোয়ার, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, হারুনুর রশীদ ও আসলাম চৌধুরী। সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নতুনদের মধ্যে রয়েছেন- নজরুল ইসলাম মঞ্জু, শাহাদাত হোসেন, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু (রাজশাহী), সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, বিলকিস শিরীন ও শামা ওবায়েদ।

বিএনপির এই পর্যন্ত ঘোষিত মহাসচিবসহ ১৮ গুরুত্বপূর্ণ পদের নেতা মনোনয়ন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা নেতারাই পদোন্নতি পেয়েছেন। সরকারবিরোধী আন্দোলন, দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে বিগত সময়ে বিএনপির রাজনীতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, সালাহউদ্দিন আহমেদ, মোহম্মদ শাহজাহান, ড. আসাদুজ্জামান রিপনকে বিভিন্ন ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। এদের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গত পাঁচ বছরে একাধিকবার জেল খেটেছেন। অর্ধশতাধিক মামলার আসামি। পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। মির্জা আলমগীর বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানেরও আস্থাভাজন। দলের একটি গ্রুপ তাকে ঠেকানোর চেষ্টা করলেও অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে খালেদা জিয়া ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই মহাসচিব পদে পদোন্নতি দিয়েছেন। রুহুল কবির রিজভী আহমেদও বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্রশংসীয় ভূমিকা রেখেছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে মুখপাত্র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অজ্ঞাত স্থান থেকে বিবৃতি দিয়েছেন। তাকেও খালেদা জিয়া অনেক প্রভাবশালী নেতাকে ডিঙিয়ে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করে পুরস্কৃত করেছেন।

যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ দলের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অপহত হন। প্রায় আড়াই মাসের বেশি সময় তার কোনো হদিসই পাওয়া যাচ্ছিল না। অলৌকিকভাবে তাকে ভারতে পাওয়া যায়। শোনা যাচ্ছে, তাকে খালেদা জিয়া উপযুক্ত পদে পদায়ন করতে দলের নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে নিয়ে যাবেন। যুগ্ম মহাসচিব পদে পদায়ন পাওয়া নেতাদের মধ্যে মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও আসলাম চৌধুরীও বিগত সময়ে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ও বিলকিস শিরিনকে তৃণমূল থেকে উঠিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়া হয়েছে। জানা গেছে, জাতীয় স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা কাউন্সিল, সম্পাদকীয় পদেও পরীক্ষিতদেরই জায়গা দেবেন খালেদা জিয়া। সামনে আরো বড় ধরনের চমকও আসতে পারে।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/১০ এপ্রিল ২০১৬/রিপন ডেরি

Related posts