September 26, 2018

খালেদার টেবিলে অনেক এজেন্ডা

বাছির জামাল

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার হাতে এখন অনেক এজেন্ডা। একাধারে দু মাস চিকিৎসা ও আনুষঙ্গিক কারণে তিনি লন্ডনে অবস্থান করায় এ এজেন্ডা বেড়েছে বৈ কমেনি। খালেদা জিয়া ১৫ সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। ফিরেছেন মাত্র কদিন আগে ২১ নভেম্বর। এর মধ্যে দেশে ফেরার তারিখ কয়েকবার ঠিক করেও পিছিয়ে দেওয়া হয়। এরপরই কানাঘুষা থেকে একেবারে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে সরকারি দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বলেই দিয়েছিলেন, খালেদা জিয়া আর দেশে ফিরছেন না। এ কারণে দলের নেতা-কর্মীরাও একপর্যায়ে তাদের চেয়ারপারসনের দেশে ফেরা নিয়ে দোদুল্যমান ছিলেন। অবশেষে তিনি ফিরলেন। ফিরেই মুখোমুখি হলেন অনেক এজেন্ডার। দল পুনর্গঠন, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) অনুযায়ী গঠনতন্ত্রে উল্লেখ করা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাউন্সিল অনুষ্ঠান, নেতা-কর্মীদের মনে যে হতাশা বিরাজ করছে তার অপনোদন, সংলাপের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যের যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ এবং সর্বোপরি পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা এখন খালেদা জিয়ার টেবিলে।

এটা তো সবাই স্বীকার করেন যে, দুবার সরকারবিরোধী আন্দোলন সফলভাবে দাঁড় করাতে না পারায় এখন আবার আরও একটি আন্দোলন শুরু করার অবস্থায় নেই বিএনপি। তিনি এবং তার পুত্র দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে একেবারে তৃণমূলের সাধারণ কর্মী পর্যন্ত সবার বিরুদ্ধেই মামলা রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ দলের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা ও কর্মী রয়েছেন কারাগারে। অবশ্য মির্জা ফখরুল ও রিজভীর জামিন হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরের সিটি করপোরেশনগুলোর মেয়র এবং অধিকাংশ কাউন্সিলর বহিষ্কৃত। তাদের অনেককে আবার গ্রেফতারও করা হয়েছে। এমতাবস্থায় পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী ৩০ ডিসেম্বর দেশের ২৩৪টি পৌরসভায় একযোগে ভোট নেওয়া হবে। স্থানীয় সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তর পৌরসভায় নতুন পদ্ধতির এই নির্বাচন নিয়ে তৃণমূলের রাজনীতিতে এরই মধ্যে উৎসবের আমেজ বইতে শুরু করেছে।

প্রথমবারের মতো মেয়র পদে সরাসরি রাজনৈতিক দল মনোনীত প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ থাকায় জাতীয় রাজনীতিতেও এ নির্বাচন ভিন্নমাত্রা আনবে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন বিএনপিসহ এর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট এ নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না তার সিদ্ধান্ত জানতে বেগম জিয়ার বিদেশ থেকে ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন সবাই। তিনি ফিরেছেন। তাই বিএনপি চেয়ারপারসন এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত দেবেন কি না এমন প্রশ্নে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান বলেন, পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। এই নির্বাচনে বিএনপি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে অংশ নেবে বলে এক ধরনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ কারণে দলীয় সিদ্ধান্তের প্রয়োজন আছে। তার মতে, শিগগিরই স্থায়ী কমিটির বৈঠকের মাধ্যমে বিএনপি এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেবে।

২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাকে প্রহসনের নির্বাচন মনে করে বিএনপি। এজন্য চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি কর্মসূচি দিয়েছিল দলটি। কিন্তু প্রশাসনের কঠোর মনোভাব ও দলের দুর্বলতার কারণে সে কর্মসূচি সফল হয়নি। উল্টো দলের ওপর নাশকতার অভিযোগ দিয়েছে সরকারি দল। এসব অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ দলের অনেক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে শত শত মামলা রয়েছে। এবারও এগিয়ে আসছে এ দিনটি। তাই দিনটি উপলক্ষে কোনো কর্মসূচি রাখবেন কি না বেগম জিয়ার এমন প্রশ্নে বিএনপি নেতারা জানান, ৫ জানুয়ারির প্রহসনের নির্বাচনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে কর্মসূচি থাকতে পারে। তবে কর্মসূচি কী ধরনের হবে তা নির্ধারণ করবে দলের স্থায়ী কমিটি ও পরে জোটের বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা করে কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হতে পারে।

লন্ডন যাওয়ার আগেই খালেদা জিয়া দল পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। কিন্তু তার অনুপস্থিতি এবং সর্বোপরি মামলার কারণে দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে না পারা এবং অনেক নেতা আবার জেলে থাকায় পুনর্গঠন কার্যক্রম আশানুরূপভাবে এগুতে পারেনি। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানও এ নিবন্ধকারের কাছে সরকারের বিরুদ্ধে এমন একটি অভিযোগ এনে বলেছেন, ‘মামলা-হামলায় এমনিতেই দলীয় নেতাকর্মীরা পর্যুদস্ত। তার ওপর আবার সাহস করে যদি কোনো নেতা-কর্মী দল পুনর্গঠনের কাজে কোথাও একত্র হয়েছে তো সরকারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমনকি সরকারের পেটোয়া বাহিনী সেখানে গিয়ে উপস্থিত হচ্ছেন, নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার, হামলা করছেন।’ অবশ্য তিনি বলেন, তবুও আমাদের পুনর্গঠন কাজ এগিয়ে চলছে। এখন এটাই আমাদের প্রায়োরিটি।

তবে প্রশাসন ও সরকারি দলের ক্যাডারদের বাইরে খোদ বিএনপি নেতাদের হস্তক্ষেপের কারণেও দলীয় পুনর্গঠন কাজ থমকে আছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য যিনি ৮ম পার্লামেন্টে সদস্য ছিলেন তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ নিবন্ধকারের কাছে এমন অভিযোগ করে বলেছেন, দলের জেলায় জেলায় যে গডফাদাররা রয়েছেন, তাদের জন্য দলীয় কার্যক্রম এগুচ্ছে কোথায়! দলীয় পুনর্গঠন কাজে প্রশাসন ও সরকারি দলের বাধা তো রয়েছে সত্য। কিন্তু এর চেয়েও বড় সত্য হচ্ছে, গডফাদাররা তাদের ইচ্ছে মতো জেলা কমিটি করছেন। তাদের নির্দেশের বাইরে কিছু হওয়ার জো নেই। ইচ্ছে মতো নিজের পছন্দের লোক জেলা কমিটিতে রাখতে না পারলে সেখানে কমিটিই করতে দিচ্ছেন না। তিনি তার মতানুযায়ী বেশকিছু গডফাদারের নামও উল্লেখ করেন। তারা হচ্ছেন রাজশাহী জেলায় নাদিম মোস্তফা, নগরীতে মিজানুর রহমান মিনু, নাটোরে সাবেক উপমন্ত্রী অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, লালমনিরহাটে সাবেক উপমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, সিরাজগঞ্জে সাবেক প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুসহ এভাবে প্রতিটি জেলাতেই এমন গডফাদারের নাম রয়েছে।

সেপ্টেম্বরের মধ্যে জেলা কমিটিগুলোর গঠন কাজ শেষ করার কথা থাকলেও এসব কারণে তা আর হয়নি। অবশেষে অক্টোবরের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। তাও হয়নি। জেলা কমিটিগুলো শেষ করতে না পারলে ডিসেম্বরের মধ্যে কাউন্সিল অনুষ্ঠানের যে কথা ছিল, তাও অনিশ্চিত হয়ে যাবে। তবে যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি জেলা কমিটিগুলো কাউন্সিলের মাধ্যমে করা না যায়, তা হলে কেন্দ্র থেকে তা করে দেওয়া হবে। আর কাউন্সিল বৃহৎ আকারে করা যাবে না। চেয়ারপারসন দেশে এসেছেন। এখন তার নির্দেশনা অনুযায়ীই ছোটখাটো একটা কাউন্সিল করা যায় কি না তা বিবেচনা করা হবে। উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বরে পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিল হয় বিএনপির।

খালেদা জিয়াসহ বিএনপি নেতারা বেশকিছু দিন ধরেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপ করাসহ জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে আসছেন। বেগম জিয়া এখন দেশে। তিনি কী তার এই জাতীয় ঐক্য ও সংলাপের আহ্বান কেবল আহ্বানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবেন, না এ নিয়ে কোনো ফলপ্রসূ উদ্যোগ নেবেন তা এখন দেখার বিষয়। অবশ্য নেতা-কর্মীদের আশা, খালেদা জিয়া এ ব্যাপারে একটি বৃহত্তর উদ্যোগ নেবেন। সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বানের পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, কূটনীতিকসহ সব মহলের সঙ্গে আলাপ ও সংলাপের রূপরেখা প্রণয়নের জন্য তিনি টিম গঠন করতে পারেন। ইতিমধ্যে তেমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

দলের ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগের পর বিএনপির কূটনৈতিক উইংটি দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে নেতা-কর্মীরা মনে করেন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনিসহ দলের অপর দুই উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান ও সাবিহউদ্দিন আহমদ কূটনৈতিক উইংটি দেখভাল করে করতেন। কিন্তু গুলিবিদ্ধ হয়ে রিয়াজ রহমান ও চেয়ারপারসনের গুলশান অফিসে অবরুদ্ধ হয়ে সাবিহউদ্দিন আহমদ দলীয় কাজে অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। নানা চাপে শমসের মবিন চৌধুরী পদত্যাগ করার পর কূটনৈতিক উইংয়ের নেতৃত্ব দেওয়া দলের স্থায়ী কমিটির সমদ্য ড. আবদুল মঈন খানও নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছেন। খালেদা জিয়া এখন দলের কূটনৈতিক উইংটি জোরদার করতে পারেন বলে নেতা-কর্মীরা মনে করছেন।

এদিকে খালেদা জিয়া যেদিন ফিরে এসেছেন, সেদিন রাতেই দলের স্থায়ী কমিটির আলোচিত সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এই প্রথম দলের একজন সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের কোনো সদস্যের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ফাঁসি কার্যকর হলো। এর আগে দলের সাবেক মন্ত্রী ও এমপি আবদুল আলিমের আমৃত্যু কারাদ-ের রায় হয়েছিল। তিনি মারা গেছেন। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের সদস্য মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা গেছেন। অপর কয়েকজন সদস্য ড. আর এ গণি ও শামসুল ইসলাম বয়স হয়ে যাওয়ার কারণে কমিটির বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেন না। একই অবস্থা বেগম সারোয়ারি রহমানেরও। তিনিও নিয়মিতভাবে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অনুপস্থিত থাকছেন। এমতাবস্থায় তারা বাদ পড়বেন কি না, কিংবা বাদ পড়লে তাদের স্থলে কাদের নেবেন তা খালেদা জিয়াকেই ঠিক করতে হবে। গঠনতান্ত্রিকভাবে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের তিনিই মনোনয়ন দেন।

দেশে ফেরার পর খালেদা জিয়া কয়েকটি বিবৃতি দেওয়া এবং সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ দেওয়া ছাড়া তেমন কোনো রাজনৈতিক কর্মকা-ে অংশ নেননি। ২৪ নভেম্বর তিনি গুলশান কার্যালয়ে যান। শোনা যাচ্ছে, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সভা আহ্বান করা হবে। এরপরই খোলাসা হবে খালেদা জিয়া কী করতে যাচ্ছেন।ঢা.টা.

লেখক: সাংবাদিক
দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts