September 25, 2018

‘ক্র্যাকডাউন’হচ্ছে ফ্রান্সে মুসলিম নাগরিকদের ওপর !

ফ্রান্সে মুসলিম নাগরিকেরা যে বিক্ষুব্ধ হচ্ছে এবং তাদের বিক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ রয়েছে, এ সত্যটি এখন পাশ্চাত্যের মিডিয়ায়ই গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। এ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধিক প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ ৯ জানুয়ারি সংখ্যার প্রধান সম্পাদকীয়তে মুসলিমদের লক্ষ্য করে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত সংবিধানের কিছু সংশোধনী পাস না করার জন্য ফ্রান্সের পার্লামেন্টের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

কানাডার সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক সংবাদপত্র ‘টরন্টো স্টার’ ফ্রান্স কেন তার মুসলিম অধিবাসীদের দেখভাল করতে পারছে না (হোয়াই ফ্রান্স ইজ ফেইলিং ইট্স মুসলিম্স্) শিরোনাম দিয়ে এক বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে ফ্রান্সের ব্যর্থতাগুলো তুলে ধরেছে।

ফ্রান্সে মুসলিম অধিবাসীর গণনাকৃত সংখ্যা ৪০ লাখ। এই বিপুল সংখ্যার অধিবাসী বহু বছর ধরে নিজেদের ফ্রান্সের প্রধান জনসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে আসছে। প্রতিবেদনের প্রারম্ভেই বলা হয়েছে, এর ফলে মুসলিম অধিবাসীদের মনে যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে উঠছে, তার প্রমাণ হলো প্রতি বছর ফ্রান্সের নগরগুলোর শহরতলি অঞ্চলে, যেখানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের মুসলিম অধিবাসীরা বাস করে, ৩০-৪০ হাজার মোটরগাড়ি পোড়ানো হয়। এক দশকের অধিক সময় ধরে প্রতি বছর গাড়ি পোড়ানোর এই সংখ্যা অপরিবর্তিত হয়ে আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়াতে অ্যানথ্রোপলজির অধ্যাপক প্রফেসর মায়ান্তি ফার্নান্ডো বলেন, ‘এই গাড়ি পোড়ানোটা হচ্ছে এক দিকে তাদের (মুসলিমদের) ক্ষোভ প্রকাশ, অন্য দিকে তাদের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণের প্রয়াস।’ তিনি বলেন, ‘এটা একটা পন্থা যা দিয়ে শহরতলি এলাকাগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। … যদি (এটা না করে) তারা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ মিছিল করত, মিডিয়ার কেউ আসত না তাদের সংবাদ সংগ্রহ

‘অনেক দশক ধরে ফ্রান্সে মুসলিম অভিবাসীরা আসছে অব্যাহতভাবে। আগত অভিবাসীরা কায়ক্লেশে তাদের জীবন-জীবিকা চালিয়ে যায় বটে, কিন্তু তাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের সন্তানেরা শিক্ষাদীক্ষায় অনগ্রসরতা এবং উচ্চ হারে বেকারত্বের কারণে ফরাসি মূল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে।

ফার্নান্ডো বলেন, ফ্রান্সে মুসলিম নাগরিকদের নিয়ত প্রশ্ন করা হয়, ‘তোমরা ফরাসি সমাজের সাথে মিশে যেতে পারনি কেন?’ তিনি বলেন, ‘এভাবে প্রশ্ন করা হলে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণকারী মুসলিমদের ওপরই দায়িত্ব বর্তায় ব্যাখ্যা করার যে, কেন তারা ফ্রান্সের মূল সমাজে মিশে যেতে পারেনি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা ফরাসি সরকার ও ফরাসি সমাজের দেখা দায়িত্ব যে, মুসলিমরা নাগরিকরূপে তাদের ন্যায্য সব অধিকার ভোগ করতে পারছে কি না।’
ফ্রান্সে মুসলিম অভিবাসীরা আসে মুসলিমপ্রধান দেশগুলো থেকে, যার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে আলজেরিয়া ও মরক্কো। অধ্যাপক ফার্নান্ডো বলেন, কিন্তু ফ্রান্সে আগমনের পর বিভিন্ন দেশ থেকে আগত এসব অভিবাসীকে একটি শব্দ ‘মুসলিম’-এর মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলা হয়। তিনি বলেন, মালি থেকে আগত মুসলিম এবং মরক্কো থেকে আগত মুসলিমের থেকে জীবনযাপনের মধ্যে বিরাট পার্থক্য থাকতে পারে। এমনকি এদের অনেকে নিজেকে মুসলিম না বলে তাদের জাতিতাত্ত্বিক পরিচয় ‘বারবার’ অথবা ‘তুয়ারেগ’ বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করে। এদের বহুজাতিক পরিচয় বাদ দিয়ে সবাইকেই এক শব্দ ‘মুসলিম’ বলে পরিগণিত করায় সমস্যাটি অনেক জটিল হয়ে যায়।

সমালোচকেরা বলেন, মূল সমাজের সাথে মিশে যাওয়ার অর্থ ফরাসি দৃষ্টিতে- সবার সংখ্যাগরিষ্ঠ ফরাসিদের মতো একই ধরনের পোশাক পরতে হবে, একই ভাষায় কথা বলতে হবে এবং একই ধরনের চিন্তাভাবনা প্রকাশ করতে হবে। সবাইকেই ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রী হতে হবে এবং দূরদেশের কোনো সংস্কৃতি ও ধর্ম কেউ প্রদর্শন করবে না।

এ রকম একটি দাবি বহু মুসলিম অভিবাসী পরিবারকে (এবং তাদের সন্তান-সন্ততিদের) একটি ‘চরম’কে বেছে নেয়ার পরিস্থিতিতে নিক্ষেপ করে : হয় তোমাদের পরিচয় ও সত্তা মুছে ফেলে এ সমাজে মিশে যাও, নতুবা এ দেশ ছেড়ে চলে যাও।

অভিবাসী মুসলিম পিতামাতারা তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আচার-আচরণকে যথাসম্ভব তাদের গৃহের মধ্যে আবদ্ধ করে বাইরে ফরাসি সমাজের সাথে মিলে চলতে থাকেন। কিন্তু তাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম মনে করে, কেন তাদের ‘মুসলিম’ পরিচয় লুকিয়ে রাখতে হবে? ফ্রান্সে জন্মগ্রহন করা এই প্রজন্ম তাদের এ পরিচয় তুলে ধরতে চায়। তাদের এই চাওয়া ফরাসিদের চোখে তাদের আরো প্রকট করে তোলে। ফলে তারা মূল ফরাসি সমাজ থেকে আধিকতর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ইতোমধ্যে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদে ফ্রান্সের মুসলিম নাগরিকদের বিরুদ্ধে যে অঘোষিত যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন, নিউ ইয়র্ক টাইমস তাতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ৯ জানুয়ারি সংখ্যার শীর্ষ সম্পাদকীয়তে পত্রিকাটি এ সম্পর্কে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ওঁলাদের আনীত এ সম্পর্কিত সংবিধান সংশোধনীগুলো বাতিল করে দেয়ার জন্য ফ্রান্সের পার্লামেন্টের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

ওঁলাদে ফ্রান্সের নাগরিকত্ব আইনে যে সংশোধনীর প্রস্তাব দিয়েছেন, তা করেছেন ফ্রান্সের জন্মসূত্রে মুসলিম নাগরিকদের বিরুদ্ধে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করা কোনো মুসলিম যদি সন্ত্রাস সম্পর্কিত কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়, সরকার তার নাগরিকত্ব বাতিল করতে পারবে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস সম্পাদকীয়তে বলেছে, ‘বাস্তবিক ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করা মুসলিম নাগরিকদের লক্ষ্য করেই এই সংশোধনী চাওয়া হয়েছে। গত মাসে ফ্রান্সের মন্ত্রিপরিষদ সংবিধানের এ প্রস্তাবিত সংশোধনীটি গ্রহণ করেছে বিতর্কের জন্য। ফেব্র“য়ারিতে পার্লামেন্টে এটিসহ আরো কিছু সংশোধনী পর্যালোচনা ও পাস করার জন্য উত্থাপন করা হবে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস আরো লিখেছে, ‘ওইসব অপ্রয়োজনীয় এবং বিভক্তি সৃষ্টিকারী সংশোধনী পার্লামেন্টের উচিত বাতিল করে দেয়া। নাগরিক অধিকার সঙ্কুচিত করা এবং বিচার বিভাগের নজরদারি কমিয়ে ফেলার এই প্রয়াস ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্ভাবনাকে বহুগুণ বৃদ্ধি করবে; কিন্তু কোনোভাবেই জনগণের নিরাপত্তাকে বাড়াতে পারবে না।’

Related posts