September 23, 2018

ক্রিকেটে নতুন শিকারীর আবির্ভাব!

লাজুক ছেলেটির বাড়ি সুন্দরবনের কোলঘেঁষা সাতক্ষীরার তেঁতুলিয়া গ্রামে। পূর্বপুরুষের কেউ সুন্দরবনের চতুর শিকারী ছিলেন কিনা, কে জানে! তবে বাংলাদেশ ক্রিকেটে সত্যিকারের ‘শের’ হয়ে একের পর প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের আউট করে জানিয়ে দিয়েছেন শিকারে একেবারে সিদ্ধহস্ত তিনি।

যেন এলেন, দেখলেন আর জয় করলেন। সবটাই স্বপ্নের মতো। ক্রিকেট বিশ্বে তো বটেই, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই তাকে চিনতেন না, জানতেন না। সেই কোথাকার মুস্তাফিজ এখন বাংলাদেশের ক্রিকেটের সেনসেশন! এক বিস্ময়ের নাম! তার বোলিংয়ের ভাষা এখনও কারও জানা হয়নি। জানলেই কী? তার আছে এমন সব অস্ত্র যা দিয়ে অকেজো করে দিতে পারেন ব্যাটসম্যানদের যাবতীয় কৌশল। চলতি বছরে জাতীয় দলের জার্সিতে ১৬টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। তারপরও তার বোলিংয়ের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ প্রতিপক্ষ দলগুলোর ব্যাটসম্যানরা।

সাতক্ষীরার তেঁতুলিয়া গ্রামের তারুণ্যদীপ্ত পেস বোলার মুস্তাফিজে নাকানি-চুবানি খেয়েছে পাকিস্তানের পর ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো নামজাদা সব ক্রিকেট খেলুড়ে দেশ। সর্বশেষ জিম্বাবুয়েকে বিপদে পড়তে হয়েছে কাটার মুস্তাফিজের ডেলিভারিতে।

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলে পেসার সঙ্কটের ক্রান্তিকালে মুস্তাফিজুর রহমান যেন ধ্রুবতারা হিসেবে আর্বিভূত হয়েছেন। চলতি বছর বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার তাই মুস্তাফিজুর রহমান।

গত এপ্রিলে পাকিস্তানের বিপক্ষে মুস্তাফিজের অভিষেকের পর থেকেই অধিনায়ক মাশরাফি নিয়মিত প্রশংসায় বন্যায় ভাসিয়েছেন তরুণ এই পেসারকে। তার মতে, ‘ওর বলে প্রচুর বৈচিত্র্য। সব মিলিয়ে ওর যে কয়টা ডেলিভারি আছে, তা খেলা যে কোনও ব্যাটসম্যানের জন্যই অনেক কঠিন। বিশেষ করে ক্রিজে নেমেই মুস্তাফিজের বল খেলা প্রায় অসম্ভব।’

বিশ্ব মিডিয়াও প্রশংসার ভাসিয়েছেন তরুণ এই সেনসেশনকে। বেশকিছু দিন আগে আইসিসির বর্ষসেরা উদীয়মান ক্রিকেটার হয়েছেন জশ হ্যাজলউড। ওই পুরস্কারটি মুস্তাফিজ না পেলেও ঠিকই আইসিসির ওয়ানডে দলে জায়গা করে নিয়েছেন।

২৪ এপ্রিল পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় মুস্তাফিজের। সেখানে ২ উইকেট নিয়ে তার আগমনী বার্তা জানান দিয়েছিলেন বিশ্ব ক্রিকেটকে। ভারতের বিপক্ষে অভিষেক ওয়ানডেতে ৫ উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরার পুরস্কার জোটে তার। পরের ম্যাচে ৬ উইকেট নিয়ে আবারও ম্যাচসেরা। সঙ্গে হয়ে গেলেন ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ওয়ানডেতে ১১ উইকেট নেওয়া প্রথম বোলারও। মুস্তাফিজের আগে প্রথম দুই ওয়ানডেতে ১০ উইকেট ছিল ব্রায়ান ভিটরির।

জুলাইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্টেও অভিষেকটা হয়েছে বলার মতো। ওই ম্যাচে রেকর্ড বইয়ে নতুন করে নাম লেখান মুস্তাফিজ। টেস্ট ইতিহাসে চার বলে তিন উইকেট নেওয়ার ঘটনা আছে মোট ৩৭টি। সে তালিকায় যোগ হয়েছেন মুস্তাফিজও। ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্টেও ম্যাচ সেরার পুরস্কার পান কাটারখ্যাত মুস্তাফিজ। ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে ওয়ানডে ও টেস্ট ২ ধরনের ক্রিকেটে অভিষেকেই ম্যাচ সেরা হওয়ার প্রথম কীর্তি গড়েছেন তিনি।

২০১৫ সালে ৩ ফরম্যাটের ক্রিকেটে ১৬ ম্যাচ খেলে উইকেট পেয়েছেন ৩৬টি। আগামী বছরের শুরুতেই ঘরের মাঠে এশিয়া কাপ। এশিয়া কাপ শেষ হতে না হতেই ভারতের মাঠিতে বিশ্বকাপ খেলতে যাবে বাংলাদেশ। তার আগে অবশ্য ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ। সব ফরম্যাটের ক্রিকেটে অটোমেটিক চয়েজ হয়ে আছেন মুস্তাফিজ। তাইতো বছরের শুরুতেই এই টুর্নামেন্টগুলোতে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মিশন নিয়ে মাঠে নামবেন; এমনটাই প্রত্যাশা মুস্তাফিজ ভক্তদের।

মুস্তাফিজকে ঘিরে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের উল্লাস

মুস্তাফিজের যত রেকর্ড:

* ওয়ানডেতে কমপক্ষে ১০ উইকেট নিয়েছেন, এমন বোলারদের বোলিং গড়ে সবার ওপরে মুস্তাফিজ।

* দুই ফরম্যাটের ক্রিকেটের অভিষেক ম্যাচেই ম্যাচ সেরার পুরস্কার পেয়ে গড়েছেন বিশ্বরেকর্ড।

* দ্বিপক্ষীয় সিরিজে সবচেয়ে বেশি উইকেটের নতুন বিশ্ব রেকর্ড এখন মুস্তাফিজের। আগের কৃতিত্বটা ছিল মাশরাফি ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভাসবার্ট ড্রেকসের। তারা নিয়েছিলেন ১২ উইকেট। আর মুস্তাফিজ নিয়েছেন ১৩টি উইকেট।

*অভিষেক সিরিজে সবচেয়ে বেশি উইকেট নেওয়ার বিশ্ব রেকর্ডটাতেও মুস্তাফিজের। দক্ষিণ আফ্রিকার শন পোলক আর নিউজিল্যান্ডের টিম সাউদিও অভিষেক সিরিজে ১৩ উইকেট নিয়েছিলেন। তবে ওই সিরিজে পোলক খেলেছিলেন ৭ ম্যাচ। আর সাউদি খেলেছিলেন ৫ ম্যাচ। মুস্তাফিজ ১৩ উইকেট নিয়েছেন মাত্র ৩ ম্যাচেই।

* ব্রায়ান ভিটোরির পর ওয়ানডে ইতিহাসের দ্বিতীয় বোলার হিসেবে ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ম্যাচেই ইনিংসে ৫ উইকেট।

* প্রথম দুই ম্যাচে ১১ উইকেট। ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ওয়ানডেতে এটাই সর্বোচ্চ, ভিটোরির ছিল ১০ উইকেট।

* অভিষেকে ম্যাচেই বাংলাদেশের পক্ষে দ্বিতীয় সেরা বোলিং।

* মাশরাফি-রুবেলের পর তৃতীয় বাংলাদেশি হিসেবে ইনিংসে ৬ উইকেট।

* প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে আইসিসি ওয়ানডে দলে সুযোগ।

* এত কম ম্যাচে ৩ বার পাঁচ উইকেট পাননি ওয়ানডে ইতিহাসে আর কোনও বোলার।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts