September 21, 2018

‘ক্রসফায়ার’ দিয়ে র‌্যাব-পুলিশের প্রতিরোধ?

ঢাকাঃ  বন্দুকযুদ্ধদেশের বিভিন্ন এলাকায় একই কায়দায় একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটা বেড়ে যাওয়ার পর হঠাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘ক্রসফায়ারে’ নিহতের সংখ্যাও বেড়েছে। গত তিনদিনে র‌্যাব-পুলিশের সঙ্গে ‘ক্রসফায়ারে’ ছয়জন নিহত হয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা দাবি করেছেন, ‘আপাতত মনে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ক্রসফায়ার দিয়ে একটি প্রতিরোধ তৈরি করার চেষ্টা করছে। সাধারণ মানুষের জীবনরক্ষার্থে কিছু সন্ত্রাসীদের প্রাণহানি হয়তো হচ্ছে। তবে সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধে এটি একমাত্র উপায় হতে পারে না।’

গত বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে একই কায়দায় ৪৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে৷ এতে মোট ৪৮ জন নিহত হন৷ গত আড়াই মাসে হত্যা করা হলো ১১ জনকে৷

প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এর সঙ্গে দেশীয় জঙ্গি সংগঠন দায়ী। কেউ বলেছেন দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে।

সর্বশেষ চট্টগ্রামের জিইসি মোড়সংলগ্ন মিষ্টির দোকান ওয়েল ফুডের সামনে এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতুকে প্রথমে ছুরি মেরে, পরে মাথায় গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে চলে যান দুর্বৃত্তরা। এরপরই নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হত্যাকারীদের গ্রেফতারে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগ ও বিশেষ পদ্ধতি গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে পুলিশ। গত তিন দিনে র‌্যাব-পুলিশের সঙ্গে ক্রসফায়ারে ৬ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।

গত মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর মিরপুরের কালশীতে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুজন নিহত হয়েছেন। নিহত দুজন হলেন তারেক হোসেন মিলু ওরফে ইলিয়াস ওরফে ওসমান ও সুলতান মাহমুদ ওরফে রানা ওরফে কামাল। তারেকের বাড়ি জয়পুরহাটে এবং সুলতানের বাড়ি দিনাজপুরে। পুলিশের দাবি, নিহত দুজনই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্য এবং তাদের একজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর অন্যতম ‘খুনি’।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম গত রোববার সকালে দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হওয়ার ৪৮ ঘণ্টারও কম সময় পর এই ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ঘটে।

এই ক্রসফায়ারের বিষয়ে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘‘দুই পক্ষের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তারেক ও সুলতান গুরুতর আহত হন, অন্যরা পালিয়ে যান।’’

মঙ্গলবার ভোর রাতে রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জে জামালউদ্দিন নামে জেএমবি’র আরেকজন সদস্য পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়৷ পুলিশের দাবি, জামাল উদ্দিন গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর রাজশাহীর বাগমারার একটি মসজিদে বোমা হামলার সঙ্গে জড়িত৷

বুধবার ভোরাতে বগুড়ায় ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে জেএমবি’র আরেক সদস্য মো. কায়সার৷ সে-ও বগুড়ার শিবগঞ্জে গত বছরের ২৬ নভেম্বর শিয়া মসজিদে হামলার সঙ্গে জড়িত বলে পুলিশ জানায়৷

এদিকে, বুধবারও রাজধানীর রামপুরা ও তুরাগে র‌্যারে সঙ্গে পৃথক ‘বন্দুকযুদ্ধ’ দু’জন নিহত হন। র‌্যাবের দাবি নিহতরা সবাই ছিনতাইকারী। নিহতরা হলেন, কামাল পারভেজ ও অজ্ঞাত এক যুবক।

এদিকে, একই দিনে, গোবিন্দগঞ্জ থানার পুলিশ জানায়, উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের মালঞ্চা গ্রামে পুলিশের সঙ্গে সন্দেহভাজন জেএমবির সদস্যদের ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হয়। এতে একজন নিহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তির নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেনি পুলিশ।

তাই নতুন নতুন করে আবারো আলোচনায় এসেছে ক্রসফায়ার। চলতি মাসে সারা দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১৯ জন।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ বলেন, ‘গুপ্তহত্যা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তা ঠিক আছে। তবে কিছু ক্রসফায়ারের ঘটনাও ঘটেছে। তবে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষার্থে গুপ্তহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একমাত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্রসফায়ার হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি না।’ তিনি বলেন, ‘জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধে চলমান যে কার্যক্রম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরি ছিল, তা হয়তো বর্তমানে কার্যকর হচ্ছে না। তাই এই ব্যবস্তা নিতে পুলিশ বাধ্য হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবসময় তিনটি উপায়ে এই সন্ত্রাস প্রতিরোধ করতে পারে। প্রথমত প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা, দ্বিতীয়ত আক্রমণাত্মক ব্যবস্থা, তৃতীয়ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আক্রমণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। নাগরিকদের বাঁচানোর জন্য এটা করতে হচ্ছে হয়তো। এই ব্যবস্থায় সন্ত্রাসীদের শিকার করতে হবে। না হলে হয়তো নিরীহ মানুষকে খুন করা বন্ধ হবে না। হয়তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাই করছে। তবে এটা একমাত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা হতে পারে না।’

আব্দুর রশীদ বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক গ্রুপের পৃষ্টপোষকতায় দেশব্যাপী এই হত্যাকাণ্ড ঘটছে। তারা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য এই হত্যাকণ্ড ঘটাচ্ছে বলে আমরা ধারণা।’

ক্রসফায়ারের বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া ও প্ল্যানিং বিভাগের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) একেএম শহিদুর রহমান বলেন, ‘এনকাউন্টার ইজ এনকাউন্টারের কোনও সংজ্ঞা নেই। আজকের সভায় এনিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি। নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা আগে ভাবছি।’

অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘ভবিষ্যতে এ সমস্যা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে সরে আসবে বলে আশা বিশ্লেষকদের।’

পুলিশ সদর দফতরে মহা-পরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হকের নেতৃত্বে একটি বিশেষ সভায় ইতোমধ্যে সারাদেশে সাঁড়াশি অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী সাতদিন দেশজুড়ে এই অভিযান চলবে।বা.ট্রি.

Related posts