November 19, 2018

কোয়েল পালন হতে পারে আয়ের উৎস

কোয়েল

এদেশের আবহাওয়া বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কোয়েল পালনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী৷ তাছাড়া অর্থনৈতিকভাবেও কোয়েল পালন অত্যন্ত লাভজনক। কোয়েল পালনের খরচ ও ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় অনেকেই কোয়েল পালনকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করছেন। স্বল্প বিনিয়োগে, অল্প সময়ে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিতে পারে কোয়েল পাখি পালন। ব্যাপকহারে পালনের মাধ্যমে দেশের চাহিদা পূরণ করে কোয়েলের মাংশ ও ডিম রফতানির বড় ধরনের সুযোগ রয়েছে। তাই, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিকভাবে কোয়েল পালন করা গেলে বেকারত্ব হ্রাস এবং মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশে আর্থিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে পারে বহুগুণ।

কোয়েলের মাংস ও ডিম খুবই সুস্বাদু এবং পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। কোয়েলের মাংস ও ডিমে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ আমিষ, প্রোটিন ও স্নেজাতীয় পদার্থ। যা মানব দেহের সুস্থতার জন্য অন্যতম সহায়ক শক্তি। কোয়েলের ডিম আকারে ছোট হলেও একটি মুরগির ডিমের সমান প্রোটিন রয়েছে। আকারে ছোট হওয়ায় মুরগির ডিমের তুলনায় এর দাম অনেক কম। এই পাখি পালনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুবিধার দিক হচ্ছে আকৃতিতে ছোট বলে জায়গা কম লাগে। এমন কি খাঁচায় করে পালন করা যায়। একটি মুরগির জন্য যেটুকু স্থান প্রয়োজন হয় সেই স্থানে ছয় থেকে সাতটি কোয়েল পাখি পালন করা যায়। খুব দ্রুত বেড়ে উঠে এরা। ২৫ থেকে ২৬ দিন বয়সের কোয়েল খাওয়ার উপযোগী হয়। এদের ওজন হয় ১২৫ গ্রাম থেকে ২০০ গ্রাম পর্যন্ত। ছয় থেকে আট সপ্তাহ বয়সে ডিম পাড়া শুরু করে।

কোয়েলের শ্রেণীবিভাগ
কোয়েল তিন ধরনের হয়ে থাকে। লেয়ার কোয়েল, ব্রয়লার কোয়েল এবং ব্রিডার কোয়েল।
লেয়ার কোয়েল : লেয়ার কোয়েল সাধারণত খামারে ডিম উৎপাদনের জন্য পালন করা হয়। মোটামুটিভাবে ৬-৭ সপ্তাহ বয়স থেকে জাপানি কোয়েল ডিমপাড়া শুরু করে। ব্যবস্থাপনা সঠিক হলে প্রতিটি জাপানি কোয়েল বছরে ২৫০-৩০০টি এবং ববহোয়াইট কোয়েল ১৫০-২০০টি ডিম দেয়।
ব্রয়লার কোয়েল : নরম ও সুস্বাদু মাংস উৎপাদনের জন্য কোয়েলগুলোকে ব্রয়লার কোয়েল বলা যায়। মাংস উৎপাদনের জন্য জন্মের দিন থেকে পাঁচ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত এবং ববহোয়াইট কোয়েলকে ৮ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত পালন করা হয়। এ সময়ের মধ্যে জীবিতাবস্থায় একেকটি পাখির ওজন হয় ১৪০-১৫০ গ্রাম এবং খাওয়ার উপযোগী মাংস পাওয়া যায়।
ব্রিডার কোয়েল : লেয়ার, ব্রয়লার ও শোভাবর্ধনকারী কোয়েলের বাচ্চা ফোটানোর লক্ষ্যে ডিম উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত বাছাই করা প্রজননক্ষম কোয়েলকে ব্রিডার কোয়েল বলা হয়। সাধারণত ৭ থেকে ৮ সপ্তাহ বয়সের জাপানি কোয়েল ও ১০ সপ্তাহ বয়সের কোয়েল ব্রিডিং খামারে এনে পালন করা হয়। কোয়েলগুলোকে ব্রিডিং খামারে ৩০ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত রাখা হয়। ববহোয়াইট কোয়েল ৮ থেকে ১০ সপ্তাহ বয়সে প্রজননক্ষম হয়। প্রজননের জন্য কোয়েলের অনুপাত ১.১ অর্থাৎ এদের জোড়ায় জোড়ায় পালন করতে হয়।

কোয়েলের আদি জন্মস্থান জাপানে। সর্বপ্রথম জাপানি বিজ্ঞানীরা কোয়েলকে গৃহপালিত পাখি হিসেবে পোষ মানানোর উপায় উদ্ভাবন করেন। পরবর্তীতে জাপানসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে কোয়েলকে একটি লাভজনক পোলট্রি উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোয়েল পালন করার জন্য অতিরিক্ত কোন খরচ হয় না। কোয়েলকে সহজেই পোষ মানানো যায়। বাড়ির যেকোন কোণ বা আঙিনা অথবা বাড়ির ছাদ ইত্যাদি জায়গাতেও কোয়েল পালন করা যায়। এই কারণে, শহরে কী গ্রামে অনেক স্থানেই কোয়েল পালন ব্যাপক ও সহজতর হয়েছে। গৃহপালিত পাখির মধ্যে অতিক্ষুদ্র এই পাখির আয়তন খুব বেশি নয়। একটি মুরগি পালনের জন্য যতটুকু স্থান ব্যবহৃত হয় সেই একই স্থানে ১০-১২টি কোয়েল পালন করা যায়।

মাংসে চর্বির পরিমাণ খুব কম বিধায় রোগীর পথ্য হিসেবে কোয়েলের মাংস উপদেয় খাদ্য হতে পারে। পর্যাপ্ত পুষ্টির চাহিদাও মটাতে পারে কোয়েলের ডিম। বর্তমানে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, যশোর, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, বগুড়া,গাইবান্ধা, ঠাকুরগাও সহ দেশের অনেক জেলাতেই কোয়েল ফার্ম বা কোয়েল পালনের প্রকল্প গড়ে উঠেছে। মুরগি পালনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অনেকেই কোয়েল পালন করে লাভবান হচ্ছেন।

কোয়েল পালন প্রক্রিয়া
অন্য সব গৃহপালিত পশু পাখির মতো তাদের বাসস্থান যাতে পর্যাপ্ত আলো বাতাসের মধ্যে থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখা বিশেষ প্রয়োজন। লিটার বা খাঁচায় কোয়েল পালন করা সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। একটি খাঁচার ওপর আরেকটি খাঁচা এভাবে মোটামুটিভাবে অল্প জায়গাতে অনেকগুলো খাঁচা স্থাপন করে কোয়েল পালন করা যায়। মোটামুটিভাবে ১৩০ থেকে ১৫০ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য, ৬০ থেকে ১০০ সিন্টিমিটার প্রস্থ এবং ২৫ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার উচ্চতা বিশিষ্ট একটি খাঁচায় কমপক্ষে ৬০ থেকে ১০০টি কোয়েল পালন করা যায়। তবে কোয়েলের খাঁচায় ব্যবহৃত জালের ফাঁকগুলো একটু ঘন হতে হবে। যাতে করে পাখির মুখ বা গলা সেই ফাঁক দিয়ে বাইরে বেরিয়ে না আসে। বাচ্চা রাখার খাঁচাসহ পরিণত বয়সের কোয়েলের খাঁচাগুলোতে যেন ইঁদুর ইত্যাদি না ঢুকতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখে খাঁচার ফাঁক তৈরি করতে হবে।

কোয়েলের জন্য খাবার এবং পানির সুব্যবস্থা তার খাঁচাতেই রাখতে হবে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, পানি খাবার বা রাখার পাত্র উল্টে যেন তারা ভিজে না যায়। বিশেষ করে কোয়েলের বাচ্চা পালনের সময় একটি অতিরিক্ত যত্ন নেয়া প্রয়োজন। বাচ্চার বয়স ২১ দিন পর্যন্ত কৃত্রিম উত্তাপের মাধ্যমে এই ব্রডিং এর ব্যবস্থা করতে হয়। খামারে পাখির মল-মূত্রের কারণে যেন কোন দুর্গন্ধ না হয়, সেজন্য আগে থেকেই সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। রোগ-জীবাণুমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা প্রভৃতি।

কোয়েলের খাদ্য
কোয়েলকে শুষ্ক গুঁড়া বা ম্যাশ ফিড প্রদান করতে হবে। চার সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতিটি কোয়েল দিনে চার গ্রাম করে খাদ্য খায়। পঞ্চম সপ্তাহ বয়স থেকে দৈনিক প্রতিটি কোয়েল ২০ থেকে ২৫ গ্রাম খাদ্য খায়। একটি কোয়েলের বছরে খাদ্য লাগে আট কেজি। কোয়েল পাখির খাদ্য তালিকায় রয়েছে গম ভাঙা, ভুট্টা, চালের কুঁড়া, শুকনো মাছের গুঁড়া, তিলের খৈল, সয়াবিনের খৈল, ঝিনুকের গুঁড়া ও লবণ। চার সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত বৃদ্ধির জন্য প্রোটিনযুক্ত খাবার দিতে হয়। তবে প্রতি ১০০ কেজি খাদ্যে ২০০ মিলিমিটার প্রোপিয়নিক এসিড মেশানো হলে খাদ্য আর সংক্রমিত হয় না।

কোয়েলের রোগব্যাধি
কোয়েল পালনের অন্যতম সুবিধা হলো এরা মুরগি বা অন্য পাখির তুলনায় রোগব্যাধিতে কম আক্রান্ত হয়। কোয়েলের রোগব্যাধি কম বলে এগুলোকে টিকা দিতে হয় না এবং কৃমির ঔষধও খাওয়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। তবে, এদের যত্নের অবহেলা হলে মুরগির মতো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, রক্ত আমাশয়, মাইকোপাজমাসহ প্রভৃতি রোগে আক্রান্ত করতে পারে। সে কারণে সর্বদা ওদের ওপর দৃষ্টি রাখা এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন।

কোয়েল পালনে প্রশিক্ষণ
বাণিজ্যিকভাবে কোয়েল পাখি পালন করতে হলে এ বিষয়ে অভিজ্ঞদের কাছ থেকে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নেয়া যেতে পারে। এ ছাড়া এরই মধ্যে যারা সফলতা পেয়েছে তাদের কাছে থেকে কোয়েল পালনের বিস্তারিত তথ্য জেনে নেয়া যায়। তাছাড়া পাখি পালন-সংক্রান্ত কোন তথ্য জানতে হলে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে পশু কর্মকর্তা অথবা প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্ধারিত ফি’র বিনিময়ে পশু পালনবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেয়।

প্রয়োজনীয় মূলধন
কোয়েল পাখি পালন শুরু করার জন্য ৯০০ টাকার প্রয়োজন হবে। প্রয়োজন হলে নিকট আত্মীয়স্বজন, সরকারি ও বেসরকারি ঋণদানকারী ব্যাংক (সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক) বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (আশা, গ্রামীণ ব্যাংক, ব্রাক, প্রশিকা) এর সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে। এসব সরকারি ও বেসরকারি ঋণদানকারী ব্যাংক বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (এনজিও) শর্তসাপেক্ষে ঋণ দিয়ে থাকে। খামার স্থাপন ও পরিচালনার খরচ মূলত তিন প্রকার।
১. স্থায়ী খরচ
২. অস্থায়ী খরচ এবং
৩. আবর্তন বা চলমান খরচ৷

এক বর্গফুট (৯০০ বর্গ সে.মি.) জায়গায় ৬-৮টি (গড়ে ৭টি) বড় কোয়েল পালন করা যায়৷ তাই ৫০০টি লেয়ার কোয়েলের জন্য মোট জায়গায় প্রয়োজন হবে প্রায় (৫০০÷৭)=৭১.৪ বর্গফুট। লেয়ার যেহেতু প্রায় ৬০ সপ্তাহ পালন করা হয় তাই কিছু জায়গা বাড়িয়ে ৭৫ বর্গফুট করলে ভালো হয়। বাঁশ, কাঠ, টিন প্রভৃতি ব্যবহার করে প্রতি বর্গফুট ঘরের নির্মাণ খরচ ৫০ টাকা হিসাবে ধরা হলো। এতে ঘর তৈরি বাবদ খরচ হবে ৭৫.৫০=৩৭৫০ টাকা৷
এখানে ডিপ লিটারে পালনের হিসাব ধরা হয়েছে৷ তবে ব্যাটারি বা সংবলিত পদ্ধতিতে পালন করলে ঘর ছাড়াও প্রয়োজনীয় খাঁচার ব্যবস্থা করতে হবে৷ তাই কাঁচামালের দামের ওপর নির্ভর করে খাঁচা তৈরির জন্য বাড়তি খরচ যুক্ত হবে৷

Related posts