September 21, 2018

কোন প্রতিশ্রুতি নয়, সমাধান চায় ডিএনডি বাসী<<বাঁধের ফাঁদে লাখ মানুষ

রফিকুল ইসলাম রফিক
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে চলাচলের সড়ক, বসতবাড়ীসহ থাকার ঘরের অনেক জায়গায় পানি উঠেছে। তাই আকাশে মেঘ দেখলে ভয়ে আতঁকে ওঠে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধ এলাকায় লাখ লাখ মানুষ।

এদিকে যত্রতত্র ভরাট, অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনা ও ভবন-বাড়ি-ঘর নির্মাণ এ জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ডিএনডির নিচু এলাকাগুলোতে এরই মধ্যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে এবং পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কোনো উদ্যোগ এখনো শুরু করেনি কেউ। গত তিনটি নির্বাচিত সরকারের আমলে ডিএনডিবাসীকে নিয়ে বড় দুই দলের জনপ্রতিনিধিরা শুধু রাজনীতিই করেছেন, কাজের কাজ কিছুই হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই।

অপর দিকে গত বছর পরিকল্পনা মন্ত্রী ডিএনডি পরির্দশন শেষে সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়ে যান। কিন্তু তার আশ্বাসের এক বছর পার হলেও কোন প্রতিফল দেখেনি ভুক্তভোগীরা।

১৯৬৫ সালে তৎকালীন সরকার কৃষি খাতকে আধুনিকীকরণ এবং উন্নয়নের এ বাঁধ সৃষ্টির কাজ শুরু করে। কৃষিপ্রধান এবং নদীমাতৃক বাঁধ সৃষ্টি করে কৃষিপণ্য উৎপাদনের এ পরিকল্পনায় তখন এলাকার মানুষ বিস্মিত হয়েছিল। সূত্র জানায়, ডিএনডির মোট এলাকা ১৯৬৫ সালে ছিল আট হাজার ৩৪০ হেক্টর এবং সেচ প্রকল্প ছিল পাঁচ হাজার ৬৪ হেক্টর। প্রকল্পের ভেতর তখন সবচেয়ে বড় কংস নদ নামে একটি প্রশস্ত খাল ছিল। বাধের ভেতর কংস নদ এবং মলখালী খালের মতো সাতটি খাল ছিল। ডিএনডির ইরিগেশন প্রজেক্ট সেগুলোকে সেচখাল হিসেবে ব্যবহার করত। এসব খালের ছিল আরো ৯টি শাখা খাল।

১৯৬৫ সালে শুরু হয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ১৯৬৮ সালের শেষে। জানা যায়, প্রকল্পের কাজ শেষ করে সরকার উন্নত জাতের ইরি ধানের বীজ চাষিদের মধ্যে স্বল্পমূল্যে বিতরণ করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও আশির দশক পর্যন্ত এ বাঁধের ভেতর ধানক্ষেত দেখা গেছে। এর পর থেকে লোকজন ডিএনডি বাঁধের ভেতর জমি কিনে অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণ শুরু করে।

নির্মাণ করে ইটের ভাটা, ছোট-বড় শিল্প-কারখানা। মহানগরীর কোটি মানুষকে দুর্ভোগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে বর্ষা এসেছে।

ডিএনডি বাঁধের ভেতরের প্রায় ১৬ লাখ মানুষ জলাবদ্ধতার আতঙ্ক নিয়ে বসবাস করছে প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। জলাবদ্ধতার কারণে হাজারো পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। হয়ে পড়ে কর্মহীন। ১৯৯২ সালে জাপানের সংস্থা জাইকা সমীক্ষা চালিয়ে ডিএনডিতে জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে বর্তমান পাম্প হাউসের মতো পাঁচটি নতুন পাম্প হাউস স্থাপন ছাড়াও একাধিক প্রস্তাব রাখে। ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে কর্তৃপক্ষ এ প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করতে নামলেও পাঁচটি পাম্প অদ্যাবধি নির্মাণ করা হয়নি।

সম্প্রতি পানি উন্নয়ন বোর্ড জলাবদ্ধতা কমাতে মূল খাল ও শাখা খাল পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেয়। ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৭৭৯ টাকা ব্যয়ে মেসার্স ইসলাম অ্যান্ড কোং নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা এলাকায় মূল খাল পরিষ্কার করার কাজ পায়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি শুধু ময়লা বা কচুরিপানা পরিষ্কার করে। তাও আবার খালের পাশেই স্তুপ করে রাখে। এতে বৃষ্টিতে কয়েক দিনের মধ্যে ওই কচুরিপানাসহ ময়লা-আবর্জনা ও মাটি আবার ডিএনডির মূল খালে পড়ে যায় বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী। ফলে ওই পরিচ্ছন্নতার কাজে তেমন কোনো লাভ হয়নি।

এর আগে সিদ্ধিরগঞ্জ পুল থেকে আবদুল আলী পুল পর্যন্ত কৃষ্ণ খালের সংস্কার করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে ওই খালও পূর্ণাঙ্গ ভাবে সংস্কার করা হয়নি বলে জানিয়েছে স্থানীয় লোকজন। কৃষ্ণ খালেরও ময়লা-আবর্জনা এবং মাটি পাড়ে রেখে দেওয়ায় বৃষ্টির কারণে সেগুলো আবার খালে গিয়ে পড়ে বলে জানিয়েছে তারা। তাই এবারও বন্যার আশঙ্কা করছে ডিএনডিবাসী।
গত সোমবার (১৬মে) সরেজমিন ঘুরে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরজুড়েই জলাবদ্ধতা থাকে বাঁধের ভেতর অনেক জায়গায়। শিল্পা ল, আবাসিক এলাকা, উপশহর যেখানে যা-ই গড়ে উঠুক না কেন, কোথাও ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই।

সিদ্ধিরগঞ্জের কদমতলী আবাসিক এলাকা, হীরাঝিল, এনায়েতনগরের একটি অংশ, জালকুড়ির বিভিন্ন অংশসহ ফতুল্লার হাজীগঞ্জের একটি অংশ, পশ্চিম তল্লা, চানমারী, লালপুর, সেহাচর, ভুঁইগড়ের একটি অংশ, ডেমরার শিশু মাতৃসদনের তিন দিক ঘিরে, ডেমরার দনিয়ার কিছু অংশ, শনির আখড়ার কিছু অংশ এবং জুরাইনের কয়েকটি মহল্লাসহ অনেক জায়গায়ই বছরজুড়ে থাকে জলাবদ্ধতা। ডিএনডিবাসীকে নিয়ে শুধু রাজনীতি চলে বলে অভিযোগ অনেকের। তক্কারমাঠ এলাকার আবুল হোসন বলেন, ‘ভোট আইলেই আমাগো খবর লয়। কয় পানি থাকব না। হেরপরে আর খবর থাহে না।’ ডগাইর এলাকার বৃদ্ধ কৃষক মনির হোসেন বলেন, ‘আগের দিনো ধানক্ষেত ভরা আছিল। অহন বাড়ি-ঘর ছাড়া আর কিছুই নাইহা।

এমনই একজন ভুক্তভোগি ফতুল্লার উত্তর-পূর্ব শিহাচর এলাকার বসবাসরত মো: আকাশ। তিনি বলেন, “ভাই গতবার ঘরে পানি উঠায় আত্মীয়র বাসায় থাকছি। এবারও একই অবস্থা বাসায় পানির কারণে বাসায় যাইতে ভালো লাগে না, কি করমু”।

‘সূত্র জানায়, ২০০৪ সালের ভয়াবহ বন্যার পর বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে বাধা কোথায় খুঁজতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা আবিষ্কার করেন, সরকারি জায়গা, নিষ্কাশনের খাল-নালা সব ভূমিদস্যুর কবলে। তারা খাল ভরাট করে মার্কেট, ইমারত ইত্যাদি গড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ডিএনডি কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে উদ্যোগ নিয়ে ২০০৫ সালে তাদের উচ্ছেদও করেছিল। কিন্তু আবার সেগুলো দখল করে নেয় তারা। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় উচ্ছেদ কার্যক্রম চলে পুরোদমে। কিন্তু এরপর দখলদাররা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

ডিএনডি বাসী আর কোন আশ্বাস বা প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তাদের জীবন যাত্র বিপর্যস্ত। অচিরেই এ সমস্যার সমাধান করবে সরকার। এমনটাই দাবি ডিএনডি বাসীর।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি ২৫ মে ২০১৬

Related posts