September 26, 2018

কোনো বিরোধ নেই এরশাদ দম্পতির ভিতর !

ভাঙা-গড়া আর চড়াই-উৎড়াইয়েই জাতীয় পার্টির ‘ডায়েরি’র পাতা ভরা। আবারো ভাঙনের মুখে জাতীয় পার্টি। বর্তমান বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদের সঙ্গে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দ্বন্দ্ব বেশ কয়েকবারই জনসম্মুখে আসলেও ‘পার পেয়েছেন’ প্রতিবারই। এবারও ছোটভাই জিএম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান এবং উত্তরসূরী ঘোষণা করায় মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলুর নেতৃত্বে একটি অংশ ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে।

সোমবার সন্ধ্যায় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের বৈঠকে রওশন এরশাদকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার সিদ্ধান্ত নেন। গুলশানে রওশনের বাসায় দ্বিতীয় দফা বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান জাপার মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু।
ক্ষোভ প্রকাশ করে এসময় বাবলু বলেন, ‘এরশাদ দলীয় গঠনতন্ত্র না মেনেই তার ছোট ভাইকে কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন। এ নিয়ে কোনো ফোরামেই তিনি আলোচনা করেননি। আমরা গঠনতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে সর্বসম্মতিক্রমে রওশন এরশাদকে দলের অ্যাক্টিং চেয়ারম্যান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

তবে এটাকে ‘আবেগ’র সিদ্ধান্ত আখ্যা দেন সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘তাদের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। আবেগে আপ্লুত হয়ে তারা এ কাজটি করেছেন। চেয়ারম্যানের কাছে তাদের আবেদন থাকতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবেন চেয়ারম্যান। এটা তার এখতিয়ার।’

হাওলাদার জানান, দলের জাতীয় কাউন্সিলে গঠনতন্ত্র সংশোধন বা যেকোনো পরিবর্তন অনুমোদন দেয়া হয়। কাউন্সিলেই চূড়ান্ত করা হয় চেয়ারম্যান, মহাসচিব, প্রেসিডিয়াম সদস্যদের ক্ষমতা। প্রত্যেক বিষয়ই সেখানে উল্লেখ থাকে। সেটা গঠনতন্ত্রের গাইড লাইন।
তিনি আরো বলেন, ‘গঠনতন্ত্রে পার্টির চেয়ারম্যান হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে কাউকে প্রেসিডিয়াম করতে পারেন, কাউকে অব্যাহতি দিতে পারেন। গ্রহণ বা বিদায় বলার এখতিয়ারও তার। তিনি যদি মনে করেন পার্টির শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয়েছে বা কেউ দলের বিরুদ্ধে কাজ করেছে, চেয়ারম্যান তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন। এই ক্ষমতা গত কাউন্সিলে তাকে দেয়া হয়েছে। এর আগেও এই ক্ষমতা ছিল। সুতরাং চেয়ারম্যানের প্রদত্ত ক্ষমতাবলে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা সঠিক।’

বৈঠকে রওশন এরশাদকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়াতেই বাবলুর পদ খোয়ানোর ব্যাপারে আভাস দেন হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘জিয়াউদ্দিন বাবলু সাহেব যেভাবে ছটফট করছেন, তার পদ নিয়ে সন্দিহান আছে। বাবলু সাহেবের যে বেদনা সেটা তার বক্তব্যেই দেখতে পেয়েছি।’

অবশেষে হাওলাদারের আভাসই সত্য হয়। তরিৎ সিদ্ধান্ত নেন চেয়ারম্যান এরশাদ। আজ (মঙ্গলবার) দুপুরে বনানীতে নিজ কার্যালয়ে ডাকা জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জিয়াউদ্দিন বাবলুকে হটিয়ে সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারকেই আবার মহাসচিব হিসেবে ঘোষণা করেন তিনি।

এসময় তিনি সব ‘বিশৃঙ্খলা’র জন্য বাবলুকেই দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘ওটা রওশনের স্টেটমেন্ট ছিল না, ছিল বাবলুর স্টেটমেন্ট।’

বেশ আত্মপ্রত্যয়ী এরশাদ জোর দিয়েই বলেন, ‘রওশদ এরশাদ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হননি। হতে পারেন না। এগুলো রওশনের বক্তব্য না। বাবলু ঘোষণা দেয়ার কে? আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। উনি বিরোধী দলীয় নেত্রী। উনি সংসদে পার্টির ভূমিকা পালন করেন। আমি দল পরিচালনা করি।’

২০১৪ সালে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠায় বিতর্কে পড়েন এবিএম রুহুল আমিন। এরপর তাকে হটিয়ে ওই বছর ১০ এপ্রিল রাতে পার্টির চেয়ারম্যান গঠনতন্ত্রের ৩৯ ধারা মোতাবেক রুহুল আমিন হাওলাদারের জায়গায় জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে মহাসচিব নিয়োগ দেয়া হল।

তবে এবারের সিদ্ধান্তে বেশ কৌশলীও ছিলেন এরশাদ। তিনি ভাঙন ঠেকাতে যতটা পারা যায় কৌশলে জিয়াউদ্দিন বাবলুর ওপর দিয়ে সব ‘চালিয়ে দিয়েছেন’ এমনটাই ভাবছেন অনেকে। এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে রওশনের বাসায় দ্বিতীয় দফায় বৈঠকের পর। এতে রওশনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবেন কি না? প্রশ্নে এরশাদ বলেন, ‘না এখানে উনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কিছু নেই। উনি এসব জানেন না। এটা বিভ্রান্তমূলক।’

বৈঠকে আসা অন্য নেতাদের ব্যাপারেও তিনি শিথিলতা দেখিয়েছেন। গতকাল অনেকেই এ বিষয়ে খোঁজ নেয়ার জন্য গিয়েছিলেন বলে কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

এ ঘোষণার দুই ঘণ্টা পরই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বিরোধী দলীয় প্রধান হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ পর্যন্ত যা হয়েছে, চেয়ারম্যান যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, দলের প্রতিটি সদস্য তার বিরোধিতা করেছেন। আমরা তা মেনে নিতে পারিনি। প্রেসিডিয়াম ও সংসদীয় দলের বৈঠকে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে।’
তারপরই আবার সংসদের ভেতরের দিকে চলে যান তাজুল ইসলাম। ঘণ্টাখানেক পর তিনি বেরিয়ে আসেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও এ বি এম রুহুল আমিনের সঙ্গে। এসময় সাংবাদিকরা এরশাদের কাছ জানতে চান সংসদীয় কমিটির বৈঠকের বিষয়ে। এরশাদ বলেন, এ বিষয়ে তাজুল কথা বলবে।

ঘণ্টাখানেক পর এরশাদকে পাশে রেখে এই তাজুলই বলেন, স্যারের (এরশাদের) সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। সব এমপিরা এরশাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন।

সংসদীয় কমিটির বৈঠক শেষে এমন কথাই বলেছিলেন বিরোধী দলের হুইপ শওকত চৌধুরী। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘সংসদীয় কমিটির সভায় সব এমপিরা এরশাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।’

তাজুলের প্রথম বক্তব্যে স্বামী-স্ত্রীর ‘সম্পর্ক’ নিয়ে এরশাদের কথার মিল না পাওয়া গেলেও পরের কথায় ‘রহস্যটা’ থেকেই গেল।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/মেহেদি/ডেরি

Related posts