November 14, 2018

কেন বিএনপি থেকে দূরে ইসলামী দলগুলো?

পৌর নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও এখনো বিএনপি মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে দেখা যাচ্ছে না ইসলামী দলগুলোর নেতাকর্মীদের। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক ইসলামী দলগুলোর মধ্যে বেশির ভাগের প্রার্থীও নেই এবারের নির্বাচনে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতাকর্মীরা বলছে, নির্বাচনে যাওয়ার আগে বিএনপি তাদের সঙ্গে বৈঠক করেনি, নির্বাচনে মেয়র পদে শরিক দলগুলোকে ছাড়ও দেয়নি। তাই বিএনপির সঙ্গে জোট নেতাদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে গত সপ্তাহে জোটের শরিক দলগুলোর মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠক হলেও বেশির ভাগ ইসলামী দলের নেতাকর্মীরা নির্বাচনের মাঠে নেই।

আবার অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নেতাকর্মীরা গত আড়াই বছরে দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মাঠে ছিল। সেসব নির্বাচনে তারা বিএনপির প্রার্থীদের পক্ষে আটঘাট বেঁধে প্রচারেও নেমেছিল। গত দুটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বহু আলোচিত এ সংগঠনের কোনো প্রার্থী না থাকলেও তারা বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক বিভিন্ন ইসলামী দলের ব্যানারে জোট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে। এর মধ্যে গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে হেফাজতের বেশ কিছু নেতাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বিজয়ীও হয়েছেন। কিন্তু পৌর নির্বাচনে হেফাজতের কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না, তাদের নেতাকর্মীরা নির্বাচনী মাঠেও নেই।

এ বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের নেতারা বলছেন, সর্বশেষ গত তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকারদলীয় প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে নেমে সরকারের বিরাগভাজন হতে চায় না হেফাজতে ইসলাম।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু হেফাজতে ইসলাম নয়, ২০ দলীয় জোটের শরিক বেশির ভাগ ইসলামী দলের নেতাকর্মীরা বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থীর পক্ষে মাঠে নেই। বিএনপি, এলডিপিসহ কয়েকটি দল ছাড়া জোটের অন্য দলগুলোর যেন এ নির্বাচন নিয়ে মাথাব্যথাই নেই।

এ ব্যাপারে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ও ইসলামী ঐক্যজোট কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মঈনুদ্দীন রুহী গতকাল বুধবার বিকেলে বলেন, ‘এবার পৌরসভা নির্বাচনে দ্বিনি ও আধ্যাত্মিক ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলামের কোনো প্রার্থী নেই। এ নির্বাচনে হেফাজতের নেতাকর্মীদের কেউ মাঠেও নেই। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুসারেই কেউ প্রার্থী হয়নি।’

এবার বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করার বিষয়ে জানতে চাইলে মাওলানা রুহী বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে শরিক দলগুলোর সাথে কোনো আলোচনা না করে তারা (বিএনপি) প্রার্থী দিয়েছে। এ কারণে বিএনপির প্রতি শরিক দলগুলোর বেশির ভাগ নেতার মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে। গত চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে আমরা বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাই। আমরা জোটের শরিক দল হিসেবে বিভিন্ন নির্বাচনে কাজ করেছি। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিএনপির একলা চলো নীতির কারণে অদূর ভবিষ্যতে এ দলকে বড় খেসারত দিতে হবে। বিএনপি জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধের পক্ষের শক্তি দাবি করলেও নির্বাচনে ইসলামী দলগুলোকে মূল্যায়ন করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।’

একই বিষয়ে জানতে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরীর সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি মাহফিল অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন জানিয়ে নির্বাচন বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সহকারী মহাসচিব ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শাখার সভাপতি মীর ইদ্রিস বলেন, ‘পৌর নির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে জোটগতভাবে দলগুলের সাথে সমন্বয়ের অভাব ছিল। অন্য নির্বাচনগুলোতে জোটের শরিক দল হিসেবে আমরা মাঠে থাকলেও এবারের নির্বাচনে শরিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা সেভাবে মাঠে নামেনি।’

জোটের আরেক শরিক খেলাফতে মজলিসের কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য ও দলের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি অধ্যাপক খোরশেদ আলম বলেন, ‘বিভিন্ন নির্বাচনে আমাদের সক্রিয় ভূমিকা থাকলেও এবার তা নেই। আমাদের দলের কোনো প্রার্থী চট্টগ্রাম বিভাগে নেই। নির্বাচন ইস্যুতে জোটগতভাবে আমাদের ডাকা হয়নি। গত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমাদের সাথে বৈঠক করে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল। আমরা সহযোগিতা করেছি। পৌর নির্বাচনে কেউ ডাকেনি, তাই আমরা মাঠে নেই।’

২০ দলীয় জোটের শরিক কয়েকটি দলের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, তিন পার্বত্য জেলা, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর জেলার আওতাধীন পৌরসভাগুলোতে হেফাজতে ইসলাম ও ২০ দলীয় জোটের শরিক ইসলামী দলগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই মাঠে নেই। দেশের অন্য জেলার পৌরসভাগুলোতেও একই অবস্থা। শুধু বিএনপিসহ কয়েকটি দল মেয়র পদে নির্বাচন করছে। ওই দলগুলোর নেতাকর্মীরাই কেবল নিজ নিজ প্রার্থীর পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালে সিলেট, বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পরাজিত করে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হন। এসব নির্বাচনে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে বলে সে সময় ব্যাপক আলোচনা হয়। অনেকটা প্রকাশ্যেই তারা মাঠে ছিল।

২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন স্থানে হেফাজতে ইসলামের বেশ কয়েকজন নেতা প্রার্থী হয়েছিলেন। এর মধ্যে চট্টগ্রামের হাটহাজারী, পটিয়া, রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেছিলেন হেফাজতের কয়েকজন নেতা। এ নেতারা আবার ২০ দলীয় জোটের শরিক কয়েকটি ইসলামী দলেরও পদে রয়েছেন। চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন ইসলামী ঐক্যজোটের হাটহাজারী উপজেলা শাখার সভাপতি মাওলানা নাসিরউদ্দিন মুনির। তিনি হাটহাজারীতে হেফাজতে ইসলামেরও সহসভাপতি। সর্বশেষ গত ২৮ এপ্রিল ঢাকার দুটি ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনেও বিভিন্নভাবে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন হেফাজতে ইসলামের বিভিন্ন নেতাকর্মী।

হেফাজতে ইসলামের বেশ কয়েকজন নেতা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, এর আগে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচনে হেফাজতে ইসলাম কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করেনি। তবে ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে যাঁরা আছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে রয়েছেন। তাঁরা নির্বাচন করেছেন ব্যক্তিগতভাবে। জোটের শরিক ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফতে মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তুল ওলামায়ে ইসলামসহ বিভিন্ন ইসলামী দলের নেতাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে আছেন। এসব ইসলামী দলের মধ্যে যারা নির্বাচন করেছে তাদের হেফাজতে ইসলাম সরাসরি কোনো সমর্থন দেয়নি। তবে ওই ইসলামী দলগুলোর ব্যানারে গত সাতটি সিটি নির্বাচনসহ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে হেফাজতে ইসলামের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা কাজ করেছেন। কিন্তু এবারের পৌর নির্বাচনের আগে শরিক দলগুলোর সঙ্গে বিএনপি বৈঠক না করায় দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। শরিক দলগুলো দূরে সরে থাকার কারণে দলগুলোর অনেক নেতাও মাঠে নেই। ফলে হেফাজতে ইসলামের নেতারাও থাকবেন না, এটাই স্বাভাবিক।

হেফাজতে ইসলামের একাধিক নেতা জানান, রাজনীতির মাঠে সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে সর্বশেষ তিন সিটি নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। এবার দলীয় নির্বাচনে বিএনপি কতটুকু সফল হবে তা অনিশ্চিত। তাই নির্বাচনী মাঠে নেমে সরকারের বিরাগভাজন না হওয়াই ভালো। হেফাজত সরকারের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছে।

এসব বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘শরিক দলগুলো মাঠে নেই—ব্যক্তিগতভাবে কেউ কেউ এ দাবি করতে পারে। তবে জোটের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব সৃষ্টি হয়নি। খুব কম সময়ের মধ্যে পৌর নির্বাচনের আয়োজন হওয়ায় জোটের সঙ্গে সমন্বয়ের সময় পাওয়া যায়নি। শরিক দলগুলোর কেউ কাজ করছে না, এ রকম খবরও আমার জানা নেই।’

হেফাজতের মাঠে না থাকা প্রসঙ্গে নোমান বলেন, ‘হেফাজত তো ধর্মীয় সংগঠন। তারা কোনো নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের সমর্থন দেয়নি। আমরাও তাদের কাছ থেকে সমর্থন চাইনি। তারা কোনো প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে থাকলে সেটা করেছে ব্যক্তিগতভাবে।’

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts