September 24, 2018

কেন্দ্রীয় কারাগারে আর ফাঁসি হবে না

ঢাকাঃ  পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দীন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারে আর ফাঁসি হবে না। কেরানীগঞ্জে আজ নতুন কারাগারের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে চকবাজারের এই কারাগার স্থানান্তরের কাজ শুরু হচ্ছে। এখন থেকে ফাঁসির রায় সেই নতুন কারাগারেই কার্যকর করা হবে।

নাজিমউদ্দীন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারের মূল ফটক পেরিয়ে পর পর আরও ছয়টি ছোট-বড় ফটক। সরু, কালো পিচঢালা রাস্তা ধরে হেঁটে গেলে কারাগারের একেবারে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে (চকবাজারের দিকে) ছোট সবুজ ঘাসে ভরা এক টুকরো খোলা মাঠ। ছোট রাস্তাটি পেরিয়ে মাঠের শেষ প্রান্তে দেয়াল ঘেঁষে এক কোণে লাল রঙের টিন দিয়ে ঢাকা। ছোট্ট একটা ঘরের মতো। এটিই কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির ঘর। ভিতরে দুটি মঞ্চ রয়েছে। এক মঞ্চেই একযোগে দুজনের ফাঁসি কার্যকর করার ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সব ফাঁসির রায় কার্যকর হয় ঢাকা কারাগারের এই ফাঁসির মঞ্চে। ১৯৭৬ সালে কর্নেল তাহেরকে যেমন এই কারাগারেই ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, তেমনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার পাঁচ আসামির ফাঁসির রায় কার্যকর হয় এই কারাগারেই। চার যুদ্ধাপরাধীসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সেনা সদস্যসহ বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর মামলার ফাঁসির রায় কার্যকর হয় এই ঢাকা কারাগারে। ঐতিহাসিক সব ফাঁসি এই কারাগারে হলেও এরপর আর কখনই এখানে ফাঁসি কার্যকর হবে না। কালের সাক্ষী হয়েই থাকবে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির মঞ্চ।

কারাগার সূত্র জানায়, অবিভক্ত ভারতবর্ষে ১৮৩৬ সালে বিভিন্ন জেলা ও মহকুমা সদরে কয়েকটি কারাগার নির্মাণ করা হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, যশোর, কুমিল্লাসহ কয়েকটি কারাগার ওই সময় নির্মাণ করা হয়। তবে ১৭৮৮ সালে একটি ক্রিমিনাল ওয়ার্ড নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকা কারাগারের কাজ শুরু হয়েছিল। ফাঁসির মঞ্চটি ওই সময় তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। কারাগারের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে নির্ধারিত ফাঁসির মঞ্চে কারাবিধান অনুযায়ী কিছু নিয়মকানুন পালনের মধ্য দিয়ে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দণ্ড কার্যকর করা হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে সূর্যসেন ও ক্ষুদিরামসহ স্বাধীনতা আন্দোলনের মহানায়কদের ফাঁসিতে পুরো ব্রিটিশ ভারতে নিন্দার ঝড় উঠেছিল। পাকিস্তান আমলেও মৃত্যুদণ্ড হিসেবে ফাঁসি কার্যকর ছিল। কারা সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে এদেশের কারাগারগুলোতে বিভিন্ন অপরাধে সাড়ে চারশর বেশি জনের ফাঁসি কার্যকর হয়। এর মধ্যে ১৯৭৬ সাল থেকে চার দশকে মোট ৪৩৩ জনের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খুন, ধর্ষণ, ডাকাতির আসামি থেকে শুরু করে শীর্ষজঙ্গি। রয়েছে রাজনীতিবিদ থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধী পর্যন্ত গুরুতর অপরাধী। ১৯৭৬ সালে খুনের দায়ে ৩ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়। বিশেষ সামরিক আদালতের রায়ে ওই বছরের ১৭ জুলাই কর্নেল (অব.) তাহেরের ফাঁসির ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল।

আর স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ সালে সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টার অভিযোগেই স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ২৪৭ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল। এর মধ্যে ১৮ অক্টোবর ৩৭ জন, ২৬ অক্টোবর ৫৬ জন, ১৮ নভেম্বর ৩৭ জনের ফাঁসি হয়। এরপর ১৯৭৮ সালে ১৭ জন ও ১৯৭৯ সালে একজনের ফাঁসি হয়। পরের বছর ১৯৮০ সালের ৩ জুন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কিশোরগঞ্জের চার জেলেকে হত্যার দায়ে একসঙ্গে চারজনের ফাঁসি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। ওই বছর আরও ৯ জনসহ মোট ১৩ জনকে ফাঁসির রশিতে ঝুলানো হয়েছিল। সেনা বিদ্রোহ ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার দায়ে ১৯৮১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ১২ জন সেনা কর্মকর্তার ফাঁসির আদেশও এখানে কার্যকর হয়। এ ফাঁসির ঘটনাও বেশ আলোচিত ছিল। ওই বছর আরও একজনসহ মোট ১৩ জনের ফাঁসি হয়েছিল। ১৯৮২ সালে ছয় এবং ১৯৮৩ সালে সাতজনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। পরের বছর কারও ফাঁসি কার্যকর হয়নি। তবে ১৯৮৫ সালে ১৩ জন ও ১৯৮৬ সালে ২৬ জনের ফাঁসি হয়। গৃহপরিচারিকার সঙ্গে পরকীয়ার জের ধরে স্ত্রী সালেহাকে হত্যার দায়ে ১৯৮৭ সালে ডা. ইকবালের ফাঁসি ছিল সেই সময়ের আলোচিত ঘটনা। এটি বছরের একমাত্র ফাঁসি ছিল।

এরপর ১৯৮৮ সালে দুজন ও ১৯৯০ সালে একজনকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ১৯৯১ সালে কারও ফাঁসি না হলেও ১৯৯২ সালে পাঁচজনের ফাঁসি হয়। পরের ১৯৯৩ সালের ২৭ জুলাই শহীদ সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী কন্যা শারমিন রীমাকে হত্যার দায়ে তার স্বামী মনির হোসেনের ফাঁসিসহ আরও চারটি ফাঁসি কার্যকর হয়। ১৯৯৪ সালে কার্যকর হয় দুজনের ফাঁসি। ১৯৯৫ এবং ৯৬ সালে কোনো ফাঁসি কার্যকর হয়নি। ১৯৯৭ সালে ডেইজি হত্যা মামলার আসামি হাসানসহ দুজনকে ফাঁসি দেওয়া হয়। পরের তিন বছরও কোনো ফাঁসি কার্যকর হয়নি। এরপর ২০০১ সালে তিন এবং ২০০২ ও ২০০৩ সালে দুজন করে চারজনের ফাঁসি হয়। ২০০৭ সালে নারায়ণগঞ্জের রিপন নামে এক যুবকের ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। স্ত্রী মাম্মীকে হত্যার অভিযোগে তার এ দণ্ড কার্যকর হয়। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার পাঁচ আসামি সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, মহিউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ ফারুক রহমান, এ কে এম মহিউদ্দিনের ফাঁসি কার্যকর হয় ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি। ওই বছর আরও চারজনসহ মোট নয়জনের ফাঁসি হয়। ২০১১ সালে পাঁচ ও ২০১২ সালে একজনের ফাঁসি হয়। ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লা, ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিলে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল

কামারুজ্জামান এবং একই বছরের ২২ নভেম্বরে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালের প্রথম দুই মাসে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/১০ এপ্রিল ২০১৬/রিপন ডেরি

Related posts