November 15, 2018

‘কেউ দেকপারো আসে না’


ঢাকাঃ তাজো বেওয়া শত বছরের সীমা অতিক্রম করেছেন। গায়ে-গতরে জিয়ে থাকা কিঞ্চিত শক্তিতে কোনোমতো চলাফেরা করতে পারেন। এর বাইরে তেমন কিছু করার শক্তি সামর্থ্য নেই। চল্লিশ বছর আগে যখন তার বয়স ষাট ছিল সে সময় স্বামীকে চিরদিনের জন্য হারান। এরপর একে একে কাছের অনেক স্বজন, নিজের সন্তানকেও হারিয়ে ফেলেন তিনি। বর্তমানে ছোট ছেলে ছাড়া তার আর কেউ নেই। ছেলে বিশা প্রামানিকের সংসারেই এখন তার জীবন কাটছে। ঘরের ভেতর তিন সপ্তাহ আগে পানি ঢুকেছে। এখন তার ঘরের মধ্যে বুক পরিমাণ পানি। ছেলের সঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ছোট্ট একটি ঘরে এখন তার বাস। কাছে বসলে শোনালেন তার জীবনকাহিনী। সংসার শুরু সময় তাদের সব কিছুই ছিল। গোয়াল ভরা গরু, পুকুরে মাছ, জমির ফসল সবই ছিল। সময়ের নির্মম পরিহাসে এসব এখন তার কাছে কেবলি স্মৃতি। অতীতের দিনগুলোর কথা মনে হয়ে এখন তার চোখে কেবলি পানি ঝরে। হাজারো সুখময় দৃশ্য ঝাপসা হয়ে ভেসে ওঠে চোখের পর্দায়।

যমুনা নদীর তীর থেকে বেশ দূরেই ছিল তাদের আবাস ভূমি, চাষের মাঠ। যমুনার করালগ্রাস ক্রমান্বয়ে সামনের দিকে আসতে থাকে। ভাঙতে থাকে মাটি, নদীর পাড়, ফসলের মাঠ। একদিন নদী এসে ঠেকে তাদের উঠান সীমায়। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ক্ষুধার্ত নদীর পেটে চলে যায় স্বপ্নে গড়া সংসারের সব কিছু। বুদ্ধি হারিয়ে যায়। বাকরুদ্ধ তাজোর চোখে তখন ফুটে ওঠে হতাশার ছাপ। চরেই আবার গড়ে তোলে থাকার ঘর। বছর দুইয়েক পরে সেই ঘরেও হানা দেয় যমুনা। এভাবে আরো পাঁচবার ভেঙে যায় স্বপ্ন। এক জায়গায় ঘর তুলে বছরের পর বছরও অবস্থান করতে পারে না। নদী এসে বাদ সাধে। ভেঙে দেয় ঘর-সংসার। কেড়ে নেয় স্বপ্নের সব রঙ। তার পরেও তারা নদীর কাছেই থেকে যায়। নদী তাদের সঙ্গে শত্রুতা করলেও জীবনের অংশ হিসেবে চরবাসী নদীকে অনেক আপন করে নিয়েছে। সব শেষে সারিয়াকান্দির কুতুবপুর এলাকায় ছেলে বিশা এক টুকরো জমি কিনে ঘর বেঁধেছে।

চলতি বন্যায় সেই ঘরের মধ্যে এখন বুক পরিমাণ পানি। নদীর সঙ্গে প্রতিনিয়তই যুদ্ধ করে বাঁচতে হচ্ছে তাদের। উপায় না পেয়ে বাঁধেই বেঁধেছে বাসা। সারিয়াকান্দির কুতুবপুর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। উপজেলার মথুরাপাড়া বাজারের দক্ষিণ থেকে শুরু করে কামালপুরের দড়িপাড়া পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ছোট ছোট ঘর তুলে আশ্রয় নিয়েছে তাজো বেওয়াদের মতো হাজারো পরিবার। ওই পরিবারগুলোতে এখন চলছে শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানির পাশাপাশি জ্বালানির তীব্র সংকট। পানিবাহিত রোগ ডায়রিয়া, আমাশয়, পাচরায় আক্রান্ত হচ্ছে অনেকে। নৌকা যোগে অনেক দূর থেকে টিউবওয়েলের পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাদের। খাবার স্যালাইন, জরুরি ওষুধ হাতের কাছে পাওয়া যাচ্ছে না। অপর দিকে গবাদিপশুর খাদ্য সংকটও দেখা দিয়েছে এসব এলাকায়। এখানে বসবাসকারী পরিবারের প্রধানদের অধিকাংশ কৃষক। তারা অন্যের জমিতে কাজ করে উপার্জন করে সংসার চালায়। পাশাপাশি পশুপালন করে থাকে।

বর্তমানে ফসলের জমি পানির নিচে ঢুবে যাওয়ায় তারা বেকার হয়ে পড়েছে। কাজ না থাকায় অর্থ সংকটের করুণ দশাও এখন তাদের সামনে হাজির হয়েছে। দু’মুঠো ভাত একবেলা জুটছে তো দুই বেলা কাটছে না খেয়ে। তাজো বেওয়াদের অসময়ে কেউ পাশে এসে দাঁড়ায়নি। অনেকটা ক্ষোভের সঙ্গে তিনি জানালেন, ‘ভোটের মদে হাংগেরে কাছোত কত নোক আসে, বানের পানিত তলে যাচ্চি এখন কেউ দেকপারো আসে না।’ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বন্যায় সারিয়াকান্দি উপজেলার ৯, সোনাতলা উপজেলার ৩ এবং ধুনটের ২ ইউনিয়নের দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন।

Related posts