November 22, 2018

কুরআনের আলোকে প্রিয়জন স্মরণের তাৎপর্য

hপ্রিয়জন বলতে আমরা মা-বাবা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী, নানা-নানী, ওস্তাদ-শিক্ষক, চাচা-চাচী, ফুফা-ফুফু, ছেলে-মেয়ে, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী ও ভক্ত-অনুরক্ত ইত্যাদি বুঝে থাকি। একজন শিশু যখন দুনিয়ায় প্রথম আগমন করে তখন প্রথম প্রিয়জন হলেন তার মা। শিশুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার প্রিয়জনের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। শৈশব-কৈশোর, যৌবন ও বার্ধক্যে বয়সের ধরন পরিবর্তনের সাথে প্রিয়জনের ধরন ও আকার পরিবর্তন হয়। দেখা যায় রেডিও-টেলিভিশনে একজন কণ্ঠশিল্পীর গান শুনে আমরা ওই শিল্পীর ভক্ত হয়ে যাই। অনেক সময় শিল্পীর আকস্মিক মৃত্যু হলে আমরা ব্যথিত হই। মনের অজান্তেই ওই শিল্পীর জন্য চোখে পানি আসে। ভক্তদের কেউ কেউ আত্মহত্যা পর্যন্ত করে ফেলেন। অথচ ওই শিল্পীর সাথে ভক্তের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। সহকর্মী, বন্ধু-বান্ধবের মৃত্যু হলে তার স্মরণে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। বন্ধুর স্মৃতি রক্ষার্থে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়। মেমোরিয়াল সংসদ কিংবা ট্রাস্ট গঠন করা হয়। বিয়েশাদি, আচার-অনুষ্ঠান, জন্মদিন ইত্যাদিতে আমরা প্রিয়জনকে দাওয়াত করি। পবিত্র কুরআনে প্রিয়জনকে অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে প্রিয়জনের স্মরণে অর্ধশতাধিক আয়াত রয়েছে। বলা হয়েছে, ‘হে হাবিব! স্মরণ করুন কিতাবে হজরত ইব্রাহিমকে’ (সূরা মরিয়ম : ৪১)। ‘হে হাবিব! স্মরণ করুন কিতাবে হজরত মূসাকে’ (সূরা মরিয়ম : ৫১)। ‘হে হাবিব! আপনি কিতাবে স্মরণ করুন মরিয়মকে’ (সূরা মরিয়ম : ১৬)। ‘হে হাবিব! আপনি আপনার উম্মতদের আল্লাহর দিনগুলো সম্পর্কে উপদেশ দিন’ (সূরা ইব্রাহিম : ৫)।
পবিত্র কুরআনে নিজ পরিবার-পরিজনের চেয়ে রাসূল সা:-কে বেশি ভালোবাসার জন্য নির্দেশ করা হয়েছে। কুরআনের ভাষা অনুযায়ী, এক মুমিন অপর মুমিন বান্দার প্রিয়জন। কুরআনের ভাষায়, মুমিনের আপনজন প্রিয়নবী সা:। নিজ পরিবারের চেয়ে আমাদের অতি আপন প্রিয়নবী সা:। আমাদের আত্মীয়তা হবে প্রিয়নবী সা:-এর সাথে। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমি আপনার নিকট পূর্ববর্তী যুগের রাসূলগণের যা ঘটনা বর্ণনা করেছি তা আমি আপনার হৃদয়কে সুদৃঢ় ও মজবুত করার জন্য’ (সূরা হুদ : ১২০)। ‘নিশ্চয় তাদের ঘটনাগুলোয় রয়েছে তোমাদের জন্য শিক্ষা ও উপদেশ’ ( সূরা ইউসুফ : ১১১)।
পবিত্র কুরআনে হজরত ইয়াহইয়া আ:-এর শুভ জন্ম ও বেচাল সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘এবং তার প্রতি সালাম বা শান্তিÑ যে দিন হজরত ইয়াহইয়া আ: জন্মগ্রহণ করেছেন, যেদিন তিনি ওফাত পাবেন এবং যেদিন তিনি পুনরুজ্জীবিত হবেন’ (সূরা মরিয়াম : ১৫)। হজরত ঈসা আ: সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘এবং আমার প্রতি সালাম ও শান্তি- যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন আমি ওফাত পাবো এবং যেদিন আমি পুনরুজ্জীবিত হবো’ (সূরা মরিয়ম : ৩৩)।
কুরআন একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান। কুরআনের ভেতরে আমরা প্রবেশ করতে চাই না। শুধু তেলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি। বিভিন্ন ফেতনা-ফাসাদ থেকে বেঁচে থাকার উপায় হলো কুরআন আরবিতে পাঠ করার পাশাপাশি এর অর্থ মাতৃভাষায় পাঠ করা। কুরআন সম্পর্কে আমরা প্রায়ই বলে থাকি, ‘এমন কোনো বিষয় নেই, যা কুরআনে নেই।’ মজার বিষয় হলো, কোনটি যে আছে আর কোনটি নেই- এ কথা যিনি বলে থাকেন তিনি শুধু বলার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন। তা অনুসন্ধান করার মতো আগ্রহ তাদের নেই। অথচ আমরা নিজেদের কুরআনের অনুসারী হিসেবে দাবি করি। যারা রাসূল সা:-কে প্রিয়জন হিসেবে মেনে নিয়ে তাঁর জীবনী বেশি বেশি পড়বে, কোনো একসময় তারা প্রিয়নবীর সুন্নতের প্রতিও উদ্বুদ্ধ হবে। মায়ের গর্ভে আমরা জন্মেছি বলে পিতার পরিচয় জানার চেষ্টা করি। পাশাপাশি মুসলিম হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে হলে ইসলামে নিজের পরিচয় ও অবস্থান জানা জরুরি। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা চয়ন করে নিয়েছেন হজরত আদম, হজরত নূহ, হজরত ইব্রাহিমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরকে বিশ্ববাসীর মধ্য থেকে’ (সূরা আল ইমরান : ৩৩)। ‘তারা হলেন ওই পরম সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ যাদের আল্লাহ তায়ালা সঠিক পথের ওপর অধিষ্ঠিত রেখেছেন। সুতরাং তোমরাও তাদের সেই সঠিক পথের অনুসরণ করো’ (সূরা আনয়াম : ৯০)।
আহমদ শরিফে হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত হয়েছে। রাসূল সা: এরশাদ করেন,
‘আল্লাহ বেহেশতে তাঁর কোনো কোনো বান্দার মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন, বান্দা তার অতিরিক্ত মর্যাদার কারণ আল্লাহর নিকট জানতে চাইলে আল্লাহ বলবেন, ‘তোমার সন্তান তোমার জন্য ক্ষমা চেয়েছে। এর জন্য বেহেশতে তোমার মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।’ সুতরাং প্রিয়জনের স্মরণ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি কাজ।

Related posts