September 20, 2018

কী দিল আরব বসন্ত ?

বিপ্লবের দুরন্ত ঘূর্ণি হয়ে এসেছিল আরব বসন্ত। ঊষর মরুর বুকে ফুটেছিল গণজাগরণের লাল ফুল। সে ফুলের সুবাস ছড়িয়ে পড়েছিল দুনিয়াজুড়ে। সেই সুবাস কি আছে এখনো?

২০১০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর। মাঝখানে কেটে গেছে পাঁচ বছর, আলোচিত আরব বসন্তের। তাই এখন আলোচনা চলছে—কী পাওয়ার কথা ছিল, আর কী পাওয়া গেল? আরব বসন্তের পাঁচ বছর উপলক্ষে পাওয়া না-পাওয়ার খতিয়ান প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও বিভিন্ন গণমাধ্যম।

পুলিশের দুর্নীতির প্রতিবাদে ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর তিউনিসিয়ার সিদি বাওজিদ এলাকার ফুটপাতের সবজি বিক্রেতা মোহাম্মদ বাওয়াজিজি নিজের গায়ে আগুন জ্বেলে আত্মাহুতি দেন। সেই ঘটনা থেকে জন্ম আরব বসন্তের। ২৬ বছর বয়সী ওই যুবকের আত্মাহুতির খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। তিউনিসিয়ার মানুষ শুরু করে আন্দোলন। তীব্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন দেশটির প্রেসিডেন্ট জয়নাল আবেদিন বেন আলী। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা বেন আলীর শাসনামলের ইতি ঘটে। তিউনিসিয়ার বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ হয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন থাকা শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে বাহরাইন, মিসর, লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেনে।

তিউনিসিয়া: আরব বসন্তের ফলে তিউনিসিয়া কী পেল—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে আল-জাজিরা এক প্রতিবেদনে বলছে, বেন আলীর পতনের পর দেশটি একটি নতুন সংবিধান পেয়েছে। গত বছর দেশটিতে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। দেশটিকে গণতন্ত্রের পথে নিয়ে যেতে অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর শান্তিতে নোবেল পেয়েছে ‘ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টেট’।

তবে আন্দোলনকারীসহ সাধারণ মানুষ চরমভাবে হতাশ হয়েছে। আন্দোলনের সময় কর্মসংস্থানের দাবিটি বেশ জোরালো ছিল। কিন্তু দেশটিতে ২০১৪ সালে বেকারত্বের হার ১৬ শতাংশ ছিল বলে জাতীয় পরিসংখ্যান কার্যালয় বলছে। কাজ না পেয়ে নিজেদের বঞ্চিত ভাবছেন দেশটির তরুণেরা। তাঁদের বক্তব্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের যে দাবি তাঁরা করেছিলেন, শাসকেরা তা উপেক্ষা করছে। দারিদ্র্য, আর্থিক বঞ্চনা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় অনেক তরুণই দেশ ছেড়ে যোগ দিচ্ছেন জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটে (আইএস)। বেকারত্বের অভিশাপে জড়িয়ে পড়ছেন সন্ত্রাস-দুর্নীতিতে।

বাহরাইন: দেশটিতে আরব বসন্তের ছোঁয়া লেগেছিল ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে। আন্দোলনের মুখে সরকার তখন তাৎক্ষণিক কিছু সংস্কারের কথা জানায়। এতে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের গদিচ্যুত হতে হয়নি। দেশটির ব্যাপারে অ্যামনেস্টি বলছে, আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চলছেই। বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে। দমন-পীড়নের নানা অভিযোগ তুলে তা তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছিল আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। এমন দাবির মুখে দেশটির বাদশাহ স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা জানানো হলেও দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি।

মিসর: ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তুমুল গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক। কিন্তু তিনি ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় আন্দোলনকারীদের দমনে ব্যাপক ধর-পাকড় চালান। অ্যামনেস্টির মতে, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে তখন অন্তত ৮০০ আন্দোলনকারী নিহত হন এবং ছয় হাজারের বেশি লোক আহত হন। মোবারকের পতনের পর দেশটিতে গণতান্ত্রিকভাবে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হন মুসলিম ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসি। তবে গণতন্ত্রের সেই ধারাবাহিকতা আর থাকেনি। তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনা-সমর্থন নিয়ে ক্ষমতাসীন হন সাবেক সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি।

সিসির ক্ষমতায় আরোহণকে কেন্দ্র করে আবার উত্তাল হয়ে ওঠে মিসর। তবে বেশ শক্ত হাতে পরিস্থিতি সামাল দেন সিসি, হয়ে ওঠেন খানিকটা প্রতিশোধপরায়ণ। মুরসিসহ মুসলিম ব্রাদারহুডের অনেক নেতাকে বন্দী করা হয়। এসব বন্দীর মধ্যে শত শত ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় আছেন দেশটিতে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিও।

লিবিয়া: ২০১১ সালে দেশটির তৎকালীন নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। ওই বছরের অক্টোবরে তাঁকে হত্যা করা হয়। এরপর দেশটিতে অনেক সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। এখন এখানে চলে—জোর যার মুল্লুক তার নীতি। দেশটিতে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থাসহ সবকিছু ভেঙে পড়েছে। সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে শরণার্থী জীবন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। অন্তত ২৫ লাখ মানুষের ভাগ্যে এমনটা ঘটেছে বলে দাবি অ্যামনেস্টির।

সিরিয়া: প্রেসিডেন্ট বাসার আল-আসাদের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের মার্চে আন্দোলন শুরু হয়। সেই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত দেশটিতে চরম বিশৃঙ্খলার জন্ম দিয়েছে, উত্থান ঘটিয়েছে সশস্ত্র নানা গোষ্ঠীর। জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের উত্থানে দেশটির এই অবস্থা অনেকটাই ভূমিকা রেখেছে। আইএস ইরাক ও সিরিয়ার কিছু অংশ নিয়ে নিজেদের একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে। নানা জঙ্গি কর্মকাণ্ড চালানো আইএসকে দমন এই মুহূর্তে বিশ্ব রাজনীতির একমাত্র আলোচ্য বিষয়। বলা চলে, সিরিয়াকে ঘিরেই চলছে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি। প্রথম দিকে সিরিয়ার সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল বিদ্রোহীরা। পরে সেই লড়াই সরকার-বিদ্রোহী-আইএস—এমন ত্রিমুখী পরিণতি পায়। আইএসকে দমনে সিরিয়ায় বিমান হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আবার বাসার সরকারের পক্ষ নিয়ে আইএসকে দমনে দেশটিতে বিমান হামলা করছে রাশিয়া।
জাতিসংঘ বলছে, বাসারবিরোধী লড়াইয়ের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে দুই লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। এক কোটি ১০ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়েছে। ৭৬ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির ভেতরেই অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে বাস করছ। সিরিয়ার ৪০ লাখ নাগরিক জর্ডান, লেবানন ও তুরস্কে শরণার্থী হিসেবে আছে। অনেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যাচ্ছে। আইএস ও শরণার্থী-বিষয়ক সাম্প্রতিক বিশ্বের আলোচিত সমস্যার মূলে তাই উল্লেখ করা হচ্ছে সিরিয়ার সংকটকে।

ইয়েমেন: আজীবন ক্ষমতায় থাকার মনোবাসনা নিয়ে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে দেশটির প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেন। প্রতিবাদে জনতা আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে গিয়ে ওই বছরের মার্চে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ৫০ জন নিহত হয়। সরকারের দমন-পীড়নে শত শত মানুষ প্রাণ হারায়। ২০১৪ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে সালেহ এখনো প্রেসিডেন্ট হিসেবে আছেন। দেশটিতে উত্থান ঘটেছে হুতি বিদ্রোহীদের, যাদের দমনে সালেহ সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটিতে সৌদি নেতৃত্বে হুতি বিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

যেসব দেশে আরব বসন্ত এসেছিল পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে, সেসব দেশে কার্যত কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি। বিভেদ-সংঘাত আরও বেড়েছে, বেড়েছে জনগণের হতাশা ও রক্তপাত।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/মেহেদি/ডেরি

Related posts