September 21, 2018

কি দোষ ছিল ছোট্ট আনিসার?

যে বয়সে অন্য শিশুদের সাথে দৌড়-ঝাপ করে খেলার কথা ছিল সেটা বন্ধ হয়ে গেছে শিশু আনিসার। চার বছর বয়সী ছোট্ট ফুটফুটে এই শিশুটি এক বছর আগে আশুলিয়ার কুঁড়গাও এলাকার জনৈক শাহবুদ্দিনের বাড়ির ছাদে খেলতে গিয়ে এক হৃদয় বিদারক দুর্ঘটনার শিকার হয়। ঝুঁকিপূর্ণভাবে টানা বৈদ্যুতিক লাইনের তারে জড়িয়ে হারায় তার দুটি হাত। খেলার সামগ্রী মনে করে ছাদ ঘেঁষে থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটিতে লাগানো চীনা মাটির তৈরি বাটি ধরতে গিয়েছিলো সে। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই এগার হাজার ভোল্টের উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বৈদ্যুতিক তারে স্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হয় আনিসা। প্রথমে তাকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হলেও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজে রেফার্ড করা হয়। সেখানে এক মাস চিকিৎসার পর কেটে ফেলতে হয় আনিসার কোমল দুটি হাত।

কিন্তু শরীরের মূল্যবান অঙ্গ দুইটি হারানোর পরও যেন সেই চাঁপা কষ্টটাকে ভুলতে শিখেছে ছোট্ট আনিসা। হাতছাড়া কিভাবে পড়াশুনা ও নিজের প্রয়োজনীয় কাজ করবে সেই চেষ্টাই সর্বদা তার। স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য পা দিয়েই লেখা ও ছবি আঁকতে শিখেছে সে। পাশাপাশি অন্যসব দরকারি কাজও করতে পারার চেষ্টা করে অবুঝ আনিসা। উঠনের এদিক থেকে ওদিক হাত ছাড়াই ছুটোছুটি করে মেয়েটি। দেখে মনে হয় কোন প্রতিবন্ধকতাই আনিসার শৈশবকে থামিয়ে রাখতে পারবে না। কে বা কারা তার এই করুণ অবস্থার জন্য দায়ী যা সে জানে না। শুধুই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চায় অদম্য এই মেয়েটি। হঠাৎ পত্রিকায় আসা কোন প্রতিবন্ধীর সফলতার কাহিনী শুনে চোখ আনন্দে জ্বলে উঠে তার। সে ভাসতে চায় উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নে।

আর অকালে পঙ্গুত্ববরণ করে নেওয়া ছোট্ট শিশুটির বেঁচে থাকার এই অদম্য সাহসিকতা দেখে আশার আলো পায় পরিবার। তাই সাভারের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি)-তে প্লে শ্রেণীতে ভর্তি পরীক্ষায়ও অংশগ্রহণ করানো হয় আনিসাকে। সেখানে অন্য শারিরীক প্রতিবন্ধীদের কৃত্রিম হাত দেখে বাবা-মার কাছে বায়না ধরে মেয়েটি। তারও একটি এরকম হাত লাগিয়ে দিতে হবে। তাইতো লাজ ভুলে মেয়ের কৃত্রিম হাত সংযোজনে আর্থিক সহায়তার জন্য হাত বাড়িয়েছেন সমাজের বিত্তবানদের কাছে। কেননা কৃত্রিম হাত সংযোজনে যে কমপক্ষে ২০ লাখ টাকা লাগার কথা জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। যা গার্মেন্ট শ্রমিকের এই পরিবারটির পক্ষে ব্যয় অসম্ভব।

২০১৫ সালের ৪ জানুয়ারি বিকেলে কুঁড়গাও এলাকার জনৈক শাহাবুদ্দিনের মেয়ের সাথে তাদেরই বাড়ির ছাদে খেলতে গিয়েছিলিএই দুরন্ত মেয়ে। এসময় ছাদের কিনারে থাকা উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বৈদ্যুতিক তারের খুঁটিতে ব্যবহৃত চীনা মাটির তৈরি গোল বাটির দিকে নজর যায় আনিসার। অবুঝ দুরন্তপনা আনিসা এটিকেই খেলার সামগ্রী ভেবে বসে। ছুটে সেই বাটির নিকটে যেতেই এগারো হাজার ভোল্টের তার টেনে নেয়ে তার মেয়ের কঁচি দুটি হাত। ছিটকে পরে সঙ্গা হারিয়ে ফেলে সে। এসময় আনিসার দুটি হাত স্পৃষ্ট হয়, ভেঙ্গে যায় ডান পা। পরে বাড়ির অন্য ভাড়াটিয়াদের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ৮ দিন চিকিৎসার পর তাকে ভর্তি করা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে তার মেয়ের দুটি হাত কেটে ফেলা হয়।

আনিসার বাবা আলহাজ্ব আলী বলেন, এঘটনার জন্য এলাকাবাসীসহ তারা আনিসার এই অকাল পঙ্গুত্বের জন্য বাড়ির মালিককে দায়ী করেন। কেননা বাড়ির মালিক শাহাবুদ্দিনের অবৈধ পন্থায় ভবন নির্মাণসহ চরম অসাবধানতাই আনিসার এমন অবস্থার জন্য দ্বায়ী। সেসময় থানায় কোন অভিযোগ করা যাবে না এমন শর্তে কিছু টাকা ক্ষতিপূরণ দেয় শাহাবুদ্দিন। সেই সাথে মৌখিকভাবে আনিসার ভবিষ্যতের যাবতীয় খরচ বহন করারও মিথ্যা অঙ্গীকার করেন বাড়ির মালিক শাহাবুদ্দিন।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts