November 15, 2018

কাস্টমারের হয়রানি ‘হজম’-এ বাধ্য কল সেন্টারের নারীরা!

ঢাকাঃ  যে নারীরা কল সেন্টারে কাজ করেন, তাদের প্রতিদিন কম করে হলেও ১১৫-১২০টা কল রিসিভ করতে হয়। আর একেকটা কলে একেক রকম অভিজ্ঞতার মুখে পড়তে হয়। কখনও কখনও দাঁত চেপে হজম করতে হয় কাস্টমারের গালাগালি, অশ্লীল আর হয়রানিমূলক কথাবার্তা। কাস্টমারের অনুমতি ছাড়া কল কেটে দেওয়ার নিয়ম নেই বলে, বাধ্য হয়েই তাদের এসব শুনতে হয়। এসব ঘটনা স্বাভাবিক মনে করে কেউ কেউ চেপে গেলেও অধিকাংশরাই ভেতরে ভেতরে ভোগ করেন অসহ্য যন্ত্রণা।

আফিয়া আবিদা ইষ্টি একটা মোবাইল ফোন কোম্পানির কাস্টমার ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করছেন ছয়মাস ধরে। অভিজ্ঞতা থেকে ইষ্টি বলেন, কিছু কিছু কল রিসিভ করার পর সারাটা দিন খারাপ যায়। এত নোংরা কথা কিভাবে মানুষ উচ্চারণ করতে পারে তা আমার মাথায় আসে না। কিন্তু প্রত্যুত্তর করার কোনও নিয়ম নেই।

তিনি বলেন, অনেক কাস্টমার কলসেন্টারে কল করে নারীর কণ্ঠ পেলে যা তা বলে গালি দেন, পুরুষদের ক্ষেত্রেও অনেকের আচরণ খারাপ থাকে। কিন্তু অযথা যৌন হয়রানিমূলক শব্দ তাদের শুনতে হয় না কখনোই।

কাস্টমাররা যে মোবাইল কোম্পানির সিম ব্যবহার করেন তাদের নানা অফার, বিভিন্ন উদ্যোগ এবং কখনও কখনও রেজিস্ট্রেশন করার বিষয়ে কল সেন্টার থেকে কল আসে। আবার ইন্টারনেট প্যাকেজ ব্যবহার বা হঠাৎই কোনও কারণে টাকা বেশি কাটা পড়লে কাস্টমাররাও কল করেন কল সেন্টারে। এছাড়া গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার জন্য ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কল সেন্টারে নারীরা কাজ করেন।

কাস্টমার কেয়ারে কাজ করা সৈয়দা তানজিনা বলেন, অনুমতি না নিয়ে কল কাটার নিয়ম নেই, তাই একবার সাতচল্লিশ মিনিট অশ্রাব্য কথা শুনতে হয়েছিলো। আমি খুব শক্ত মেয়ে। কিন্তু সেদিন ওই কলটা নেওয়ার পর কেঁদেছিলাম। নিজের অক্ষমতায় কারণ আমার জবাব দেওয়ার মতো শব্দ ছিল কিন্তু সু্যোগ ছিলো না।

কেন সেবামূলক পেশাগুলোতে কাজ করা নারীদের সঙ্গে ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শণ করা হয় না- প্রশ্নে ভুক্তভোগী ইষ্টি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এক কথায় উত্তর হচ্ছে ‘মানসিকতা’ যেটা শুরু থেকে বদলানো একপ্রকার অসম্ভব। যে বা যারা এসব কথা বলছে, তারা তাদের আশপাশে এসব দেখেই বেড়ে উঠেছে। এমন সব শব্দ উচ্চারণ করে আমাদের হয়রানি করা হয় যে কুঁকড়ে যেতে হয় লজ্জায় এবং সে সময় ওপাশ থেকে কখনও কখনও নারী কণ্ঠে আনন্দের হাসিও পাওয়া যায়। ফলে এটি অসুস্থ মানসিকতা যা এ সমাজের মধ্যেই তৈরি হয়েছে।

সামাজিক গবেষক আব্দুল্লাহ আল মামুন এর প্রধান কারণ হিসেবে বলেন, আমাদের সমাজে একজন ছেলে শিশু থেকে পুরুষ হয়ে ওঠার সময়, বিশেষত বয়ঃসন্ধির সময় থেকে নারীকে যৌন অনুসঙ্গের বাইরে কিছু ভাবার সুযোগ পায় না, এ বিষয়টাই দায়ী।

তিনি বলেন, এর ফলে একটি নির্দিষ্ট বয়সের পরিচিত অপরিচিত সব নারীকে সে সব আচরণের মধ্য দিয়ে তার ‘সিঙ্গেল ট্র্যাক’ ভাবনাতে নিয়ে আসে। ফলে সে সবসময় সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে।

তিনি আরও বলেন, আরেকটি ভ্রান্ত ধারণা অনেকে পোষণ করেন, তা হলো ফ্রন্ট ডেস্কে, কল সেন্টারে বা যে সব পেশায় নারীদের অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলতে বা কাজ করতে হয়, সেই নারীরা বোধ হয় সহজলভ্য। হয়তো ১০০ জনের মধ্যে ২ জন ইতিবাচক সাড়া দেবে বা দেয় কিন্তু এতে যে বাকি ৯৮ জনকে হ্যারাস করা হলো, তা তাদের বিবেচনায় থাকে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, এটা নারীর প্রতি পুরুষের মানসিকতা দৃষ্টিভঙ্গিগত অসততার ফসল। তিনি বলেন, নারী সমাজের দুর্বল অংশ ভেবে নিয়ে তাকে যা বলা হবে নারী সেটাই শুনতে বাধ্য, এ ধরনের ধারণা পোষণ করা হয়। সে কারণে এ ধরনের সেবামূলক পেশায় যারা থাকেন তাদের ক্ষেত্রে অনেক বেশি ‘দুঃসাহস’ দেখিয়ে দেয়। আর যেহেতু কাস্টমারের কথা ভেবে অভিযোগ করা বা এটা বেশিদূর নিয়ে যেতে মোবাইল কোম্পানিগুলো আগ্রহী হয়নি কখনও, ফলে এর প্রবণতা বেড়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ড. কাবেরী গায়েন বলেন, পৃথিবীতে যেসব কাজে মেয়েদের অংশগ্রহণ বেশি, সেই কাজই তুচ্ছ, ঠুনকো, কম সম্মানের বলে প্রচলিত। কল সেন্টারের কাজে তেমন টাকা-পয়সা নেই, শ্রবণশক্তি এবং শ্বাসের ওপর চাপ পড়ে। কাজেই এমনিতেই এই কাজ ‘দামি’ নয়। সেই অ-দামি কাজ যখন কোনও মেয়ে করেন, তখন ভোক্তা ধরেই নেন, এই মেয়ের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। এর সঙ্গে একটু ‘অন্যরকম’ ব্যবহার বোধহয় করাই যায়।

কাবেরী গায়েন আরও বলেন, কল সেন্টারগুলোর মালিকদের মধ্যে নারীদের বসানোর প্রবণতা কেন সেটা পরিষ্কার। তাদের লক্ষ্যই থাকে নারীকণ্ঠের সেবার মাধ্যমে পুরুষ ভোক্তাকে আকর্ষণ করার। ধরুন, কাজটিকে বলাই হয় সেবা। দ্বিতীয়ত, নারীর সেবা। তাই সেবা ক্রয়কারী মনে করেন, সেবা প্রদানকারীর সঙ্গে ইচ্ছামতো ব্যবহার করা যায়।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি ২৯ মে ২০১৬

Related posts