November 20, 2018

কালীগঞ্জে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে দায়িত্ব নিয়েছেন নারীরাই!

নিরাপদ খাবার উৎপাদনে দায়িত্ব নিয়েছেন নারীরাই

শিপলু জামান ঝিনাইদহঃ বলাকান্দর গ্রামের ফাতেমা, মোস্তবাপুর গ্রামের মনোয়ারা, রাজিয়া,দাপনা গ্রামের রেবেকা, শাহানাজ, মল্লিকপুর গ্রামের মাহমুদা, বলরামপুর গ্রামের মাজেদার মতো গ্রামের প্রায় সবার বাড়িতে হাউজ। কোনটি পাকা, কোনটি মাটির তৈরি চাড়ি। মাটির তৈরি মাদা আর মাটির গর্তে কেঁচো আর কেঁচো। প্রকৃতির লাঙল হিসেবে পরিচিত ফেলনা কেঁচো এখন গ্রামের মানুষের আয়ের প্রধান উৎস। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতপুর ইউনিয়নের ১২টি ও রায়গ্রা ইউনিয়নের ১টি গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে একই চিত্র। বাড়ির গৃহিনীরা পারিবারিক কাজে পাশাপাশি কেচো চাষ করছে। কারো রান্নাঘর, সোবার ঘর, গোয়াল ঘর, বারান্দা,ঘরের আঙিনায় সাজানো রয়েছে চাড়ি । প্রতিটি চাড়িতে রয়েছে কেচো আর কম্পোষ্ট সার। একজন নারী কেচো চাষী এবং প্রশিক্ষক হিসেবে গড়ে উঠেছে। নিজেদের গ্রামের অন্য মেয়েদের কেচো চাষী হিসেবে আত্মনির্ভরশীল করতে তারা আয়োজন করছে কেচো কম্পোষ্ট প্রশিক্ষণ।

আর এই প্রশিক্ষণ ও আর্থিকসহ সার্বিক সহযোগিতা করছে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড।
সরেজমিন কালীগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতপুর ইউনিয়নের বলাকান্দর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, চাপরাইল কলেজে বলাকাদন্দর,আড়–য়াশলুয়া , চাপরাইল ও নগর চাপরাইল গ্রামের ২৫জন নারী হাতে কলমে কেচো চাষের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। আর তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে দুইজন সফল কেচো ও কম্পোষ্ট চাষী ফাতেমা খাতুন ও মনোয়ারা বেগম। অংশগ্রহণকারীদের আশা তারা সফল কেচো ও কম্পোষ্ট চাষী হবে। তাদেরই মতো মোস্তবাপুর ও অনুপমপুর গ্রামের ২০জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে রাজিয়া ও রেবেকা, নিয়ামতপুর ও মহিষাডেরা গ্রামের ২০জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে সুখজান বেগম ও আছিরন। বলরামপুর ও ভোলপাড়া গ্রামের ২৫জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন নিলিমা। আগমুন্দিয়া, হাজিপুর, বুজরুকমুন্দিয়া, দুলালমুন্দিয়া, খামারমুন্দিয়া গ্রামের ৪০জন এবং দাপনা ও মহেশপুর চাদা গ্রামের ২০জনকে মহিলাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন মনোয়ারা ও রাজিয়া।

কেচো ও কম্পোষ্ট প্রশিক্ষক মনোয়ারা বেগম ও রাজিয়া জানান, তারা এর আগে জৈব চাষ প্রশিক্ষণ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কেচো ও কম্পোষ্ট তৈরি শুরু করেন। বর্তমানে নিয়ামতপুর ইউনিয়নের দাপনা গ্রামের ৬০জন, মস্তোপুর গ্রামের ৩০জন, বলাকান্দর গ্রামের ২০জন, মল্লিকপুর গ্রামের ১৫জন, অনুপমপুর গ্রামের ২০জন, নিয়ামতপুর গ্রামে ২০জন, বলরামপুর গ্রামের ২৫জন, পূর্ব বলরাপুর গ্রামের ১৫জন, ভোলপাড়া গ্রামের ১৫জন,হরিগোবিন্দপুর গ্রামের ২০জন,মহেশ্বরচাদা গ্রামের ২০জনসহ এই ইউনিয়নে প্রায় ২শ৫০ জন নারী কেচো চাষ ও কম্পোষ্ট উৎপাদনের সাথে জড়িত। আগামীতে এই ইউনিয়নের শতভাগ নারী কেচো চাষ ও কম্পোষ্ট উৎপাদনের সাথে জড়িত হোক এটাই তাদের উদ্দেশ্য।

কেচো চাষী রেবেকা জানান,গত এক বছরে তিনি নিজে ১ লাখ সহ দাপনা গ্রামের অন্য নারীরা প্রায় ৪ লক্ষ টাকার কেচো ও প্রায় ৩ লক্ষ টাকার কম্পোষ্ট সার বিক্রি করেছেন। ১ কেজি কেচো ১৫০০ থেকে ২হাজার টাকা দরে এবং এক কেজি কম্পোষ্ট সার ১০ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি করেন। কেচো চাষ ও কম্পোস্ট সার উৎপাদন ্ কেটি লাভজনক ব্যবসা। বাড়ির কাজের পাশাপাশি এই কাজটি করা হয়।

নিয়ামতপুর ইউনিয়ন জৈব চাষী সমিতির সভাপতি নুরুল ইসলাম জানান, কেচো চাষ ও কম্পোষ্ট উৎপাদন একটি লাভজনক ব্যবসা। এর জন্য বেশি সময় ও জায়গা নষ্ট হয়না। একজন নারী বাড়ির অন্য কাজ শেষ করে অবসর সময়ে কেচো চাষ করতে পারেন। বর্তমানে কালীগঞ্জে কেচো ও কম্পোষ্ট সার দেশের বিভিন্ন স্থানের ব্যবসায়ী ও চাষীরা ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছেন।

হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডের জৈব চাষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রোগ্রাম অফিসার এস এম শাহীন হোসেন জানান, আমরা জানি, অতীতে কৃষি ছিল নারীর হাতে; এতে সমৃদ্ধি ছিল, ছিল সুখাদ্যে সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা। মানুষ রোগ-শোকে ভুগেছে কম, নিরাপদ ছিল প্রকৃতি ও পরিবেশ। দিন বদলের সাথে সাথে বদলেছে কৃষি ব্যবস্থাপনা, কোম্পানীগুলো দেখিয়েছে কম পরিশ্রমে অধিক লাভের লোভ। কিন্তু কথায় আছে অতি লোভে তাতী নষ্ট। ক্রমান্বয়ে নষ্ট হয়েছে জমি, খাদ্য হয়েছে অনিরাপদ, মানুষ মরছে অগ্যাত রোগে। নারীগণ ফিরিয়ে আনতে চান প্রাকৃতিক কৃষি ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ব নিয়েছেন নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের। শুধু নিজেরা এগিয়ে গেলেই লক্ষ্য অর্জন সফল হবে না, তাই একই দলে আনতে চান গ্রামের সকল নারীদের। এই লক্ষ্যেই প্রশিক্ষিত করছেন অন্য নারীদের। অগ্রসর চিন্তার অধিকারী এই নারীদের স্বপ্ন একদিন সফল হবেই, সোনার বাংলা ভরে উঠবে সোনালী ফসলে- যা হবে নিরাপদ এবং প্রকৃতিকে করবে ছন্দময়।

জয়তু উদ্যোগী নারীগণ, জয় হোক। শাহিন হোসেন জানান, মহিলাদের হাতে কলমে প্রশিক্ষণ,তাদের আর্থিক সহযোগিতা,তাদের উৎপাদিত কেচো ও কম্পোষ্ট সার বিক্রি করার জন্য সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। নিয়ামতপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাজেদুল হক লিটন জানান, তিনি গর্বিত তার ইউনিয়নের নারীদের নিয়ে। তারা কেউ বসে থাকে না। পারিবারিক কাজ শেষ করে অতিরিক্ত আয়ের জন্য ঘরে ঘরে কেচো চাষ হচ্ছে। খুবই শ্রীঘ্রই তার ইউনিয়ন বাংলাদেশের জন্য মডেল হবে।

কালীগঞ্জ্ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনোয়ার হোসেন মোল্লা জানান, আমি নিযে বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখেছি। কালীগঞ্জে যে সব নারীরা কেচো ও কম্পোষ্ট সার উৎপাদসন করছে তাদের যদি কোন প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহযোগিতার দরকার হয় তাহলে আমাকে জানালে সার্বিক সহযোগিতা করবো। তিনি আরো জানান, কেউ যদি বড় আকারে কম্পোস্ট প¬ান্ট তৈরি করতে ব্যাংক ঋণ সহযোগিতা দরকার হয় তাহলে আমাকে জানালে সেই ব্যাংকে আমি কথা বলবো ।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts