September 22, 2018

কামরূপ কামাখ্যায় একদিনে যা দেখলাম………

সুমন্ত গুপ্ত:: কথিত আছে, জাদুবিদ্যার তীর্থস্থান হলো কামরূপ কামাখ্যা। কামাখ্যা মন্দির হলো ভারতের আসাম রাজ্যের গৌহাটি শহরের পশ্চিমাংশে নীলাচল পর্বতে অবস্থিত হিন্দু দেবী কামাখ্যার একটি মন্দির।

মন্দির চত্বরে দশমহাবিদ্যার মন্দিরও আছে। এই মন্দিরগুলোতে দশমহাবিদ্যা অর্থাৎ ভুবনেশ্বরী, বগলামুখী, ছিন্নমস্তা, ত্রিপুরাসুন্দরী, তারা, কালী, ভৈরবী, ধূমাবতী, মাতঙ্গী ও কমলা_ এই দশ দেবীর মন্দিরও রয়েছে। এর মধ্যে ত্রিপুরাসুন্দরী, মাতঙ্গী ও কমলা প্রধান মন্দিরে পূজিত হন। হিন্দুদের, বিশেষত তন্ত্রসাধকদের কাছে এই মন্দির একটি পবিত্র তীর্থ। আমাদের চার চাকার বাহন জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার , টিলাগড় পেড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তামাবিল বর্ডারের দিকে। আমরা দেখতে দেখতে এসে পেঁৗছলাম জৈন্তা বাজারে। সেখানে প্রবেশের পর থেকেই পরিবেশটা কেমন যেন পরিবর্তন হয়ে গেল। কেমন যেন একটা ঠাণ্ডা আবহাওয়া। রাস্তার ডানপাশে উঁচু উঁচু পাহাড় থেকে অঝোর ধারায় ঝরনার জল সমতলে ভূমিতে এসে পতিত হচ্ছে। অসাধারণ সে দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। আমরা রওনা দিলাম শিলংয়ের দিকে। এক পাশে খাদ আর এক পাশে পাহাড়; মাঝে মাঝে মেঘের আনাগোনা। আমরা প্রায় ৩টার দিকে শিলং এসে পেঁৗছলাম। এরপর আমাদের মূল গন্তব্য আসামের রাজধানী গৌহাটি।
আমরা কামাখ্যা মন্দিরের গেটে এসে পেঁৗছলাম। বেশ সুন্দর স্থাপত্যশৈলী। কামাখ্যা গেট থেকে মন্দিরের কাছে যেতে সময় লাগল প্রায় পাঁচ মিনিট। আঁকাবাঁকা চড়াই পথ ধরে উপরে ওঠার সময় গৌহাটি শহরকে দেখতে পেলাম। দেখলাম, মন্দির-সংলগ্ন এলাকাটি বহু মানুষের উপস্থিতিতে সরগরম। গাড়ি থেকে নেমে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করলাম। অভিনব স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি কামাখ্যা মন্দিরগুচ্ছকে ঘিরে আছে সুন্দরভাবে বাঁধানো চাতাল। মন্দিরগাত্রে শোভা পাচ্ছে দেবদেবী এবং নারী-পুরুষের মূর্তি। মন্দির পরিসরে বেশিরভাগ পাণ্ডা ব্যস্ত তাদের যজমানদের নিয়ে। বাকিরা ছোট ছোট দলে ছড়িয়ে থেকে দিব্যি আড্ডা দিচ্ছে। কামাখ্যার পাণ্ডাদের পরনে লাল বসন, গলায় একাধিক রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে বড় লাল টিপ। গাড়িতে থাকাকালীন আমাদের সুনীলদা বললেন গাড়িতে জুতা, ক্যামেরা, মানিব্যাগ রেখে যাওয়ার জন্য। বলে রাখা ভালো, মন্দিরের ভেতরে আপনি ক্যামেরা নিয়ে ঢুকতে পারবেন না। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ৫০০ টাকার টিকিটের লাইন কোনটা। আমি আগে থেকে শুনেছিলাম যে, সেখানে ৫০১ টাকার আর ১০১ টাকার টিকিটের লাইন আছে। দাদা বললেন, আগে ছিল কিন্তু নতুন সরকার আসার পর এই টিকিটের নিয়ম বন্ধ করে দিয়েছে। সবাইকে এখন একই লাইন ধরে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। আর পাণ্ডাদের ছাড়া বুঝি পূজা দেওয়া যায় না; তাই আমরা গাড়ি থেকে নেমে একজন পাণ্ডা ঠিক করলাম। বেশ বয়স্ক। প্রথমে নাম বলল জগদীশ। তাকে কিছু টাকা দিলাম পূজার দ্রব্যাদি কেনার জন্য। সে আমাদের এগিয়ে নিয়ে চলল। প্রথমে আমরা একটি লোহার ব্রিজ পেরিয়ে মন্দিরের দিকে ধাবিত হলাম। জগদীশ পাণ্ডে মন্দির সংলগ্ন সৌভাগ্যেকুণ্ডে গিয়ে কুণ্ডের জল আমার গায়ে ছিটিয়ে দিল; আর কী জানি মন্ত্র পড়ল। একদিকে কুণ্ডের জলে সবাই সিক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে ডান পাশে অবস্থিত গণেশের মূর্তিতে পুজো দিচ্ছে। আগরবাতির গন্ধে মন ভরে উঠল আমাদের। এবারে আমরা মূল গর্ভগৃহে প্রবেশের লাইনে দাঁড়ালাম। অনেক মানুষ লাইনে দাঁড়িয়েছে। আমরাও দাঁড়ালাম। সবার হাতে পুজো দেওয়ার দ্রব্যদি। আমার হঠাৎ মনে হলো, আমাদের জগদীশ পাণ্ডে কোথায় গেল! তার দেখা তো মিলছে না। তার মোবাইলে ফোন দিচ্ছি কিন্তু মোবাইল ধরছে না। এত বড় লাইন কখন যে শেষ হবে তা-ই ভাবছিলাম। আর এদিকে আমাদের জগদীশ পাণ্ডে উধাও। মনের মাঝে আজেবাজে চিন্তা এসে ঘুরপাক খেতে লাগল। এর মাঝে দেখা মিলল আমাদের জগদীশ পাণ্ডের। জগদীশ পাণ্ডের হাত ধরে এবার মন্দির অভ্যন্তরে প্রবেশ করলাম। ভেতরে ঢোকামাত্র এক অদ্ভুত পরিবেশের মধ্যে গিয়ে পড়লাম। ধূপের গন্ধ, ফুলের সৌরভ, নিবে যাওয়া মোমবাতি এবং প্রদীপের গন্ধ, ভক্তদের দেবী বন্দনা, পাণ্ডাদের মন্ত্রপাঠ, দলবিচ্ছিন্ন মানুষের ডাকাডাকি, চেঁচামেচি_ সব মিলিয়ে মনে হয় এ যেন সম্পূর্ণ এক অন্য জগৎ। মূল গর্ভগৃহ অন্ধকার। শুধু প্রদীপের আলোয় আলোকিত কিছুটা। খুব কম সময়ই পাওয়া যায় অবস্থানের জন্য। আমরা দেবী দর্শন করে বাইরে বের হলাম। জগদীশ পাণ্ডে এ মন্দির সম্পর্কে জানাল, প্রাকৃতিক এক রহস্যময় গুহাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এই কামরূপ কামাখ্যা মন্দির। ওই যে দেখুন, সিংহাসনে আসীন অষ্টধাতুর কামাখ্যা দেবীর বিগ্রহ। একসময় এ জায়গায় কেউ গেলে আর ফিরে আসত না। হাজার বছরের রহস্যময় স্থান কামরূপ কামাখ্যা। এখনও জাদুবিদ্যা সাধনার জন্য বেছে নেওয়া হয় কামাখ্যা মন্দিরকেই। কামরূপ কামাখ্যার আশপাশের অরণ্য আর নির্জন পথে নাকি ঘুরে বেড়ায় ভালো-মন্দ আত্মারা। ছোট্ট দুটি শব্দ। ‘কামরূপ কামাখ্যা’। আর এ দুটি শব্দের মধ্যেই লুকানো তাবৎ রহস্য, রোমাঞ্চ আর গল্পগাথা। কামাখ্যা মন্দিরে চারটি কক্ষ আছে: গর্ভগৃহ ও তিনটি মণ্ডপ (যেগুলোর স্থানীয় নাম চলন্ত, পঞ্চরত্ন ও নাটমন্দির)। গর্ভগৃহটি পঞ্চরথ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। অন্যগুলোর স্থাপত্য তেজপুরের সূর্যমন্দিরের সমতুল্য। এগুলোতে খাজুরাহো বা অন্যান্য মধ্যভারতীয় মন্দিরের আদলে নির্মিত খোদাই চিত্র দেখা যায়। জগদীশ পাণ্ডেকে বললাম, এবার মন্দিরের বাইরে কোথাও গিয়ে বসি। মন্দিরের বাইরে এলাম; আমরা হেঁটে পূর্ব দিকে এগিয়ে চললাম। আমরা ব্রহ্মপুত্রের তীরে গিয়ে বসি। হেঁটেই চলছি, দেখি প্রতিটি বাঁকেই দৃশ্যপটের পরিবর্তন ঘটছে। পাহাড়ের ওপর থেকে ব্রহ্মপুত্রের প্রবহমান পথ, নদী-তীরবর্তী বিভিন্ন ঘাট এবং গৌহাটি শহরের অনেকটা অংশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আমরা একটা আশ্রমে ঢুকতেই দেখি, কয়েকজন পাণ্ডা বসে গল্প করছে। এক সন্ন্যাসী বসে আছে ‘সাপ’ নিয়ে। বিরাট এক কালনাগিনী দেখে তো ভয়ে আঁতকে উঠলাম। জগদীশ পাণ্ডে আমাকে কাছে টেনে বুকে জড়িয়ে বলল, সাপ দেখে ভয় পাচ্ছেন কেন? আমরা তো সাপ নিয়ে খেলাধুলা করি। জগদীশ পাণ্ডে বলল, চলুন শ্মশানঘাটের পরে এক জঙ্গল রয়েছে_ এ জায়গায় গেলে কামরূপ কামাখ্যা সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবেন। ওখানেই তো জাদুটোনা হয়। আর এ জন্যই তো এই কামরূপ কামাখ্যাকে বলা হয় জাদুটোনার দেশ।
উৎসঃ সমকাল

Related posts