November 20, 2018

কান ফেস্টিভ্যাল আসলে কি? ফ্যাশন শো নাকি চলচ্চিত্র উৎসব ?

kan

রেড কার্পেট পেরলে তবে আসল উৎসবের আঙিনা। অথচ বলিউড যেন বুঁদ হয়ে আছে ওই রেড কার্পেটেই। যেন চলচ্চিত্র উৎসবটা কিছু নয়। গাউনের বাহারটাই সবকিছু। অন্তত এ বছরের কান চলচ্চিত্র উৎসব যেন ঐশ্বরিয়া-দীপিকা-সোনমদের পোশাক পরিদর্শনেই সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই কি হওয়ার কথা ছিল? পোশাকের পরিধি ছাপিয়ে ইতিমধ্যেই উঠতে শুরু করেছে সে প্রশ্ন। এই সেদিনও কান চলচ্চিত্র উৎসব ভারতীয় সিনেমার কাছেও ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ আসর। একের পর এক ছবি সেখানে গিয়েছে। প্রদর্শিত হয়েছে। প্রশংসা কুড়িয়েছে। কিন্তু সে দিন অতীত। অনেকটা শাবানা আজমির পোস্ট করা ছবিটির মতোই। কান যখন ভারতীয়দের কাছে গাউন বাহারের সমার্থক হয়ে উঠেছে, তখন ছিয়াত্তরের অতীতকে ফিরিয়ে এনেছেন শাবানা। সাদামাটা শাড়ি পরেই দাঁড়িয়ে আছেন শাবানা, স্মিতা ও শ্যাম বেনেগাল।

১৯৭৬ সালে নিশান্ত পেয়েছিল নমিনেশন। সেদিন পোশাকটা তাঁদের কাছে বড় ছিল না। ছিল সিনেমাটাই। সাদা-কালো হলেও এ ছবি তাই ভারতীয় সিনেপ্রমীদের মনে অনেকটা রং ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। যে রং গৌরব ও ঐতিহ্যের। কিন্তু বদলে যে রংবেরঙের পোশাকের ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, তা যেন অনেকাংশেই সাদাকালো। কেননা তা মনে করিয়ে দিচ্ছে, ভারতের পোশাক আছে, দেখানোর মতো সিনেমা নেই। তথ্যের আধিপত্যে চলা এ দুনিয়ায় এ বছরের কান চলচ্চিত্র উৎসবে ভারতের ভূমিকা খুঁজলে উঠে আসছে, কয়েকটা গাউনের চোখ ধাঁধানো জৌলুসই। ছবিটা অবশ্য শুধু এ বছরের নয়। দৈন্যের এ ছবি বেশ কয়েক বছরেরই। প্রতিবছরের মতো এবারও কান-এ কোনো ভারতীয় ছবি প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়নি। গত এক দশকে মোটে হাতে গোনা তিনটে ছবিই কান এর প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। উড়ান, তিতলি ও মশানই একমাত্র মুখরক্ষা এই ১০ বছরে। বাকি যা ছবি প্রদর্শিত হয়েছে তা কোনো এলেমদার প্রযোজক থিয়েটার ভাড়া করে প্রদর্শন করেছেন মাত্র।

এদিকে ভারতের তরফে সিনেমাকে প্রমোট করার প্যাভিলিয়ন আছে বটে। কিন্তু তার কার্যকরিতা কোথায়, যখন সিনেমাই নেই! বদলে ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনের গাউনই ভারতীয় খবরের বাজারকে ছেয়ে রেখেছে। অথচ ঐশ্বরিয়া নিজে প্রথম কানে যান তাঁর দেবদাস ছবির প্রদর্শন উপলক্ষেই। ২০০২ এর সেই প্রথম যাত্রার পরেরবার যান লরিয়েলের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার হিসেবে। জুরি হিসেবেও কানে উপস্থিত থেকেছেন তিনি। তারপর থেকে প্রতি কানেই তাঁর ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তাতে ভারতীয় সিনেমা কতটা উজ্জ্বল হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে। এবং সে প্রশ্নও উঠছে। নেটদুনিয়ায় ইতিমধ্যেই ছড়াছড়ি ব্যঙ্গ-রসিকতার। সাফ কথা, কান কি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল না ফ্যাশন শো? কেন বলিউড সিনেমাকে ছেড়ে স্রেফ পোশাকেই শাক দিয়ে মাছ ঢাকা দিতে গেল! সমস্যার মূল যে অনেক গভীরে প্রোথিত তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বলিউড ব্যবসা করে।

একসময় পরিচালক বেদব্রত পাইন বলেছিলেন, নাচ-গান-গল্প মিলিয়ে বলিউড একটি শো করে। সিনেমা নয়। সে কথা যে কতটা সত্যি তা বারেবারে প্রমাণিত হচ্ছে। বলিউডের ব্যবসাকেও তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছে আঞ্চলিক ইন্ডাস্ট্রি। ফিলহাল ‘বাহুবলি’ই তা প্রমাণ দিচ্ছে। সঠিক ভাবনা, পরিকল্পনা, সিনেমা প্রযোজনা কোনোটারই কোনো দিশা নেই। ফলে কোথায় সেই সিনেমা যা কান এ দেখানো হতে পারে? সেই অক্ষমতাই ঢাকা পড়ছে গাউনের বহরে। অথচ চারের দশক থেকে সাতের বা আটের দশকেও ভারতীয় সিনেমা কান এ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রদর্শিত হয়েছে। প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও জিতেছে। ১৯৪৬ এ চেতন আনন্দের নিচা নগর পুরস্কৃত হয়েছিল। বিমল রায়ের দো বিঘা জমিন (১৯৫৪), সত্যজিত রায়ের পথের পাঁচালী ও (১৯৫৬) ছিনিয়ে এনেছিল পুরস্কার।

সাত ও আটের দশকেও ভারতীয় সিনেমা কান এ গুরুত্বের জায়গা নিয়ে ছিল। কিন্তু সে দিন যে ফিকে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দোষ গাউনের নয়। যে অভিনেত্রীরা গাউন পরে রেড কার্পেট মাতাচ্ছেন তাঁদের তো নয়ই। প্রশ্ন, হল ভারতীয় সিনেমা কি পথ হারিয়েছে! নচেত কেন পোশাকের বাহার খবরের শিরোনামে? কেন এক দশকে কোনো সিনেমা সে খবর হয়ে উঠতে পারল না কান এ? নেটদুনিয়ায় ব্যঙ্গের হররা সরিয়ে রাখলে যে প্রশ্নটুকু উঠে আসে তা যে কোনোভাবেই অবহেলার নয়, তা ভারতীয় সিনেমা যত শিগগিরি বুঝবে ততই যে মঙ্গল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সুত্র – কালের কণ্ঠ

Related posts