November 16, 2018

‘কান্দিস না বাজান, ঐ দ্যাখ আইতাচে রিলিপের নৌকা’

ঢাকাঃ জামালপুরের ইসলামপুর, যমুনা নদীর চরে গড়ে উঠা কিছু গ্রাম । চারিদিকে পানি, মাঝখানে দ্বীপের মতো গড়ে উঠা অনেকগুলো টিন, ছন আর মাটির ঘর। মানুষগুলো অর্ধনগ্ন । বন্যায় ভেসে গেছে কিংবা নদী ভাঙনের তোড়েও হারিয়ে গেছে অনেকের বাড়ি।

ওদের থাকার কোনো জায়গা নেই, খাওয়ার জন্য খাবার নেই , পরার জন্য কোনো কাপড় নেই । ইচ্ছেকুঁড়ি ফাউণ্ডেশনের পক্ষ থেকে আমরা যখন ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে নৌকায় করে ওখানে গেলাম, দূর থেকে আমাদের দেখেই নদীর পাড়ে পানির কুল ঘেঁষে কয়েক শ মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে । কেউবা দূর থেকে নৌকায় করে, কেউ পানি সাঁতরে, কেউবা বুক সমান পানির মধ্যে হেঁটে হেঁটে ।

কয়েক মূহূর্তের মধ্যেই, কোনো ঘোষণা ছাড়াই । শিশু, যুবক, মধ্যবয়স্ক, পঞ্চাশোর্ধ বৃদ্ধ। বয়স ভিন্ন হলেও, ওদের সবার চোখেই একই ক্ষুধা। খাবার চায় ওরা, বাঁচতে চায়। ওদের দৃষ্টি আমাদের নৌকায় ত্রাণের বস্তার দিকে। পঞ্চাশোর্ধ এক বৃদ্ধ লাঠিতে ভর দিয়ে এসেছিলেন। কান্না করে দিলেন তিনি, ” বাবা, আমাগো কেউ দ্যাহে না, খাওন নাই, তুফানে তো সব নিলো গা । পালের গরু বাছুর গ্যালো বানে ঘর গ্যালো, ক্যামনে বাঁচমু ! আমাগো বাঁচাইন বাজানরা…”

ওদের আহাজারি সহ্য করার মতো নয় , কিংবা আমরা করতে পারিনি। মানুষ কতটা অসহায়, জীবন কতটা বিপন্ন সেটা ওদের না দেখলে অনেকেই বুঝবে না। ওদেরকে লাইনে বসিয়ে খাবারের প্যাকেটগুলো যখন দিচ্ছিলাম, বিবর্ণ মুখগুলো কিছুক্ষণের জন্য ভরে গিয়েছিলো রোদের মতো হাসিতে , আর চোখে মুখে নির্মল কৃতজ্ঞতা। বয়সের বলিরেখা পড়া মানুষগুলোর হাসি দেখে আমাদের চোখে পানি আসছিলো কেন জানি। টিনের চর গ্রামে খাবারের প্যাকেটগুলো দিয়ে যখন আমাদের নৌকা ফিরছিলো , তখন চরের সবগুলো মানুষ হাত নেড়ে আমাদেরকে বিদায় জানাচ্ছিলো, হাতে ছিলো ইচ্ছেকুঁড়ি ফাউণ্ডেশনের দেওয়া খাবারের প্যাকেট ।

দৃশ্যটা খুবই করুণ ছিলো । কতটুকু অসহায় হলে সামান্য কিছু খাবার পেয়ে মানুষ এত খুশি হতে পারে – তা বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয় ! মাথার উপর প্রচণ্ড রোদ । টিনের চর থেকে তারপর শিংভাঙ্গা চর, তারপর চিনাঢুলী চরে খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হলো ।

সব জায়গায় মানুষের উপচে পড়া ভিড়, খাবারের জন্য নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি, খাবার পেয়ে মুখে হাসি, না পেয়ে মন খারাপ – কিছু পরিচিত দৃশ্য । আমাদের সাহায্য খুব বেশি ছিলো না । এক কেজি চিড়া , হাফ কেজি মুড়ি, হাফ কেজি গুড় আর কয়েকটা খাবার স্যালাইনসহ একটা প্যাকেট।

সাতশত পরিবারকে দিয়েছি আমরা। অনেককে দিতে পারিনি । খাবারের প্যাকেট না পাওয়া মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিলো । একটু খাবারের জন্য ! আমরা জানি, এ খাবারে ওদের একদিনও যাবে না । আবার ওরা ক্ষুধার কষ্টে কাঁতরাবে, কিংবা ক্ষুধার কষ্টে মরেও যাবে কেউ । আর বাকিরা খাবারের জন্যে চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকবে। কখন আসবে রিলিফের নৌকো ! না আসলেও অসহায় মা হয়তো তার ক্ষুধার্ত সন্তানকে সান্ত্বনা দিবে দূরের কোনো নৌকো দেখিয়ে, ‘কান্দিস না বাজান, ঐ দ্যাখ আইতাচে রিলিপের নৌকা’ঢা.টা.

Related posts