September 25, 2018

কাজী অফিসঃ টাকা দিলে সবই মিলে

ঢাকাঃ  সাক্ষী, উকিল সবই রেডি। শুধু প্রয়োজন টাকার। জন্মসনদও তৈরি হয় টাকার বিনিময়ে। আর এভাবেই অপ্রাপ্ত বয়স্করা হয়ে যাচ্ছে বিবাহিত। বাল্যবিয়ে হয়ে যাচ্ছে বৈধ। রাজধানীর কাজী অফিস ঘিরে সক্রিয় একটি সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটই করে দিচ্ছে সব। তাদের কবলে পড়ে সর্বনাশ ঘটছে অনেক জীবনের। দু’সপ্তাহ আগের ঘটনা রহিমার বয়স চৌদ্দ কি পনের। আর শহিদের আঠার। প্রেমে দেওয়ানা দু’জন গার্মেন্ট শ্রমিক। একসঙ্গে কাজ করতে গিয়েছে অবুঝ মন সাড়া দেয় প্রেমে। এ প্রেম আর কতদিন। বিয়ে করতে হবে। সংসার করতে হবে। কিন্তু তাদের বিয়ের বয়স যে হয়নি। দুই সপ্তাহ আগে একদিন দুজনে একে অপরের হাত ধরে বেরিয়ে পড়ে। বিয়ে তাদের করতেই হবে। সাভারের কর্মস্থল থেকে সরাসরি তেজতুরি বাজার কাজী অফিস। কিন্তু বাদ সাধে তাদের বয়স। এখন কি করা? তাহলে কি বিয়ে হবে না? এভাবেই ফিরে যেতে হবে তাদের। রাজ্যের ভাবনা তাদের মনে। প্রেমের পরিণতি দিতে হলে বিয়ে করতেই হবে।

আকুতি মিনতি করতে থাকে কাজীর সহকারী মোহাম্মদ শামীম হাসানের কাছে। সিন্ডিকেটের সদস্যরাও নড়েচড়ে বসে। তাদের জানানো হয় দুজনের জন্মসনদ তৈরিতে লাগবে ছয়শ টাকা করে ১২০০টাকা। এ জন্য একদিন সময় দিতে হবে। পরদিন তাদের এ সনদের ওপর ভিত্তি করে দেয়া হবে বিয়ে। কিন্তু কিভাবে জন্মসনদ আনা হয়? সিন্ডিকেটের এক সদস্য সারোয়ার জানায়, এটা কোনো ব্যাপারই না। সিটি করপোরেশনের লোকজনের সঙ্গে চেনাজানা রয়েছে তাদের। তারাই সব করে দেয়।

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী শাবালক ছেলেমেয়ে স্বেচ্ছায় বিয়ে করতে পারবে। এক্ষেত্রে মেয়েদের বয়স ন্যূনতম ১৮ এবং ছেলেদের ২১ বছর হতে হবে। আর এ আইনের কারণেই রহিমা আর শহিদ চিন্তিত হয়ে পড়ে। এ চিন্তা তাদের বেশিক্ষণ করতে হয়নি। কাজীর সহকারী আর সিন্ডিকেটের সদস্যরা তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে ফেলে। টাকাও নিয়ে নেয়। জন্মসনদ হাতে পেলে বিয়েতে আর কোনো সমস্যা নেই। বিয়ের জন্য সাক্ষী ও উকিলও তৈরি। কাজীর সহকারী শামীম বলেন, মিষ্টি নিয়ে এলে আশপাশের দোকানের মানুষ এসে সাক্ষী দেয়। আবার কেউ উকিল বাবা হয়। প্রতি মাসে গড়ে ২০টি বিয়ে হলে এর মধ্যে ১৫টিই হয় কাজী অফিসে। বাকিগুলো হয় পারিবারিকভাবে।

অন্যদিকে বিজ্ঞাপন দিয়ে কাজী অফিসগুলো ডাকছে এমন জুটিকে। সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের সাদা দেয়ালে লাল হরফে লেখা একটি বিজ্ঞাপন। কাজী অফিস। সঙ্গে লেখা মোবাইল নম্বর। পার্কের এপাশ থেকে ওপাশ ঘুরে দেখা গেছে এরকম প্রায় ২০টি জায়গায় কাজীর মোবাইল ফোন নম্বর লাল কিংবা কালো কালিতে লেখা। কোথাও কোথাও দেখা মিলল কাজীর নামও। কাজী হাসান। কোথাও বা লেখা হাসান হুজুর। অবশ্য চারুকলার বিপরীত দিক দিয়ে ঢুকলে মিলবে অন্য এক কাজী অফিসের নম্বর। রমনা পার্কের কোথাও এই বিজ্ঞপ্তি নেই। তবে, রমনা পার্কের ভেতর থেকে তাকালে শেরাটন হোটেল ও টেনিস স্টেডিয়ামের দেয়ালেও মিলবে কাজী হাসানকে। অপর এক কাজী মো. তাজুল ইসলামের ফোন নম্বরও পাওয়া যাবে সেখানে। পল্টন থেকে শুরু করে বিজয়নগর এলাকায়ও তার বিজ্ঞাপন। বিয়ে করতে আগ্রহী তরুণের পরিচয়ে ফোন করা হলে কাজী হাসান জানান, জন্মসনদ নিয়ে তার দপ্তরে হাজির হয়ে যেতে। জানানো হলো- বয়স কম। তিনি বললেন, না। তাহলে বিয়ে সম্পন্ন হবে না।

মোবাইল ফোন নম্বরের সূত্র ধরে কাজী সাহেবের অফিসে গিয়ে জানা গেল, কাজী হাসানসহ চারজন কাজী বসেন একই অফিসে। বিজয়নগর এলাকায়। জানা গেল, কাজী হাসান হলেন আওয়ামী ওলামা লীগের সেক্রেটারি মাওলানা মো. আবুল হাসান শেখ শরীয়তপুরী। কাজী পেশার পাশাপাশি তিনি রাজনীতিতে সক্রিয়। সচিবালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরেও তার রয়েছে যোগাযোগ। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পার্কে এমন বিজ্ঞাপন কেন দিয়েছেন জানতে চাইলে জানালেন, অবক্ষয় থেকে রক্ষার জন্য। কাজী অফিসের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানুষ সহজে কাজী অফিসকে চিনতে পারবে। তারা এখানে বিয়েশাদির জন্য আসতে পারে। অনেকেই দেখা যায়, বিয়ে ছাড়াই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এর ফলে অনেক সময় বিয়েবহির্ভূত গর্ভধারণের মতো ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা ধর্মীয় দৃষ্টিতে ভুল। আর সামাজিকভাবেও বিশেষ করে মেয়েরা এতে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে।

সেক্ষেত্রে, বিজ্ঞাপন দেখে তারা যদি কাজী অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাহলে আমরা তাদের এসব বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারি। শিক্ষার্থীরা ছাড়াও, শিক্ষক ও অন্যান্য লোকেরাও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে আসতে পারে। এই কাজে তার লাভ কী প্রশ্নে বললেন, সরকারি নিয়মে বিয়েতে প্রতি লাখ টাকা মোহরানায় ১২৫০ টাকা কাজীকে দিতে হবে। এর বাইরেও যারা বিয়ের জন্য আসে তারা বকশিসও দেয়। এই কাজী আরো বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্কে অনেকেই যায়। প্রেম করে। প্রেম-ভালোবাসা তো আর একদিনে হয় না, অনেকে পাঁচ-ছয় বছর ধরে প্রেম করে। তাদের সামনে কাজী অফিসের ঠিকানা থাকলে তারা উদ্বুদ্ধ হতে পারে বিয়ের দিকে। পারিবারিক স্বীকৃতির বাইরে বিয়ের বিষয়ে তিনি জানালেন, অনেক সময় ছেলেমেয়েরা আসে। তারা প্রাপ্তবয়স্ক হলে আমরা তাদের বাধা দিতে পারি না। তবে, আমরা তাদের বলি মা-বাবাকে জানাতে।

কী পরিমাণ বিয়ে অনুষ্ঠান হয় জানতে চাইলে জানালেন, এখন খুব একটা হয় না। সাধারণত শুক্রবার বিয়ে বেশি থাকে। অনেক সময় একই দিনে তিন-চারটি বিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। আর সামনে ঈদ আসছে। ঈদের পরই ঢাকায় বিয়েশাদির মৌসুম শুরু হবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থানের জন্য প্রতি বছর বহু ছেলেমেয়ে ঢাকায় আসে। এদের মধ্যে অনেকেই পরিবারকে না জানিয়ে নিজেদের পছন্দমতো বিয়ে করে। এ কারণে কাজী অফিসে বিয়ের সংখ্যা বাড়ছে। তবে সব কাজী অফিসেই বিয়ের খরচ এক নয়। দেনমোহর হিসেবে লাখে ১২৫০ টাকা করে দিতে হয় সরকারী ফি। কিন্তু কাজীর ফি একেক জায়গায় একেক রকম। গুলশান কাজী অফিসে বিয়ে করলে এক খরচ। ধানমন্ডি কাজী অফিসে বিয়ে করলে আরেক খরচ। আবার উত্তরা কাজী অফিসে বিয়ে করলে ভিন্ন খরচ।

অভিভাবকদের উপস্থিতিতে বিয়ে হলে একরকম খরচ। অভিভাভক ছাড়া পাত্র-পাত্রী নিজেরা কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করলে আরেক রকম খরচ। টাকা নেয়ার ক্ষেত্রে কোনো নিয়মনীতি নেই কাজী অফিসগুলোর। গুলশান কাজী অফিসের কাজী আবদুল জলিল নিয়াজী বলেন, প্রতিদিনই কাজী অফিসে বিয়ে হচ্ছে। অভিভাবকের উপস্থিতিতে বিয়ে হলে সরকারি ফি আর কাজীর ফি দিতে হয়। অভিভাবক ছাড়া পাত্র- পাত্রী নিজেরা এসে কাজী অফিসে বিয়ে করলে বাড়তি পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে আদলতের হলফনামার জন্য। ধরেন কেউ যদি দেনমোহর করে ৫ লাখ টাকা তবে তার সরকারি ফিসহ খরচ পড়বে ১২ হাজার টাকা। এদিকে ধানমন্ডি কাজী অফিসে আদালতের হলফনামার জন্য নেয়া হয় আড়াই হাজার টাকা। ধানমন্ডি কাজী অফিসের কাজী মাসুম বিল্লাহ বলেন, বর-কনে নিজের মতে বিয়ে করলে তাদের দেনমোহর পাঁচ লাখ টাকা হলে আমাদের এখানে বিয়ে খরচ পড়বে নয় হাজার টাকা।

আর মিষ্টি খাওয়াতে যে কয় টাকা লাগে। অন্যদিকে উত্তরা কাজী অফিসে ছেলেমেয়ে নিজেরা বিয়ে করলে কোনো বাড়তি ফি দিতে হয় না। উত্তরা কাজী অফিসের সহকারী কাজী জসিম বলেন, বিয়ে হচ্ছে পবিত্র জিনিস। এ কারণে যারাই বিয়ে করতে আসে আমরা তাদের যতটা পারি সহযোগিতা করি। এখানে আদালতের হলফনামার জন্য কোনো ফি রাখা হয় না। জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের বার্ষিক হিসাব অনুযায়ী ২০১৩ সালে ঢাকা জেলায় বিয়ে হয়েছে ৩৪ হাজার ৩৭৯টি। ২০১৪ সালে ৩৪ হাজার ৪৯৭টি এবং ২০১৫ সালে ৩৫ হাজার ১০টি।মানবজমিন

Related posts