December 13, 2018

কমিটি আসছে বের হচ্ছেন তৈমূর ও শাহ আলম

703
রফিকুল ইসলাম রফিক,নারায়ণগঞ্জঃ  নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির কমিটি ঘোষণা করা হবে। আর সেজন্য আবারো তৎপর হয়ে উঠেছে বিএনপির নেতারা। নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারের ফেরারী নাটকের অবসান ঘটিয়েছেন তিনি নিজেই। রোববার রাতে তিনি রূপগঞ্জে একটি ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এর আগে শুক্রবার তার নিজ উদ্যোগে তার মাসদাইর বাড়িতে তার কথিত মজলুম মিলনায়তেন দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছেন। যেখানে তার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয় স্বজন সহ বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। যদিও এর আগে থেকেই তিনি রূপগঞ্জ বন্দর সোনারগাঁও ও শহরেও এসেছিলেন। কিন্তু রহস্যজনক কারনে তৈমুর আলম খন্দকার জেলা বিএনপি কার্যালয়ে দলের কর্মসূচিতে উপস্থিত হননি। যদিও তার চাটুকার বাহিনী তৈমুর আলম খন্দকার ছাড়াই বিএনপি কার্যালয়ে বেশকটি কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি করেছিলেন। যেখানে তৈমুর আলম মোবাইল ফোনে বক্তব্য রেখেছিলেন।

জানা গেছে, গত বছরের ৮ জানুয়ারী নিতাইগঞ্জ এলাকায় মিছিল বের করেছিলেন তৈমুর আলম খন্দকার। মিছিল থেকে গাড়ি ভাংচুরের ঘটনায় সদর মডেল থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি মামলায় তৈমুর আলম খন্দকারকে আসামী করা হয়েছিল। যদিও তিনি ওই বছর ৫ জানুয়ারী কর্মসূচি পালণ করেননি। ওই ঘটনার পর থেকে তৈমুর আলম খন্দকার আত্মগোপনে চলে যান। কয়েক মাস পর ঢাকায় সিটিকর্পোরেশন নির্বাচনে প্রকাশ্যে আসেন তৈমুর আলম। যদিও তিনি নিজেকে আত্মগোপনে দাবি করেছিলেন। আত্মগোপনে দাবি করে তিনি মিডিয়াতে লাদেনী কায়দায় বিবৃতি দিতেন। ধীরে ধীরে তিনি প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেন। এছাড়াও তিনি যে মামলায় আসামী রয়েছেন ওই মামলায় আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আব্দুল বারী ভুইয়া সহ সিনিয়র অনেক আইনজীবীও আসামী ছিলেন। কিন্তু আইনজীবীরা তার মামলা জামিন করানোর সকল প্রস্তুতি নিলেও তৈমুর আলম খন্দকার ইচ্ছো করেই জামিন আবেদন করেননি।

২০১৫ সালের শুরুটা ছিল বিএনপির জন্য আন্দোলনের একটি সূচনা পর্ব। পরের কয়েকমাস ধরে চলে টানা অবরোধ ও নাশকতা। বিএনপির বিধ্বংসী আন্দোলনে মাঠে ছিলেন না জেলা বিএনপির সহ সভাপতি শাহআলম ও তার অনুগামী সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাস। এ দুইজনের মধ্যে আজাদ বিশ্বাসকে দেখা মিলেছে আওয়ামী লীগের এমপিদের সঙ্গে। তবে একেবারেই নীরব ছিলেন শাহআলম। তবে গত কয়েকদিন ধরেই দেখা মিলছে শাহআলমকে। সামনে বিএনপির কমিটি গঠন করা হবে তাই জাগছেন সুবিধভোগী এ নেতা শাহআলম।

সহ সভাপতি মোহাম্মদ শাহআলম যিনি ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতিও বটে তাকে দীর্ঘদিন পর দেখা গেল একটি অনুষ্ঠানে। তাও প্রকাশ্যে। ঘরমুখো এ নেতাকে বিগত দিনে আন্দোলন সংগ্রামে না দেখা গেলেও এবার দেখা মিলছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানগুলোতে। কারণ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন স্থিতিশীল। আর এ কারণেই ঘরকোণো এ শিল্পপতি যিনি দলকেও ব্যবসার চোখে দেখছেন সেই নেতাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা মিলছে। তার সঙ্গে আসছেন অনুগামী নেতারাও।

সবশেষ গত ২৯ জানুয়ারী শুক্রবার ফতুল্লা থানার কুতুবপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ও শ্রমিক দল নেতা মন্টুর মেয়ের বিয়েতে মোহাম্মদ শাহআলমকে দেখা গেছে। অন্যদের মাঝে আরো উপস্থিত ছিলেন, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চেয়ারম্যান ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সাধারন সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাস, নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, সাবেক শ্রমিক দল সেক্রেটারী আবু আল ইউসুফ খান টিপু, কুতুবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি লুৎফর রহমান খোকা, সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের মোল্লা, সিনিয়র সহ সভাপতি পান্না মোল্লা সহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওরফে ব্যবসার খাতিরেই ফতুল্লায় আসতেন তখন। নয়তো ঢাকা কিংবা দেশের বাইরে কাটত বেশী সময়। ওয়ান ইলেভেন সময়কালে তার নাম শোনা যায় প্রথম। রাজনীতির ময়দানে নেমেই কিংস পার্টি খ্যাত কল্যাণ পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি কোষাধ্যক্ষ পদ বাগান। অবস্থা বেগতিক দেখে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দিয়ে নারায়ণগঞ্জ -৪ ( ফতুল্লা) আসনের টিকেট পেয়ে যান এক যাদুর চেরাগের মহীমায়। নির্বাচনের পরাজয় বরণ করলেও ওই দলের একাধিক পদ তার বগলদাবা হয় সেই চেরাগেই। এরপর কদাচিৎ দলীয় কর্মসূচীতে থাকতেন তিনি, তাও অনেক মহল ম্যানেজ করে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে তিনি একেবারে উধাও।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে গণসংযোগের সময় সাধারন মানুষের সাথে হাত মিলিয়ে পরক্ষনে টিস্যু পেপারে মুছতেন শাহ আলম। নেতাকর্মীদেরও কাছে টেনে নিতে পারেননি বিলাসবহুল জীবনে অভ্যস্ত এই খন্ডকালিন রাজনীতিক। ফলে ফতুল্লা বিএপির ভোটের ঘাঁটি হলেও আওয়ামীলীগের প্রার্থী চলচ্চিত্র নায়িকা বহিরাগত কবরীর কাছে হেরে যান তিনি। অবশ্য এ ভোটে তাকে হারানো হয়েছে বলে দাবি করতেন শাহ আলম।

এদিকে নির্বাচনে হারলেও বিএনপির একাধিক পদ তার কব্জায় আসে। ফতুল্লা থানা বিএনপির তৎকালিন সভাপতি অধ্যাপক খন্দকার মনিরুল ইসলামকে হটিয়ে তিনি নিজে সভাপতি হন। এ সময় তখনকার সাধারণ সম্পাদক মনিরুল আলম সেন্টু তাকে সহযোগীতা করেন। তবে সভাপতি হয়ে তিনি তাকেও সরিয়ে দেন। সাধারণ সম্পাদক পদে বসান তার চেয়েও বেশী কৌশলী কারো মতে সুবিধাবাদি আকা আজাদ বিশ্বাসকে। একই কায়দায় ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটিতেও তার পছন্দের লোক ও আত্মীয় স্বজনদের জায়গা করে দেয়া হয়। তার ছোট ভাই সাহিদুল আলমকে দেয়া হয় থানা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদ। ভায়রা মোস্তাফিজুর রহমান রুমী চৌধুরী, শশুর বাড়ির আত্মীয় কবীর প্রধানসহ অনেকেই বিনা বাঁধায় পেয়ে যান পদ।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতাদের কাছে শাহ আলমকে সোনার ডিম পাড়া হাঁস মনে করা হয়। তারা যখন চান তখনই সোনার ডিম পাড়েন তিনি। তাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল হাই কমান্ড। তবে দলীয় কর্মসূচীতে না থাকায় মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তার উপর ক্ষুব্দ। নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা নিয়েও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে কয়েকজন ক্ষুব্দ কর্মী জানালেন, উনি শিল্পপতি তাই দল বা রাজনীতি বুঝেন না। মাঝে মধ্যে গৃহপালিত সাংবাদিক দিয়ে মিডিয়ার মাধ্যমে নিজের উপস্থিতির প্রমাণ রাখেন।

এদিকে বিএনপি- জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের জ্বালাও পোড়াওয়ের ঘটনায় অনেক নেতাকর্মী যখন মামলা হামলায় জর্জরিত শাহ আলম তখন নির্বিঘ্নে ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কোন মামলা হয়নি বলে জানিয়েছে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের একটি সূত্র। উল্টো ওসি আক্তারের আমলে পুলিশি শেল্টারে তিনি মিছিল করেছেন বলে অভিযোগ খোদ বিএনপি নেতাকর্মীদের। ওই ওসি প্রতি মাসে তার ঢাকার দিলকুশা অফিসে গিয়ে দেখা করতেন, চা বিস্কুট খেতেন বলেও গুঞ্জন উঠেছিল। তবে বর্তমান ওসি আসাদুজ্জামান দেখা করেন কি না তা জানা যায়নি। তবে অন্য নেতার নামে মামলা হলেও এখন পর্যন্ত শাহ আলমের নামে কোন মামলা হয়নি।

২০০৯ সালের ৬ নভেম্বর শাহআলম তার ব্যবসায়িক শিল্প প্রতিষ্ঠানে তড়িগড়ি করে এক সভা করে নিজেই থানা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হয়। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ৬ নভেম্বর সম্মেলনের তারিখ ছিল না। সম্মেলন ও কমিটি গঠনের জন্য আলোচনার জন্য ডাকা সভায় সম্মেলন ছাড়া কমিটি গঠনের বিষয়টি উত্থাপিত হলে শুরু হয় তোড়জোড়। এসময় সভাপতি পদে আগ্রহী থানা বিএনপির আহবায়ক ও সাবেক সভাপতি অধ্যাপক খন্দকার মনিরুল ইসলাম, বিএনপি নেতা এম এ হোসেন সাঈদ ও সদর উপজেলার চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ সম্মেলন করে কমিটি গঠনের ওপর জোর দেন। কিন্তু তাদের মতামতকে উপক্ষো করে সভাপতি নির্বাচিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ পদে আগ্রহী তিন প্রার্থীর সঙ্গে শাহআলমের ঘণ্টায় ঘণ্টায় কয়েক দফা সমন্বিত ও পৃথক বৈঠক করে নিজেকে সভাপতি পদে একক প্রার্থী ঘোষণা করলে বাকীরা তাকে সমর্থন দেয়।

সদর উপজেলার ফতুল্লার কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন নিয়ে অনেক বিতর্কের জন্ম দেন শাহআলম। এ নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন সাবেক চেয়ারম্যান মনিরুল আলম সেন্টু। তিনি ছিলেন ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি। কিন্তু সেন্টু ফতুল্লা থানা বিএনপির কমিটি গঠন নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ করার পর তাকে দমাতে উঠে পড়ে লাগে শাহআলম। তিনি কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের তার পছন্দের অন্য এক প্রার্থী নজরুল ইসলাম পান্নাকে সমর্থন দেন। সেন্টুর বদলে পান্নাকে সমর্থন দেওয়া নিয়ে অনেক অনেক বিতর্ক হয়। একারণে ২০০১ সালের ৩০ মে কুতুবপুরে পান্নার উদ্যোগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে গেলে শাহআলমকে ধাওয়া দেয় এলাকার নেতাকর্মীরা। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে সেন্টু বিপুল ভোটে জয়ী হয়। এ নির্বাচনের পর থেকে শাহআলম কুতুবপুর এলাকায় যেতে পারছে না।

২০০৭ সালের ওয়ান এলেভেনের পর থেকে হঠাৎ করেই আলোচনায় আসার চেষ্টা করেন ফতুল্লার জনপ্রিয়া জালালউদ্দিন আহম্মেদ এর ছেলে শাহআলম। ওই বছরের তৃতীয় ধারার কিছু রাজনৈতিক দল গঠন হলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন শাহআলম। তিনি তখন নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেডে একটি ইফতার মাহফিলে মেজর জেনারেল (অব.) ইবরাহিমকে অতিথি করেন। এ অনুষ্ঠানে অতিথিরা দেশের দুই দলের দুই নেত্রীর তীব্র ভর্ৎসনা করেন। ওই বছরের ৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে একটি মিলনায়তনে কিংস পার্টি খ্যাত কল্যাণ পার্টির আত্নপ্রকাশ ঘটে। এ অনুষ্ঠানে লোকজন নিয়ে শাহআলম উপস্থিত হন। অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্য দিয়ে কল্যাণ পার্টির জন্য কাজ করার অঙ্গীকার করেন। কল্যাণ পার্টির প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) ইবরাহিম সেদিন তার বক্তব্যে শাহআলমের উপর দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব প্রদান করেন। শুরু হয় শাহআলমের রাজনীতি। তখন শাহআলম মোটা অঙ্কের টাকা কল্যাণ পার্টিকে অনুদান দেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেষ মুহুর্তের বিএনপির মনোনয়ন পান শাহআলম। এ নির্বাচন নিয়েও অনেক নাটকীয়তা হয়। নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী সারাহ বেগম কবরীর সঙ্গে পরাজিত হয়।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts