November 16, 2018

কমিটিতে আসতে পারেন স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতারা

আওয়ামী লীগের কমিটিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। পরিবর্তন দেখে বিস্মিত হবেন নেতাকর্মীরা। একই সঙ্গে তারা স্বস্তিও পাবেন। দাপটের সঙ্গে টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতাসীন বিতর্কিত নেতাদের লাগাম টেনে ধরা হবে। আগামী সংসদ নির্বাচন মাথায় রেখেই আসন্ন সম্মেলনে নির্বাচন করা হবে দলের নেতৃত্ব। সেক্ষেত্রে বঞ্চিত এবং পিছিয়ে পড়া ত্যাগী ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তিসম্পন্ন নেতাদের বিবেচনায় রাখা হয়েছে। সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত অথচ দক্ষ সংগঠক এমন নেতাদের ফিরিয়ে আনার কথাও ভাবা হচ্ছে। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী এ দলটির নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের অধিকতর ভূমিকা গ্রহণ ও উপস্থিতির বিষয়টিও এবার সক্রিয় বিবেচনাধীন।

বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র তথ্য-প্রযুক্তিবিদ সজীব ওয়াজেদ জয় ও রেজওয়ান সিদ্দিক ববিকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় নিয়ে আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডে আলোচনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তারা দু’জন কাউন্সিলর মনোনীত হয়েছেন। সজীব ওয়াজেদ জয় অনেক আগে থেকেই আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ করছেন। পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত ববি আওয়ামী লীগের নানা ধরনের গবেষণা কাজের সঙ্গে যুক্ত। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের একজন প্রভাবশালী সদস্য যুগান্তরকে জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর নাতনি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে রাজনীতিতে আনার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু পরিবারের কারও কারও মত রয়েছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানানো হয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা ছেলেমেয়ের বিষয়ে এখনও তার সিদ্ধান্তের কথা জানাননি।

এদিকে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের পুত্র পদত্যাগী স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমদ সোহেল তাজকেও আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিতে আনা হতে পারে। অন্যদিকে সোহেল তাজ মন্ত্রিত্ব ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে ফিরে গেলেও বর্তমানে ঢাকায় নিয়মিত। কাজ করছেন তাজউদ্দীন আহমদের নামে প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশন নিয়ে। কোরবানির ঈদের পর তিনি দেশে অবস্থান করেন। সরকারে যোগ না দিলেও তানজিম আহমদ সোহেল তাজ দলীয় পদ পেলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারেন। গণভবন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এমনটাই জানিয়েছে।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, সম্মেলনে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচনে এবার মুখ্য বিবেচনায় আসতে পারে সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপি সামনের নির্বাচনে অংশ নেবে- এ ধারণা থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে উঠে আসতে পারেন পিছিয়ে পড়া ক্লিন ইমেজের নেতারা। একই সঙ্গে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত অথচ দক্ষ সংগঠক এমন নেতাদের কমিটিতে ফিরিয়ে নেয়া হতে পারে। তারা আসন্ন এ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে। তাই কোনো ধরনের আলোচনায় না থাকলেও ঘোষণার সময় কেন্দ্রীয় কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখা যেতে পারে অনেককেই, যারা ক্ষমতার দুই মেয়াদেই রয়েছেন অবহেলিত ও উপেক্ষিত। এই চিন্তা-ভাবনার অংশ হিসেবে প্রেসিডিয়ামে ঠাঁই হতে পারে চট্টগ্রামের এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর। রাজশাহীর নুরুল ইসলাম ঠান্ডু কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে পারেন। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রেসিডিয়ামে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন এ আলোচনা দলের ভেতর ও বাইরে সর্বত্রই রয়েছে।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, জাতীয় সম্মেলনের দিনক্ষণ কাছে চলে এলেও দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে তেমন আলোচনা নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ নিয়ে কারও সঙ্গে খোলামেলা কথা না বললেও বিভিন্ন বিষয়ে তার অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি তার সঙ্গে সাবেক ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ দেখা করতে গণভবনে যায়। ওই দলে ছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক এক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। দলের সভানেত্রী তাদের নিয়ে রাতের খাবার খেলেও বিদায়ের আগে কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে কোনো আশ্বাস দেননি। বরং চলে আসার পর ওই নেতাদের নেতিবাচক ভূমিকা স্মরণ করেন। বিষয়টি এরই মধ্যে ছাত্রলীগের অন্য সাবেক নেতারাও জেনেছেন। এতে তারা হতাশ। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসতে পারেন বলে গণমাধ্যমে ছাত্রলীগের বেশ কিছু নেতার নাম প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত ওই তালিকায় প্রথম দিকে আছে গণভবনে যাওয়া ওই দলের সদস্যদের নাম।

সাধারণ সম্পাদক পদে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নাম কিছুদিন আগে আলোচনায় এলেও এখন আর নেই। তার আরও আগে এ পদের আশায় বুক বেঁধেছিলেন সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির সমর্থকরা। কিন্তু এ দুই নেতার অনুসারী-সমর্থকরা এখন চুপ। তাদের প্রত্যাশা এখন প্রেসিডিয়ামে গিয়ে ঠেকেছে। সর্বশেষ মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের আগে ড. আবদুর রাজ্জাক এবং ডা. দীপু মনির এই সমর্থকরা ধরেই নিয়েছিলেন তারা মন্ত্রিত্ব ফিরে পাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে অবস্থা ভিন্ন। সাধারণ সম্পাদক নিয়ে আলোচনা যাই হোক, এ পদে শেষ পর্যন্ত সৈয়দ আশরাফুল ইসলামই থাকছেন বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের সিনিয়র অনেক নেতা।

বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের রানিংমেট হিসেবে সব জেলা কমিটির সম্মেলন অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এ কমিটিতে হানিফের মর্যাদা বৃদ্ধির জোরালো সম্ভাবনা আছে। অন্যদিকে ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন এবং পরবর্তীতে নগর কমিটি গঠন করে দলীয় সভানেত্রীর কিছুটা সুনজরে রয়েছেন ড. আবদুর রাজ্জাক ও কর্নেল (অব.) ফারুক খান। তারাও এ কমিটিতে পদোন্নতি পেতে পারেন।

সাংগঠনিক সম্পাদকদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু পরিবারের নিকটজন আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম, রংপুর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, রাজশাহী বিভাগের আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন। তবে দুই সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক ও আহমদ হোসেনের অবস্থা খুবই শোচনীয় বলে জানা গেছে। বিএম মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে কর্মীদের অভিযোগের শেষ নেই। তাই এ দু’জনের ভাগ্যবিপর্যয় হলেও হতে পারে। অবশ্য কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, বন ও পরিবেশ উপ-মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব সরকারে থেকেও ক্লিন ইমেজ ধরে রাখায় কেন্দ্রীয় কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে পারেন। আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব এলাকার উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। গতবার আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম থেকে বাদ পড়েছেন অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন। তাই ওই অঞ্চলের প্রতিনিধি হিসেবে এবার জ্যাকবকে সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডে আলোচনা রয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে ঠাঁই হতে পারে জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের। প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের অবস্থা বেশ শক্তিশালী। আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের ত্রাণ সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, উপ-দফতর সম্পাদক মৃনাল কান্তি দাস বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য করার পরও বৈঠকগুলোতে অনুপস্থিতির কারণে আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন। তবে তাদের সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে পরিচিত প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের অবস্থা ভালো।

উৎসঃ   jugantor

Related posts