November 21, 2018

কবি শহীদ কাদরী স্মৃতির আড়ালে আরো কত স্মৃতি

এবিএম সালেহ উদ্দীন: মানুষের স্মৃতি সতত বিরাজমান। একজন মানুষ যতক্ষণ পৃথিবীতে বেঁচে থাকবেন তার অতীত এবং স্মৃতি সর্বদাই তার সঙ্গে থাকবে। এই ক্ষেত্রে দু:খের বদলে সুখের স্মৃতি অনেকটা মধুময় এবং জীবন্ত থাকে। আবার দু:খের স্মৃতিও মানুষকে অহর্নিশ কাঁদায়। আর স্মৃতিকে কেউ ভুলে থাকতে পারে না। এখানে ওস্কার ওয়াইডের সেই বিখ্যাত উক্তিটি উল্লেখ করা যায়Ñ‘স্মৃতি হচ্ছে এমন ডায়েরি যা আমরা সকলেই বয়ে বেড়াই’। তেমনই সুখ-দু:খের হাজারো স্মৃতির ডালা নিয়ে কত মানুষের মন কাঁদে। মানুষের হৃদয়ের ঐ কান্না অনেকেই দেখতে পায় না। আবার অন্তর চোখ দিয়ে কেউ কেউ দেখতে পায়। স্মৃতির ভেতরেও এমন কিছু স্মৃতি থাকে যা বার বার হৃদয়পটে ভেসে উঠে। হৃদয়কে কাঁদায় ও আপ্লুত করে । বেদনার নিগড়ে বিচলিত করে তোলে হৃদয় ও মনকে।
পৃথিবীতে আসার পর যখন বুঝতে শিখেছি তখন থেকে অদ্যাবধি আমার প্রাণ প্রিয় মা ও বাবার স্মৃতিই হৃদয়ে সর্বদা ভাসে। জীবনের অসীম শুন্যতার মাঝে তবু এমন কিছু স্মৃতি আছে ; যা আমায় অহনিঁশ তাড়িত করে। নিজেকে বেদনাকাতর ও বিচলিত করে তোলে।
তেমনই একজন স্মৃতির মহামানব হচ্ছেন আমাদের প্রিয় কবি শহীদ কাদরী। তাঁকে বাংলা সাহিত্য ও আধুনিক কবিতার বরপুত্র বলা হয়ে থাকে। প্রকৃতি সুন্দর মানুষের মাঝে দীপ্র স্মৃতির দেবালয়ে আলো জ্বালিয়ে তিনি চলে গেলেন অবিনশ্বরে। পরপারের অন্য এক অসীম জগতে চলে যাওয়ার মধ্যদিয়ে তিনি কাাঁদিয়ে গেলেন অসংখ্য ভক্তকুল, সাহিত্যানুরাগি,কবি-সাাহিত্যিকসহ নানা ধরনের মানুষকে। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও মনন ক্ষমতা ও কবিতার শক্তিমতার বিষয়ে কিছু উল্লেখ করার ক্ষমতা আমার নেই।
তবে তাঁর কাব্য মানস ছিল আকাশচুম্বি। একজন কবির এমন বিচিত্র ধরণের ভক্তকুল ও মানুষ থাকতে পারে (!) তা সত্যিই বিস্ময়ের ব্যাপার। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানোর জন্যে দূর-দুরাঞ্চল থেকে এত মানুষ আসতে পারে তা চিন্তার বাইরে। অদ্ভুত এক কবিতার সম্মোহনে চুম্বুকের মত সবাইকে তিনি টেনে নিয়ে আসতেন। সবাই পিনপতন নিরবতার মধ্যদিয়ে তাঁর অমীয়বচন শ্রবন করতেন। তাঁর প্রখর মেধা ও মননের তীক্ষèতার কথা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। প্রতি নিয়ত মৃত্যুর দ্বারে থাকা একজন সিরিয়াস প্যাসেন্ট হয়েও তিনি তাঁর কাব্য জগত ও কবিতার ঐশ্বর্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতেন। এক মুহুর্তের জন্যেও তিনি কবিতার জগত থেকে দূরে থাকেন নি। বিশ্ব সাহিত্য ও কবিতা নিয়ে এমন জ্ঞানী জনের সংখ্যা জগতে খুব কমই আছে।
বাইশ বছর আগে আমার প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়ার প্রক্কালে আত্মীয়-স্বজনসহ বেশ কিছু খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে এসেছিলাম। তাঁদের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবিতার রাজা কবি শামসুর রাহমানের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিলেন আরেক শ্রদ্ধাভাজন কবি অরুভ সরকার। ধানমন্ডির ১৯ নম্বরের একই পাড়ায় থাকতাম আমরা। প্রায়ই আমরা একই রিক্সায় কিংবা মটর সাইকেলে বাসায় ফিরতাম। অরুন’দার সাথে মধুর আমার সম্পর্ক ছিল বেশ অন্তরঙ্গ এবং বন্ধুর মতো। ঢাকায় থাকা কালীন সময়ে বহু জায়গায় অনেক আড্ডার সতীর্থ ছিলেন তিনি।

আমার প্রকাশনা ব্যবসায় জড়িয়ে থাকা অবস্থায়ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় কবি শামসুর রাহমানের বাসায় কয়েকবার যাওয়া হয়েছিল। ঐ শ্যামলীপাড়ায় কবি শামসুর রাহমানের বাসভবনে কত বিদ্যজনের আনাগোনা ছিল। কিন্তু সেদিনের যাওয়া ছিল অন্য রকম। কবি কুঞ্জের সুস্বাদু চা পান করতে করতে প্রায় দুই ঘন্টা কেটে গেল। বিদায়ের আগে শ্রদ্ধেয় রাহমান ভাই বললেন শহীদ কাদরীর সঙ্গে দেখা করো। নিজের প্রিয় দেশ তথা কবিতার চিরচেনা এই বাংলাদেশ দেশ ছেড়ে কেন সে ওখানে পড়ে আছে? আরও একজন মহান কবি ফজল শাহাবুদ্দীন। কবি শহীদ কাদরীর সাথে দেখা করার জন্য তিনিও বললেন।
কবি শহীদ কাদরী একদা বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে প্রথমে লন্ডনে বেশ কিছুদিন,কয়েক বছর জার্মানীতে মোহনীয় জীবন। মোহণীয় এ জন্যে যে, কবি নাজনুন নেছা পিয়ারীর সঙ্গে প্রথম বৈবাহিক মধুময় জীবন কাটিয়ে কবি অত:পর আমেরিকায় যাত্রা করেন। আমেরিকার বোস্টনে কবির জীবনের সঙ্গে আরেক জীবন। পৃথিবীর কত প্রান্তের চষে বেড়ানোর বাসনাকে উতড়ে বহু চড়াইয়ের পর সর্বশেষ নিউইয়র্কের ইসপাৎ কঠিণ শহরের একটি কোমল কোঠরে এসে কবি স্থিত হলেন। কোমল কথাটা এজন্যে প্রযোজ্য যে, এমন বজ্রকঠিণ নীতিবান মহাপুরুষকে বশে এনে কেমন করে অধিকতর ভালোবাসার নির্যাসে মোহনীয় করে আগলে রাখলেন তাঁর বর্তমান সহধর্মীনি নীরা কাদরী। ইহাও কম বিস্ময়ের নয়।
আমার যুক্তরাষ্ট্রে আসার কিছুদিন পর নিউইয়র্ক এস্টোরিয়ার এথেন্স পার্কের একটি কবিতার অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেছিলেন শহীদ ভাই। নিউইয়র্কে আমি তখন নবাগত। মনে আছে যে, কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে আমি সহধর্মীনিরেজভীন এবং শিশু দুইপুত্রকে নিয়ে সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। শহীদ ভই’র সঙ্গে চা খেয়েছি গল্প করেছি।

ছবি: শহীদ ভাই’র সাথে আমার পুত্র রাইহান সালেহ,রেদওয়ান সালেহ,রেজভীন এবং আমি।
নিউইয়র্কের ক্লাব সনমে সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক নাদীম আহমেদ এর একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হয়েছিল। সঙ্গীত শিল্পী মনিকা রায়ের উদ্যোগে সেই অনুষ্ঠানটির পরিচালনা ও উপস্থাপনার দায়িত্ব ছিল আমার উপর। শহীদ ভাইকে দাওয়াত দিয়েছিলাম সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী নীরা কাদরী। নীরা ভাবীর গাড়ী থেকে শহীদ ভাই’কে হুইল চেয়ারে চেপে যখন নিয়ে আসছিলাম সবাই দাঁড়িয়ে সন্মান জানিয়েছিলেন। কানায় কানায় ভরে যাওয়া অনুষ্ঠানে অনেক বিদগ্ধ জনের সাথে আরও ছিলেন তৎকালীন বিদায়ী কনসাল জেনারেল বন্ধুবর সাব্বির আহমেদ চৌধুরী এবং নবাগত কনসাল জেনারেল মনিরুল ইসলাম। যিনি কর্মে যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই শহীদ ভাই পরিচালিত ‘একটি কবিতা সন্ধ্যায়’ যোগ দিয়েছিলেন। আমার শশুর অধ্যাপক সিরাজুল হক তখন মাত্র বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে নিউইয়র্ক এসেছেন। তিনিও অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় ঐ অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিলেন। উনার সাথে শহীদ ভাই’র দেখাও কথা হলো। তারপর থেকে প্রায়ই শহীদ ভাই ও নীরা ভাবী আমার কাছে উনার খোঁজ নিতেন। আমি তাঁর ডায়ালেসিস সংক্রান্তে শহীদ ভাই ও ভাবীর পরামর্শ মোতাবেক কলম্বিয়া হাসপাতাল,জুইস হাসপাতাল সহ চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের অনেক পরামর্শ পেয়েছিলাম। ফলে আমার শশুর সাহেবের দ্রুত চিকিৎসার ব্যাবস্থাটি সহজতর হয়েছিল। শহীদ ভাই’র মৃত্যুর সংবাদটি তাঁকেও খুব ব্যথিত করেছে।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্টজনের কথার ফাঁকে ফাঁকে নাদীম ভাই’র সুর করা বেশ কিছু বিখ্যাত গান বিশিষ্ট শিল্পীদের কন্ঠে পরিবেশিত হয়েছিল। শহীদ ভাই সে সব গান শুনেছেন এবং প্রশংসা করেছিলেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও বর্ষীয়ান সাংবাদিক শ্রদ্ধেয় ফাজলে রশীদ(মরহুম)ভাই’র একমাত্র কন্যা ফাবিয়া রশীদের বিবাহ উপলক্ষে লং আইল্যান্ড সিটির একটি পার্টি হলে বিরাট অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেখানে নিউইয়র্কের পেশাজীবি, কবি-সাহিত্যিক ও সাংবাদিকসহ অনেক গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত হয়েছিলেন। শহীদ ভাইও উপস্থিত ছিলেন। রশীদ বড় ভাই’র খ্যাতিমান কথা-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবি প্রফেসর আবু রুশদ স্যারের(মরহুম) সহধর্মীনী, ছেলে কামাল রুশদ এবং কন্যা শাহীন রুশদ, জাতীয় প্রেসক্লাবের তৎকালীন সভাপতি শওকত মাহমুদ, সাপ্তাহিক ঠিকানা’র সাবেক সম্পাদক সাঈদ উর রব ও ফজলুর রহমানসহ অনেক সাংবাদিক ও পেশাজীবি সেই অনুষ্ঠানে ছিলেন। শহীদ ভাই ও নীরা ভাবী, সাঈদ উর রব ভাই, ফজলু ভাই, অধ্যাপিকা হোসনে আরা ভাবী নাট্যাভিনেত্রী রেখা আহমেদ ও রেজভীনসহ আমরা একই টেবিলে বসেছিলাম। সেদিনই শহীদ ভাই’র কাছে জানলাম তিনি ফাজলে রশীদ ভাই’র চাচাতো ভাই। শহীদ ভাই তাঁদের বিশাল পরিবার ও বংশ-বুনিয়াদ সম্পর্কে অনেক প্রাণখোলা গল্প করেছিলেন। অতীব দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, কন্যার বিয়ের কয়েকমাসের মধ্যে ফাজলে রশীদ ভাই এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরলোক গমন করেন।
কবি শহীদ কাদরী’র সাথে এ রকম অনেক টুকরো স্মৃতি আজ আমায় ভারাক্রান্ত করে তোলে।
জীবনের শেষ দিকে কবিতা সন্ধ্যার উজ্জ্বলতম অনুষ্ঠানকে ঘিরে কত মানুষের বর্ণীল স্মৃতির সরণী বেয়ে কোলাহল মুখর পথ চলতে চলতে তিনি অকস্মাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। শেষবারের মতো হাসপাতালে ভর্তি হলেন। সবার ধারণা ছিল তিনি ফিরে আসবেন। এবার খবর পেয়ে অনেকেই ছুটে গেলেন কবির পাশে। মৃত্যুর আগের দিন
শনিবার অপরাহ্নে ৩০০ কম্যুনিটি ড্রাইবের পার্কিং লটে গাড়ী রেখে ক্ষীপ্র রোদের তাপদাহ ভেদ করে লং আইল্যান্ড জুইশ হাসপাতালের ৫১৯ নং কেবিনে শহীদ ভাই’র কাছে চলে গেলাম। দেখি এক সুদর্শন যুবকের সাথে তিনি একান্তে কথা বলছেন। ইনিই কবি শহীদ কাদরীর একমাত্র পুত্র আদনান কাদরী। অনেক আগে শহীদ ভাই এই পুত্রের কথা বলেছিলেন। কখনও দেখা হয় নি। আমি যখন শহীদ ভাইকে সালাম দিয়ে কেবিনে ঢুকলাম। মি: আদনান দাঁড়িয়ে আমায় সালাম দিলেন। এই সমীহবোধ ও সৌজন্যবোধ দেখে অবাক হ’লাম। আমার কাছে মনে হয়েছে শহীদ ভাই’র পুত্রটি বেশ ভদ্র এবং বিনয়ী।
হাসপাতালে যাওয়ার আগেই জেনেছিলাম শহীদ ভাই বিপদমুক্ত। মনে কোন শংকা রলো না। সহসা রিলিজ হয়ে ঘরে ফিরবেন। তবুও পুত্রের সঙ্গে এমন অনেক কথা থাকতেই পারে। তাই আমি শহীদ ভাইকে বললাম, আপনি দ্রুত সেরে উঠছেন জেনে আমাদের সবার ভাল লাগছে। এখন যাই শহীদ ভাই আপনি ছেলের সঙ্গে কথা বলুন। তিনি বললেন আচ্ছা, ভালো থেকো।
মনে হলো পুত্রের সঙ্গে অনেক কথা। তবুও মুখখানি একটু ঝুঁকিয়ে শহীদ ভাই’র হাতের ইশারার ঝলকের দৃশ্যটি মনে হয় এখনও আমার চোখে লেগে আছে। কোন বিমর্ষভাব কিংবা বিষণœতার লেশ নেই তাঁর চোখে মুখে। এর আগেও যেমন দেখতাম তেমনই আছেন। এ মুহুর্তে রবীন্দ্রনাথের দু’টি লাইন মনে এলোÑ
“ সময় যদি ফুরিয়ে থাকে/ হেসে বিদায় করো তাকে”।
আমার সঙ্গে সেখানেই শহীদ ভাই’র জীবনের শেষ দেখা । শেষ কথা।
পরের দিন সকালে রেজভীন আমায় ঘুম থেকে তুলে দিল। এই শুনো শহীদ নাকি মারা গেছেন?! ঢাকা থেকে আমার শালিকা শিরীন ওকে ফোন করে জানিয়েছে। আমি হতচকিত হয়ে উঠলাম। কী বলো ? নাহ ! ও বললো শিরীন টেলিভিশনের খবরে জেনেছে।
আমি যত্রতত্র সার্ট-প্যান্ট পরে সোজা হাসপাতালে চলে গেলাম। এতক্ষণে বহুজনের সমাগমে হাসপাতাল ভরে গেছে। সবার চোখে মুখে অশ্র“ত কান্না। হাসপাতালে কয়েকঘন্টা এবং জানাজা পর্যন্ত ছিলাম সবাই। অগনিত ভক্তকুল, কবি-সাহিত্যিক, রাষ্ট্রদূত, ও কনসাল জেনারেল সহ মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে বাদ মাগরিব জামাইকা মুসলিম সেন্টার লোকে লোকারন্ন হয়ে গিয়েছিল।

একটি কবিতা সন্ধ্যায় কবিতা পাঠ ও একটু কথা।
আমার যুক্তরাষ্ট্রে আগমনের পর প্রথমে বোস্টনে শহীদ ভাই’র সঙ্গে দেখা। তারপর যতবার নিউইয়র্ক এসেছিলেন দেখা হয়েছে। সর্বশেষে স্থায়ীভাবে নিউইয়র্ক বসত করবার বদৌলতে আধুনিক কবিতার প্রাণপুরুষ শ্রদ্ধেয় কবি শহীদ কাদরী কেমন করে সব বাঙালির হয়ে গেলেন। তাঁর সান্নিধ্যে, কবিতার আড্ডা ও আসরে গেলে মনে হতো আমি তো আমার চিরচেনা স্বদেশ বাংলাদেশেই আছি। যেখানে লেপটে আছে শ্যামল বাংলার লাল সবুজ পতাকা। কবিতার ছন্দছায়ায় আমাদের অন্তরের শিরা উপশিরায় দুর্নিবার হয়ে গেথে যেতো তাঁর মুক্তোখচিত কথাগুলো। বিশ্বাসে নি:শ্বাসে আপদমস্তক একজন আধুনিক কবিতার অকুতোভয়ী কারিগর। কোন আড়ষ্ঠতা নেই, কোন তোষামদ কিংবা বাহুল্যকথনের ধার ধারেন নি। নিজস্ব নীতিবোধের আকাশচুম্বি চেতনায় সতত দীপ্যমান কবি শহীদ কাদরী। কবি ও কবিতার মোহময়তা এত আকর্ষণীয় ও তীব্র হতে পারে যা তাঁর প্রতিটি বচনেই পরিস্ফুটিত হয়ে উঠতো। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সবাই শুনতো তাঁর কথা। সাহিত্য ও কবিতা নিয়ে কথার শেষ হতো না। এ এক অন্য রকম আকর্ষণ।
নিউইয়র্কে মুক্তধারা আয়োজিত বইমেলার প্রায়গুলোতেই তিনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পর্বে এবং অন্যান্য সময়ের অনুষ্ঠানে শহীদ ভাই’র অংশ নেয়ার ফলে বইমেলার মান যেনো শতগুন বেড়ে যেতো। প্রতি বছর নিউইয়র্ক বইমেলায় বাংলাদেশ ও ভারতের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকগণও শহীদ ভাইকে পেয়ে উৎফুল্ল হতেন। প্রকাশ থাকে যে, ২০১৬ এর বইমেলাতে তিনি যোগদান করেছিলেন। এসব ক্ষেত্রে কোন ক্লান্তি ও কোন জড়তা ছিল না তাঁর মাঝে।
এ প্রসঙ্গে ‘একটি কবিতা সন্ধ্যা’র স্মৃতি সমূহ চোখের সামনে অনায়াসে উঠে আসে। জীবনের কঠিণ বাস্তবতার প্রান্তিকে উপনীত হয়েও কবি শহীদ কাদরী নিরেট সাহিত্যধর্মী এই কবিতা সন্ধ্যার মাধ্যমে একটি ইতিহাসের জন্ম দিয়ে গেলেন। অনুষ্ঠানটির ধারাবাহিকতা এবং সামগ্রিকভাবে সাফল্যের পেছনে চালিকাশক্তি হিসাবে তাঁর সহধর্মিনী নীরা কাদরীর অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা ভুলবার নয়। নিউইয়র্কের কাব্যজগতে ‘একটি কবিতা সন্ধ্যা’র দৃষ্টান্ত উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। আমরা ঐ অনুষ্ঠানে যোগদান করে যে আনন্দ পেতাম তাঁর সর্বমূলেই ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি শহীদ কাদরী। এই অনুষ্ঠানে আমরা কবিতা পড়তাম ও খ্যাতিমান কবিদের কবিতা থেকে কবি শহীদ কাদরীর নির্বাচিত কবিতা আবৃত্তিকারদের কন্ঠে শুনতাম। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমরা শহীদ ভাই’র কথা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে পারতাম। আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্য ছাড়াও কানাডা এবং বাংলাদেশ থেকে বেশ কিছু কবি-সাহিত্যিক এবং কলা-কুশলী শহীদ ভাই’র অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। অনুষ্ঠান শেষে উপরে বাসায় প্রায়শ:ই হতো জম্পেশ আড্ডা। রাতের ডিনার ও থাকতো তাতে। অনেক স্মৃতির মাঝে সেই কবিতা সন্ধ্যা অনুষ্ঠানের শেষে বিদায়ের সময় শান্তভাবে শহীদ ভাই স্ব øেহে বলতেন উপরে আড্ডায় আসো। খেয়ে যাবে।

একটি কবিতা সন্ধ্যা’র প্রথম দিকে হাস্যোজ্জল ও প্রাণবন্ত সস্ত্রীক কবি শহীদ কাদরী।
যখন ভাবি সব কোলাহল থাকবে। হয়ত: অনুষ্ঠানও হবে। কিন্তু শহীদ ভাই থাকবেন না(!) তখনই শিউড়ে উঠি। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যকে এক বিষাদঘন আঁধারে ঠেলে এভাবেই চলে গেলেন তিনি। মৃত্যুর অমোঘ আলিঙ্গনে সবার মতো তিনিও চির বিদায় নিলেন। শহীদ ভাই’র রেখে যাওয়া

হ্যাঁ তিনিই আধুনিক কাব্যজগতের চেনা মানুষ স্বনামধন্য কবি শহীদ কাদরী। যিনি ১৯৪২ শে’র ১৪ই আগস্ট আবির্ভূত হয়ে এই সময়ের ২০১৬ সালের ২৮শে আগস্ট এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। বলা যায় অকস্মাৎ তার এই মহা প্রয়াণ। তাঁর মতো এমন হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল রশিক মানুষ খুব কমই দেখা যায়। বিদ্যা-বুদ্ধিতে চৌকষ জ্ঞানের অধিকারী প্রখর মনন ও সৃজন ক্ষমতার অধিকারী এই মহান কবি এত সহসা চলে যাবেন(?) তা ভাবা যায় না।
আসলে ইহাই বাস্তবতা। এই চলে যাওয়া হচ্ছে মানুষের পার্থিব জীবনের সর্বশেষ বিচ্ছেদ। যে বিচ্ছেদের যাত্রা শুরু মাতৃজঠর থেকে পৃথিবীতে আগমনের সময়। মৃত্যুর মধ্য দিয়েই পৃথিবীর সাথে তার ঘটে যায় চির বিচ্ছেদ । আর ইহাই চিরন্তন ইহাই বাস্তবতা। এভাবেই একদিন পার্থিব জীবনের সমাপ্তি টেনে সকলেরই হবে অবিনশ্বরে মহাযাত্রা।
এই পৃথিবী ও প্রকৃতি,আর সুনীল আকাশ কিংবা আরো কত স্মৃতির নীহারিকা যার কোন সীমা পরিসীমা নেই। এখানে মানুষ আসে ক্ষণকালের জন্য। আর চলে যায় চিরকালের তরে।
কবি শহীদ কাদরী’র বর্ণবহুল জীবনের বৈচিত্র এতই প্রদীপ্ত ছিল তা আমার মত ক্ষুদ্রজনের পক্ষে ব্যক্ত করা কঠিণ। তাঁর সঙ্গে হাজারো বিজ্ঞজনের স্মৃতির রেশ টেনে এতটুকু বলা যায় রবীন্দ্রনাথের ভাষায়Ñ
“নাহি জানে কেউ/ রক্তে তোর নাচে আজি সমুদ্রের ঢেউ,/ কাঁপে আজি অরণ্যের ব্যাকুলতা;/ মনেআজি পড়ে সেই কথাÑ”।
হ্যাঁ, আপন আলোয় বসে ব্যথিত হৃদয়ে শুধু উপলব্ধির বিষয়। হৃদয়ের একান্ত অনুভবের মধ্যদিয়েই স্মৃতিকে লালন করতে হয়। কেননা মানুষ মাত্রেই স্মৃতির অতলে থাকা , আর স্মৃতির মধ্যেই মানুষের বসবাস। যেটি কোন কিছুর সাথে তুলনা করা যায় না।
মানুষের স্মৃতিতো এমনই। একটু আগে যা ঘটে যায় তাও এক ধরণের স্মৃতি। জীবনের বহু দিক থেকে বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন কবি শহীদ কাদরী। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি,কর্মজীবনে চাকুরি, কবিতার সম্মোহনে বিশদ-বিস্তর পড়াশুনা এবং সাহিত্যে অপার অবদানের স্বাক্ষর রয়েছে তার জীবনের পরতে পরতে। ব্যক্তিগতভাবে সদা হাস্যজ্জোল যিনি সর্বদা আনন্দের আবহে সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। কবিতায় বুদ্ধদেব,বিষ্ণু দে, রবীন্দ্রনাথ,এজরা পাউন্ড,বোদলেয়ার,টি এইচ এলিয়ট, ইয়েটস সহ কতশত ভূবন কাঁপানো কবিদের উদ্ধৃতি সংযোগে অনর্গল কথোপকেথন। আবৃত্তিকারদের জন্য তিনি বাংলাদেশের খ্যাতিমান কবিদের কবিতা বাছাই করে দিতেন। এমনকি একটি কবিতা সন্ধ্যায় কারা কবিতা পড়বেন সেই নির্বাচনের সর্বময় কাজটিও কিন্তু শহীদ ভাই করে দিতেন। এখানে কারো কোন কথা থাকাতো না এবং প্রয়োজনও ছিল না। এমন একটি প্রাণবন্ত সাহিত্য আসর যেখানে সবাই মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে উপভোগ করতেন এবং শহীদ ভাই’র মূল্যবান কথা তা শুনতেন প্রাণভরে।
অথচ সেই কোলাহলময় আনন্দঘন পরিবেশ এবং সবকিছুর যবনিকা টেনে তিনি চলে গেলেন। অবশ্য এটাই তো নিয়তি;ইহাই তো বিধাতার নিয়ম। জীবনের প্রান্তিকতায় এসে কবি তাঁর সমস্ত অভিমান ঝেরে ফেলে দিয়ে নব উদ্যোমে কবিতার এক আনন্দময় অঙ্গন নির্মাণ করলেন। যেখানে কবিতা শুধু কবিতারই কায়-কারবার। যেখানে সর্ব বৈচিত্রের অনুপঙ্ক জীবনধারায় সকলের প্রিয় কবি শহীদ কাদরী তাঁর কবিতাবলী রেখে গেছেন। স্বদেশের ছায়াময়তায় অতি কমসংখ্যক কবিতা যা-ই লিখেছেন সবই কবিতা। মাত্র তিনটি কব্যি গ্রন্থ উত্তরাধিকার(১৯৬৭),তোমাকে অভিবাদন:প্রিয়তমা(১৯৭৪),কোথাও কোন ক্রন্দন নেই(১৯৭৮) এই তিনটি বই লিখে কবি শহীদ কাদরী বাংলা সাহিত্যে যে বিশাল মর্যাদা ও গৌরবকে উচ্চকিত করে গেলেন তার তুলনা বিরল। অবশ্য জীবনের শেষদিকে নিউইয়র্কে বসে তাঁর চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছিল।
বাংলা সাহিত্য জগতের সর্ববিস্তারি স্বর্ণময় ভূবন তৈরি করে কবি শহীদ কাদরী চির কালের জন্য এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। আধুনিক বাংলা কবিতার মধ্যমনি হিসাবে তিনি অমর হয়ে থাকবেন। জীবন ও কর্মের বহুমাত্রিক অবদানের ঔজ্জ্বল্যে বেঁচে থাকবেন চিরকাল। স্বরণীয় হয়ে থাকবেন মানুষের এই সন্দর ভূবনে।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।

Related posts