September 23, 2018

কবি ফররুখ আহমদের স্মৃতি

মুহাম্মদ কামরুজ্জামান

পঞ্চাশ দশকে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ক্লাস এইট-নাইনে পড়ার সময় কবি ফররুখ আহমদের ‘সাত সাগরের মাঝি’ বইয়ের কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কবি নজরুল ইসলামের পর কবি ফররুখ আহমদের কবিতা আমার হৃদয় ও মন স্পর্শ করে। তার দারুণ ছন্দের এ কবিতাগুলোর বেশ ক’টি মাত্র কয়েকবার পড়েই আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। তখন একদিন হঠাৎ করেই নতুন নির্মিত হওয়া বায়তুল মোকাররমে তাকে সশরীরে দেখতে পেয়ে দারুণ খুশি হয়েছিলাম।

তারপর এখানে ওখানে সেখানে বহুবার তাকে দেখার কথা বন্ধুবান্ধব বা পরিচিতদের কাছে সগর্বে বর্ণনা করে উল্লাস প্রকাশ করতে কার্পণ্য করিনি। কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন উচ্চতায় পাঁচ ফুট দুই বা আড়াই ইঞ্চি। পরতেন পাজামা-পাঞ্জাবি, যার ওপরে থাকত শেরওয়ানি। মাথায় থাকত টুপি। আর হাতে যষ্ঠি। তিনি ছিলেন একজন পাক্কা নামাজি ও সত্যিকার পরহেজগার। তার ধীর পদক্ষেপের হাঁটায় এমন একটা আভিজাত্য ছিল যা দেখে তাকে শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রম না করে পারা যেত না। তারুণ্য ও যৌবনে যার কবিতা আমাদের দেহ, মন ও চিত্ত ছন্দায়িত করেছে, দূর থেকে দেখে যার প্রগাঢ় ও হিমালয়সম ব্যক্তিত্বে আমরা সম্মোহিত হয়েছি- অনেক, অনেক দিন পর তার সাথে হঠাৎ করে পরিচয় হওয়া আমার নশ্বর জীবনের স্মরণীয় ও ঐন্দ্রজালিক মুহূর্তের একটি বলেই মনে করি।

কবি ফররুখ আহমদকে প্রথম দেখার প্রায় পনেরো-সতেরো বছর পর পরিচয়ের সূত্র ও ঘটনাটা বেশ অভিনব। ১৯৭১ সালের জুলাই মাস। তারিখটা ঠিক আমার মনে নেই। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে তখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে। পাকিস্তানি সেনারা তখন বাঙালি যাকেই সন্দেহ করছে, বন্দুকের গুলি দিয়ে তার জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিতে কসুর বা ইতস্তত করছে না। সেনাবাহিনী কোনো রকমে রাজধানী ঢাকার স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করলেও প্রতিদিনই এখানে ওখানে লাশের মিছিল দেখা যাচ্ছে।

আমি তখন মতিঝিল-পল্টনের মোড়ে অবস্থিত প্রেস ট্রাস্টের দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার (স্পোর্টস) হলেও সারা দেশে কোনো খেলাধুলা না হওয়ায় পত্রিকার নিউজ ডেস্কে সাব-এডিটরের দায়িত্বে নিয়োজিত। যে রিপোর্টারকে বিকেলে খেলা দেখে অফিসে সন্ধ্যায় খেলার রিপোর্ট দিতে হতো, দেশের অস্বাভাবিক অবস্থার জন্য তাকে নিউজ টেবিলে সকাল ৮টা বেলা ২টা পর্যন্ত বিদেশী সংবাদ অনুবাদ ও সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এমনই একদিন দৈনিক পাকিস্তান (যা পরে দৈনিক বাংলা) থেকে বেলা ২টায় বের হতেই গেটে দেখা আরেক সাংবাদিক-সুহৃদ গোলাম মোস্তফার সাথে। গোলাম মোস্তফার সাথে আমার পরিচয় ১৯৫৫ সালে, এক বাসায় পাক-ভারত ক্রিকেট টেস্টের রেডিও কমেন্ট্রি শুনতে গিয়ে। মোস্তফা একসময় বাংলা একাডেমিতে কাজ করলেও সে সময় নিউ নেশন পত্রিকার সিনিয়র সাব এডিটর। তার সাথে দেখা হতেই ক্রিকেটের আলোচনা শুরু হলো। ঠিক সে সময় ভারত ও পাকিস্তান ক্রিকেট দল ইংল্যান্ড সফরে মেতে উঠেছে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে জাতীয় কোচিং সেন্টারের (জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ) পাশ দিয়ে স্টেডিয়ামের পশ্চিম দিক হয়ে মেইন গেটে পৌঁছলাম। আমার গন্তব্য জজকোর্ট সংলগ্ন আমার বাড়ি আর মোস্তফা যাবেন জিন্নাহ্ এভিনিউর (যা এখন বঙ্গবন্ধু এভিনিউ) এক দোকানে।

হঠাৎ দেখি কবি ফররুখ আহমদ আমাদের সামনে। মোস্তফাকে কবি ফররুখ আগে থেকেই চিনতেন। তিনি হঠাৎ প্রশ্ন করলেন : আপনারা মশগুল হয়ে কী আলোচনা করছিলেন? আমি বললাম : স্যার, পাকিস্তান ক্রিকেট টিম ইংল্যান্ডে বেশ ভালো খেলছে। আমরা সেটা নিয়েই আলোচনা করছিলাম।

কবিবর সাথে সাথে উত্তর দিলেন : পাক ক্রিকেট টিমের কথা ভুলে যান। এখন আপনারা বাঙালি ক্রিকেটার নিয়ে দল গঠন করার কথা ভাবুন। দেশ স্বাধীন হতে আর বাকি নেই। দেশ স্বাধীন হলে বাঙালি ক্রিকেটার দিয়ে দল গঠনের চিন্তা করুন। এখন থেকে চিন্তা না করলে টিম গঠন করা কঠিন হবে। তবে এগারোজন বাঙালি ক্রিকেটার দিয়ে দল গঠনের শুধু চিন্তা করলে হবে না, তাদের সবাইকে ভালো খেলে যোগ্যতাও প্রমাণ করতে হবে। এটা কিন্তু আমাদের ছেলেদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ বা অগ্নিপরীক্ষা। এ কথা মনে রাখতে হবে।’

এরপর কবিবর ও গোলাম মোস্তফা ইত্তেফাকের একজন সাংবাদিকের অসুস্থতা নিয়ে আলোচনা করলে আমি তা চুপ করে শুনে একসময় তার কাছ থেকে আমরা বিদায় নিয়ে যে যার গন্তব্যপথে চলে গেলাম। কবি ফররুখ আহমদের সাথে এ পরিচয়ের মুহূর্তটি আমার নশ্বর জীবনের এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি। পরে তার সাথে দেখা হলে কোনো রকমে সালাম দিয়ে সরে গেছি। তার বিশাল ও বিজ্ঞ ব্যক্তিত্বের কাছে নিজেকে ক্ষুদ্র ও নগণ্য ভেবে তাকে সতর্কভাবে এড়িয়ে গেছি।

তবে সে দিন তার দেশ, দেশের মানুষ ও বাঙালিপ্রীতির যে প্রমাণ পেয়েছিলাম, তা জীবনভর আমার মনে থাকবে। দেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বাংলা ভাষার এ অনন্য কবির কুণ্ঠাহীন আর্তি আমাদের হৃদয় স্পর্শ করেছিল।

তারপর সত্যিই একদিন দেশ স্বাধীন হলো। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ও লাখো শহীদানের বিনিময়ে পূর্ব পাকিস্তান হলো বাংলাদেশ- বাঙালিদের সত্যিকার আবাসভূমি। বাংলা ভাষার মানুষেরা আবার প্রাণখুলে তাদের নিজেদের মাতৃভাষায় কথা বলতে লাগল। হঠাৎ পত্রিকায় দেখি কবি ফররুখ আহমদের নিগ্রহের খবর। বাংলা ভাষার সাথে আরবি-ফার্সি বা উর্দু শব্দের সংমিশ্রণকে প্রশংসা বা স্তুতির বদলে একদল অপোগণ্ড তার কদর্য ব্যাখ্যা করে কবির নিগ্রহের কারণ হয়েছে। অন্য ভাষার সংমিশ্রণ দ্বারা বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি বাঁকা চোখে দেখার এক কদর্য অপব্যাখ্যা।

বাংলা ভাষার সাথে যদি সংস্কৃত, পালি, উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি ভাষা মিশিয়ে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করা যায় তবে তাতে আরবি ও ফার্সির সংমিশ্রণে দোষ কোথায়? বরং এ সংমিশ্রণে বাংলার লালিত্য, মাধুর্য, অভিনবত্ব বেড়ে গেছে। পাঠক ও সাধারণ মানুষ এ সংমিশ্রণকে গ্রহণ করে শুধু অভিনন্দন জানায়নি, এর অভিনবত্বকে স্বাগত জানাতে কুণ্ঠিত হয়নি। ওপার বাংলার অন্যতম সেরা কবি বুদ্ধদেব বসু এ সংমিশ্রণকে যুগান্তকারী বলে মন্তব্য করেছেন। বুদ্ধদেবের মতে, কবি নজরুল, কায়কোবাদ ও বন্দে আলী মিয়াও আরবি-ফার্সি শব্দের সংমিশ্রণ দ্বারা এ ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন। কবি ফররুখ তাদের ছাড়িয়ে গিয়ে বাংলা ভাষাকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। অনেকেই জানেন না যে, চল্লিশের দশকে কলকাতার রিপন কলেজে ফররুখ আহমদ কবি বুদ্ধদেব বসুর ছাত্র ছিলেন। দর্শন ও ইংরেজির ছাত্র ফররুখ বাংলার দিকে ঝুঁকে তাতে উৎকর্ষ দেখাবেন তা তার নিকটজনেরা কেউ ভাবেনি। এ কৃতিত্ব দ্বারা ফররুখ বাংলা সাহিত্যে নিজেকে এক অসামান্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

অথচ এ জন্য তার প্রশংসা বা স্তুতি তো দূরের কথা, বরং একদল অপোগণ্ড ব্যক্তি দ্বারা লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত হওয়ার খবর সমগ্র জাতির জন্য ছিল দুঃসহ, লজ্জাকর ও নিন্দনীয়। তার এ দুঃসময়ে কেউ তো তাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে সাহস করেনি, যা ছিল আরো দুঃখের।

দেশ স্বাধীন হওয়ায় পুরো জাতি যখন অপার আনন্দে ভাসছে, ঠিক সেই সময় এই যুগন্ধর প্রতিভার কবি ফররুখ আহমদকে বাঁচার জন্য পরিবার পরিজনকে নিয়ে নানা শঙ্কায় দিন কাটাতে হয়েছে। সে সময়ে তার বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বন ছিল না বললেই চলে। সরকারি বা বেসরকারিভাবে তাকে সাহায্যের জন্য কারো এগিয়ে না আসা ছিল খুব মর্মান্তিক। নশ্বর জীবনের এই অপ্রত্যাশিত নারকীয় সময়ের মুহূর্তেও ফররুখ ছিলেন অবিচল, সত্যনিষ্ঠ ও খোদাভক্ত। তার পরিবারের সদস্যরা সেই অতীত দিনগুলোর কথা ভাবলে এখনো শিউরে ওঠেন। জীবন্মৃত অবস্থায় তাদের দিন কাটাতে হয়েছে, কেউ কখনো জানার চেষ্টা করেনি।

চল্লিশের দশকের পর থেকে এ পর্যন্ত দুই বাংলার সম্ভবত শ্রেষ্ঠ ও ছন্দোময় কবি ফররুখ আহমদের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় বাংলা ভাষার রিক্ততা ও নিঃস্বতা বেড়েছে। দেশে বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেলেও বিভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণে তাকে আরো উন্নত ও সমৃদ্ধ করার পথে বাধা সৃষ্টিকারীদের অযথা উসকে দেয়া হয়েছে। এসব অমানুষের হাতে কবি ফররুখের নিগৃহীত হওয়া ছিল জাতীয় লজ্জা। নিগৃহীতকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় সাধারণ মানুষের জীবন শঙ্কাময় হয়ে উঠেছিল।

এ কবির যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় ভাষার রিক্ততা ও নিঃস্বতা বেড়েছে। তারপর অবস্থা একসময় থিতু হলো; কিন্তু কবিবরের জীবনের সময়ও যেন ফুরিয়ে গিয়েছিল। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ঘটনার নানা প্রেক্ষাপট তাকে কাবু করে দিয়েছিল। আর এভাবেই এক সহজ ও সরলমনা এবং ফেরেশতার মতো নিষ্কলুষ চরিত্রের মানুষ, অমিত ও ক্ষণজন্মা প্রতিভার যুগস্রষ্টা কবি ফররুখ আহমদের জীবনপ্রদীপ হঠাৎ করেই নিভে গেল। আমাদের সহস্র রোদনেও তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। দুঃখ ও অনুতাপেই আমাদের বাকি জীবন কাটাতে হবে। বোধ হয় এটাই ছিল আমাদের নিয়তি।নয়া দিগন্ত

লেখকঃ  প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক

Related posts